টলেডোর চতুর্দিকে বয়ে চলছে টাইগিস নদী। টাইগিস নদীর শেষ প্রান্তে আছে একটি গভীর ও প্রশস্ত ঝিল। এই ঝিলে নদীর পানি জমা হয়। বিশাল বড় একটি পাথরকে ছিদ্র করে সেই ছিদ্র দিয়ে নদীর পানি এই ঝিলে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এটাই সেই ঝিল যেখানে আউপাস পাগলের ছদ্মবেশ নিয়ে মেরিনার সাথে সাক্ষাৎ করেছিল।
প্রথমত টাইগিস নদীই টলেডোকে সুরক্ষিত রেখেছে। দ্বিতীয়ত টলেডোর দুর্ভেদ্য দুর্গ বেশ উঁচুতে অবস্থিত। দুর্গ ও শহর রক্ষাপ্রাচীর অত্যন্ত মজবুত পাথর দিয়ে তৈরী করা হয়েছে। কোন কোন পাথর এত বিশাল যে, তাকে পাহাড় বলে ভ্রম হত।
শহরের চতুর্দিকে আছে প্রাচীর সংলগ্ন অত্যন্ত প্রশস্ত ও গভীর পরিখা। পরিখার নিচে তীক্ষ্ণ ফলাবিশিষ্ট কাঠ গেড়ে রাখা হয়েছে। কেউ যদি পরিখায় নামতে চায় তাহলে এই তীক্ষ্ণ কাঠের আঘাতে সে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে। পরিখা থেকে বের হয়ে আসা তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হবে না।
যে বাদশাহই টলেডোর সিংহাসনে আরোহণ করেছে, সেই টলেডোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মজবুত করেছে। গোথ বংশের রাজত্বকালে টলেডোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এতটাই মজবুত করা হয়েছিল যে, টলেডোকে অপরাজেয় শহর মনে করা হত।
তারিক বিন যিয়াদ খোলা ময়দানে ও পাহাড়-পর্বতে সামনা-সামনি লড়াই করছিলেন। তিনি মাত্র বার হাজার সিপাহী নিয়ে এক লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। কিন্তু দুর্গ দখল করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। দুর্গ দখল করার কৌশল সম্পূর্ণ আলাদা। তার উপর টলেডোর মতো একটি অপরাজেয় দুর্গ দখল করা তো একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু এই অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্যই তারিক বিন যিয়াদ আল্লাহর উপর ভসরা করে সামনে অগ্রসর হলেন।
***
টলেডো শহরে বাদশাহ রডারিকের মৃত্যুতে মাতম চলছিল। শুধু শাহীমহলেই শোকের ছায়া নেমে এসেছিল না; বরং গোটা শহর বিতার চাদরে ঢেকে গিয়েছিল। সেই সাথে প্রতিটি মানুষের চেহারা ভয়ে পাংশুবর্ণ ধারণ করেছিল। রডারিকের এক লাখ সৈন্যের মধ্যে যারা জীবন নিয়ে পালিয়ে টলেডো এসে পৌঁছেছিল তাদের মধ্যে সেসকল বেসামরিক লোকও ছিল, যারা রডারিকের ঘোষণা শুনে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। এ ছাড়াও অন্যান্য যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা সৈন্যরাও সেখানে একত্রিত হয়েছিল। তারা সেখানে পৌঁছে মুসলমানদের ব্যাপারে মানুষের মাঝে এমন প্রচারণা চালাচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল, মুসলিম বাহিনী বাঘ-সিংহের দল, যাকে সামনে পায় তাকেই টুকরো টুকরো করে ফেলে।
