সেনাবাহিনী ছাড়া শহরে আর যারা ছিল তারা সকলেই ছিল ইহুদি বা গোথ সম্প্রদায়ের লোক। তারা মুসলমানদের পক্ষে ছিল। মুসলমানদের ব্যাপারে উদ্ভট গুজব ছড়িয়ে তারাই মানুষের মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করছিল।
***
টলেডো শহরে কয়েকটি গির্জা আছে। একটি গির্জা খুবই বড়। সেই গির্জায় অসংখ্য যাজিকা ও বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ আছে। পূর্বেও বলা হয়েছে, গির্জার পাদ্রিরা নিজেদেরকে খোদা প্রেরিত ফেরেশতা ও দুনিয়াত্যাগী বলে দাবি করত। বাস্তবে তারা ছিল ভোগ-বিলাসী ও প্রবৃত্তি-পূজারী। প্রত্যেক বাদশাহর কাছ থেকেই তারা বিশাল জায়গির গ্রহণ করত। জায়গিরের বিপুল আমদানি ছাড়াও গির্জার নামে তারা মানুষের উপর বিভিন্ন প্রকার চাঁদা ধার্য করে রেখেছিল। এভাবে তারা সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতে সকল পাদ্রি বড় পাদ্রির নিকট গিয়ে বলল, ‘এত বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ সোনা-দানা, টাকা-পয়সা কোথায় লুকানো যায়?
‘কোথাও লুকানোর ব্যবস্থা তো অবশ্যই করতে হবে।’ বড় পাদ্রি বলল। ‘এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ তো আর সাথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সাথে নিয়ে গেলে তো আমাদের লোকেরাই তা লুট করে নিবে। সুতরাং সমস্ত স্বর্ণ-রোপা, মণি-মুক্তা, টাকা-পয়সা একত্রিত করে এখানে নিয়ে এসো। ভূ-গর্ভস্থ ঘরে গর্ত করে সবকিছু সেখানে পুঁতে রাখা যাবে।’
রাতের অন্ধকারে বেশ বড় বড় কয়েকটি বাক্স প্রধান গির্জার ভূ-গর্ভস্থ ঘরে নিয়ে আসা হল। ভূ-গর্ভস্থ ঘরের মেজে খুঁড়ে সমস্ত বাক্স মাটি চাপা দিয়ে রাখা হল। এর পাশেই আরেকটি গর্ত করা হল। গর্তটি প্রায় ছয় ফুট লম্বা এবং তিন ফুট চওড়া ও গভীর। এই গর্তে কোন কিছু রাখা হল না।
গর্ত খননকারী ছিল তিনজন। তাদের কাজ প্রায় শেষে হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় বড় পাদ্রির ইশারায় আরও তিনজন ব্যক্তি নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে সেখানে প্রবেশ করল। গর্তধননকারীরা উপরে উঠে এলে বড় পাদ্রি তাদেরকে বলল,
‘গর্ত থেকে যে মাটি উঠানো হয়েছে, তা বাইরে ফেলে দিয়ে এসো। পাদ্রির নির্দেশ অনুযায়ী তারা মাটি উঠানোর জন্য মাথা ঝুঁকানোর সাথে সাথে তলোয়ারধারীরা ক্ষিপ্রগতিতে তলোয়ার বের করে গর্ত খননকারীদের গর্দান উড়িয়ে দিল। তারপর সেই খালি গর্তে তাদের লাশ নিক্ষেপ করা হল।
‘মাটি দিয়ে গর্ত ভরে দাও।’ বড় পাদ্রি বলল। এখন এই সম্পদ সম্পর্কে আর কেউ জানতে পারবে না।’
গর্ত খননকারীদের হত্যাকারী সকলেই ছিল পাদ্রি।
ভূ-গর্ভস্থ ঘরের দরজা সাধারণ ঘরের দরজার মতো ছিল না। বরং তা ঢাকনার মতো ছিল। ভূ-গর্ভস্থ ঘরের উপর ঢাকনা ফেলে দিলে তা ফ্লোরের সাথে মিশে যেত। তার উপর কিছু আসবাব-পত্র রেখে দিলে কারো বুঝার উপায় থাকত না যে, এই ফ্লোরের নিচে একটি ভূ-গর্ভস্থ কক্ষ আছে।
