জিমের সাথে যখন মেরীর প্রথমবার সাক্ষাৎ হয় তখনই মেরী অনুভব করতে পেরেছিল যে, তার হৃদয়ে যেমন জিমের জন্য ভালোবাসা আসন গেড়ে বসেছে; ঠিক তেমনি জিমও তাকে জান-প্রাণ দিয়ে কামনা করে। প্রথম সাক্ষাতেই আইনামেরী জিমকে তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ দেখিয়েছিল। সে জিমকে বলেছিল, কীভাবে তাকে তের-চৌদ্দ বছর বয়সে জোর করে গির্জায় নিয়ে আসা হয়েছিল এবং তাকে বুঝানো হয়েছিল যে, খোদা তাকে তার বন্দেগীর জন্য নির্বাচন করেছেন, সুতরাং দুনিয়ার সাথে সকল সম্পর্কই তার শেষ হয়ে গেছে। সে জিমকে বলেছিল,
‘পাদ্রিরা আমার সাথে যে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে তা আমাকে ধর্ম-বিদ্বেষী করে তুলেছে। ঈসা মসীকে তো একবার শুলে চড়ান হয়েছিল, আর আমাকে প্রত্যেক রাতে শুলে চড়ানো হয়। ঈসা মসীর হাত-পায়ে কীল বিদ্ধ করা হয়েছিল, আর আমার হৃদয়ে, আমার অন্তরে কীল বিদ্ধ করা হয়েছে। প্রতি রাতে, প্রতিটি মুহূর্তে আমি ধুকে ধুকে মরি। মরেও আবার বেঁচে থাকি। আমারও স্বপ্ন ছিল কারো স্ত্রী হওয়ার। আমি খোদার মহব্বত চাই না, আমি একজন প্রকৃত মানুষের ভালোবাসা চাই। কিন্তু কেউ কি আমাকে ভালোবাসবে? এখন আমি আমার নিজেকেই ঘৃণা করি। জিম! তুমিও হয়তো আমাকে ঘৃণা করবে।’
‘তোমার শরীরের প্রতি আমার সামান্যতম মোহও নেই, মেরী। জিম বলল। ‘আমি শুধু চাই, তুমি আমাকে হৃদয়-মন উজাড় করে ভালোবাসবে।’
প্রথম সাক্ষাতেই জিম আইনামেরীকে সেই প্রেম-ভালোবাসার আশ্বাস দিয়েছিল, যার সম্পর্ক হৃদয়ের সাথে শরীরের সাথে নয়।
এতদিন আইনামেরী যে ভালোবাসার জন্য কাতর ছিল, আজ সে তার সেই কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসার সন্ধান পেল। তারা দুজনেই গির্জা থেকে পালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছিল। কিন্ত গির্জা থেকে কোন যাজিকার বের হওয়া একেবারেই অসম্ভব ছিল। প্রতিটি গির্জার যাজিকারা কয়েদীর মতো বসবাস করত। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ এমন ব্যতিক্রমধর্মী হত যে, কোন যাজিকা পালিয়ে গেলেও সে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারত না। তাছাড়া যাজিকাদের উপর সবসময় নজর রাখা হত।
জিম বহু দূরের বাসিন্দা। চাকরির সন্ধানে সে টলেডো এসেছিল। এখানে তার এমন কারো সাথে পরিচয় ছিল না, যার সাহায্যে সে আইনামেরীকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারত। তার পরও সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, আইনামেরীকে সে এই জাহান্নাম থেকে উদ্ধার করবে।
ছয় মাস যাবৎ তারা এভাবে চুপেচুপে মন নেওয়া-দেওয়া কলি। এই দীর্ঘ ছয় মাসে তাদের প্রেম-ভালোবাসা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেন থেকে ফিরে আসা তাদের কারো পক্ষেই সব ছিল না। তাদের ভালোবাসা এতটাই গভীর ছিল যে, তারা একে অপরের জন্য অসি মুখে জীবন বিলিরে দিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করত না।