গোয়াডিলেট যুদ্ধের পূর্বে টলেডো গুজবের শহরে পরিণত হয়। রডারিক যুদ্ধের জন্য যখন সৈন্য সংগ্রহ করছিল তখন আউপাস ছদ্মবেশ ধারণ করে পুরো শহরে গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছিল। ফলে মুসলমানদের সম্পর্কে শহরের অধিবাসীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। এই গুজব ছড়ানোর পিছনে গোথ সম্প্রদায়ের বিরাট ভূমিকা ছিল। এর পর যখন সংবাদ পৌঁছল যে, তাদের বীরপুরুষ ও অসম সাহসী বাদশাহ রডারিক মৃত্যুবরণ করেছে এবং তাদের এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী মাত্র বার হাজার সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে মার খেয়ে একেবারে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে, তখন তারা ভয় ও আতঙ্কে একেবারে মুষড়ে পড়ে।
যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর পালিয়ে আসা সৈন্য ও স্বেচ্ছাসেবকরা মুসলিম বাহিনীর নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতার কথা এমনভাবে বর্ণনা করছিল যে, গোথদের ছড়ানো গুজব এখন শহরের অধিবাসীদের নিকট সত্য বলে মনে হতে লাগল। তারা একে অপরকে বলতে লাগল,
‘তারা মুসলমান হোক বা অন্য কোন সম্প্রদায় হোক–এটা নিশ্চিত যে, তারা মানুষ নয়; অন্য কোন সৃষ্টি।
‘ঠিকই বলেছ, ঠিকই বলেছ, একজন মানুষের পক্ষে দুজনের মোকাবেলা করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু তাদের একজনই তলোয়ারের এক আঘাতে বিশজন সিপাহীকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে।
‘ওরা হিংস্র নেকড়ে, ওরা আজদাহা, সামনে যা পায় তাই গ্রাস করে চলে।
লোকেরা ঠিকই বলেছিল, ওরা সমুদ্রে সাঁতার কাটে না; পানির উপর দিয়ে হেঁটে চলে, ডুবে না।’
‘বাদশাহ রডারিকের লাশ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
‘তার ঘোড়া উরলিয়াকেও হানাদার বাহিনী নিয়ে গেছে।
‘অনেকেই বলছে, ওরা আমাদের বাদশাহকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছে।
‘এটা হয়তো ওদের নিয়ম, ওরা যে বাদশাহকে পরাজিত করে তার গোত খেয়ে ফেলে।’
‘ওরা এদিকেও এগিয়ে আসছে। এখানে ওরা সীমাহীন লুটতরাজ করবে।
মেয়েদেরকে ওরা নিজেদের সাথে নিয়ে যাবে।’
এ ধরনের অসংখ্য গুজব টলেডোর অধিবাসীদের মাঝে লোমহর্ষক ও ভয়ঙ্কর ত্রাস সৃষ্টি করে চলছিল। ঘরে ঘরে অল্প বয়স্ক যুবতী মেয়েরা ছিল। ধন-সম্পদের কারো কোন কমতি ছিল না। সকলের নিকট সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু ছিল তার নিজের জীবন। ধনী-গরীব সকলেই নিজের জান বাঁচানোর চিন্তা করছিল।
মানুষের মুখে মুখে সবচেয়ে বেশি যে কথাটি আলোচিত হচ্ছিল, তা হল, হানাদার বাহিনী যুবতী মেয়ে এবং যুবক ছেলেদেরকে দাস-দাসী বানিয়ে নিয়ে যায় এবং তাদের উপর অনেক জুলুম করা হয়।
সেই যুগে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম ছিল। বিজয়ী বাহিনী বিজিতদের ঘর-বাড়ী লুটতরাজ করত। মেয়েদের ইজ্জত-আবরু হরণ করত। ফলে মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেত। টলেডো বাসীদের জন্য এধরনের গুজব কোন আশ্চর্যজনক ঘটনা ছিল না। এধরনের কথাকে মানুষ সত্যই মনে করত। তাই টলেডো বাসীরাও শহর ছেড়ে পালাতে শুরু করল। কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো শহর জনমানব শূন্য হয়ে পড়ল। সেনাবাহিনীর সদস্যরাই শুধু সেখানে রয়ে গেল। কিন্তু বীরত্ব ও সাহসিকতার দিক থেকে তারা ছিল একেবারেই মৃত।