বড় পাদ্রি ধন-সম্পদের বাক্স এবং তিনটি লাশ দাফন করে ভূ-গর্ভস্থ ঘরের ঢাকনা বন্ধ করে দিল। তারপর সে অপর তিন পাদ্রিকে সাথে নিয়ে ঢাকনার উপর গির্জার কালিন বিছিয়ে দিল। যে জায়গাটিতে ভূ-গর্ভস্থ ঘরের দরজা ছিল ঠিক সে বরাবর একটা টেবিল রেখে তার উপর ক্রুশবিদ্ধ হযরত ঈসা আ.-এর মূর্তি রেখে দিল। এই ক্রুশ আর টেবিল ছিল কাঠের তৈরী।
‘এখন আমাদের এ শহর ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। বড় পাদ্রি বসল। নতুন বিজয়ীদের আসতে দাও। তারপর পরিস্থিতি শান্ত হলে আমরা ফিরে আসব। আমাদের সম্পদ হেফাজতে থাকবে। আর শোন, একজন যাজিকাও যেন এখানে না থাকে, তা হলে মুসলিম বাহিনী তাদেরকে দাসী বানিয়ে নিবে।
***
অনেকক্ষণ হয় সূর্য অস্ত গেছে। তারিক বিন যিয়াদ টলেডো থেকে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে অবস্থান করছিলেন। তিনি মুগীস আর-রুমী ও যায়েদ বিন সাদা সম্পর্কে কোন সংবাদই পাচ্ছিলেন না।
টলোডো থেকে তের-চৌদ্দ মাইল উত্তরে প্রায় আড়াইশ নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোরের একটি কাফেলা অবস্থান করছিল। তবে এ কাফেলা কোন সেনাবাহিনীর কাফেলা ছিল না। বড় পাদ্রি আরও ছয়-সাতজন পাদ্রিসহ সে কাফেলার সাথে ছিল। কাফেলা খোলা আকাশের নিচে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছিল। তাদের বাহনগুলো পাশেই বাঁধা ছিল।
রাত্রি প্রায় দ্বিপ্রহর। কাফেলার অদূরে একটি গাছের আড়ালে আইনামেরী নামের এক যুবতী মেয়ে নিস্পলক নেত্রে কাফেলার দিকে তাকিয়ে আছে। সে একজন যাজিকা। তের-চৌদ্দ বছর বয়সে তাকে গির্জায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন তার বয়স বাইশ-তেইশ বছর। বাহ্যিকভাবে তাকে ধর্মযাজিকা বানানো হয়ে ছিল, কিন্তু প্রকৃত অর্থে তাকে পাদ্রিরা রক্ষিতা বানিয়ে রেখেছিল। আর এটা কোন গোপন বিষয় ছিল না। পাদ্রিরা এসকল যাকিজাদেরকে রক্ষিতা বানানোকে নিজেদের অধিকার মনে করত, যে অধিকার তারা গির্জার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত হয়েছিল।
ঘুমন্ত কাফেলার থেকে একটি ছায়ামূর্তি ধীরেধীরে আইনামেরির কাছে এসে দাঁড়াল।
‘সেই কখন থেকে তোমার অপেক্ষা করছি। আইনামেরী বলল। “জিম! তুমি এভাবে কেন এলে? ঘোড়া কোথায়? এখনই ঘোড় নিয়ে এসো, এখান থেকে আমাদের ফিরে যেতে হবে।’
‘সব কিছু খুলে বল মেরী। জিম বলল। “দিনের বেলা তুমি তো শুধু বলেছিলে, গভীর রাতে দুটি ঘোড়া নিয়ে এসে এই গাছের নিচে অপেক্ষা করতে।
জিমের পুরো নাম হল, জিম সেবরিন। মেরী যে গির্জার যাজিকা ছিল জিম ছিল সেখানের কর্মচারী। জিমের বয়স ছিল পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর। আইনামেরী তাকে জান-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত। জিম সেবরিন প্রায় ছয় মাস পূর্বে এই গির্জার কর্মচারী হয়ে এসেছিল। সে গির্জার ভিতরেই থাকত। মেরী তাকে দেখামাত্রই তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। এই গির্জায় আরও চার-পাঁচজন যাজিকা ছিল, কিন্তু মেরীর বদকিসমত হল, সে ছিল সকলের চেয়ে রূপসী ও লাবণ্যময়ী। বড় পাদ্রি তাকে রক্ষিতা বানিয়ে রেখেছিল।