তারপর যখন টলেডোতে মুসলমানদের আক্রমণের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল এবং লোকজন ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে টলেডো থেকে পালাতে শুরু করল তখন জিম মেরীকে বলল,
‘মেরী! এখন সুযোগ এসেছে, শহরের ফটক সর্বদা খোলা থাকে। দলে দলে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমরাও আমাদের পোশাক পালটিয়ে পালিয়ে যেতে পারি।’
‘বুড়ো পাদ্রি এখন আমার প্রতি খুব বেশি নজর রাখছে।’ মেরী বলল। আমি সামান্য এদিক-সেদিক হলে সে পাগলের মতো আমাকে তালাশ করতে থাকে।
‘পাদ্রির কামরায় অন্য কাউকে পাঠিয়ে দাও। জিম বলল।
‘আমাকে ছাড়া সে অন্য কোন মেয়ের দিকে ফিরেও তাকায় না।’ মেরী বলল। আমাকে ছাড়া তার এমন অবস্থা হয়, যেমন তোমাকে ছাড়া আমার, আর আমাকে ছাড়া তোমার।’; ::
‘তুমি যদি অনুমতি দাও তাহলে আমি তাকে হত্যা করতে পারি। জিম বলল। তারপর আমরা দুজন নিরাপদে শহর থেকে বের হয়ে যাব।’
‘না, জিমা না, তুমি ধরা পড়ে যাবে।’ মেরী বলল। ‘আমি নিজের জন্য কোন চিন্তা করি না, আমি তো মরতেই চাই। কিন্তু তোমাকে আমি এভাবে মরতে দিতে পারি না।’
এভাবে বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। জিম বারবার কেবল পাদ্রিকে হত্যা করার কথাই বলত। আন্দালুসিয়ার রাজধানী টলেডোতে কোন বাদশাহ ছিল না। নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাজকর্ম সম্পাদন করার মতো কেউ ছিল না। সাত সকালে শহরের ফটক খোলে দেওয়া হতোঁ, আর গভীর রাত পর্যন্ত ফটক ঐভাবে খোলাই থাকত।
টলেডোর এ অবস্থা সম্পর্কে তারিক বিন যিয়াদ অবগত ছিলেন না। জুলিয়ান ও আউপাস তাকে বলেছিল, টলেডোতে প্রবেশ করা খুবই কঠিন হবে। রডারিকের উত্তরসুরীরা জীবনবাজি রেখে শহর হেফাজতের জন্য লড়াই করবে। দীর্ঘ দিন দুর্গ অবরোধ করে বসে থাকতে হবে।
***
দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর আজ মেরীর স্বপ্ন পূরণের সময় উপস্থিত হয়েছে। মেরী গাছের নিচে দাঁড়িয়ে জিমের অপেক্ষা করছিল। জিম পৌঁছতেই মেরী তাকে লক্ষ্য করে বলল,
দিনের বেলা আমি তোমাকে সব কথা বলতে পারিনি। বড় পাদ্রি প্রধান গির্জায় ধন-সম্পদ শুকিয়ে এসেছে। সে আমাকে এত বেশি মহব্বত করে যে, আমাকে বলেছে, প্রধান গির্জার ভূ-গর্ভস্থ ঘরে টলেডোর সকল গির্জার ধন-সম্পদ লুকিয়ে রাখা হয়েছে।’
‘সেই সম্পদের সাথে আমাদের কি সম্পর্ক? জিম বলল।
সে সম্পদ আমাদের হস্তগত করতে হবে।’ মেরী বলল।
‘তোমার মাথা ঠিক নেই।’ জিম বলল। আমরা সম্পদ নিয়ে কোথায় যাব?
‘সমস্ত সম্পদ আমরা উঠাব না, জিম!’ মেরী বলল। তুমি আমার সাথে ফিরে চল, আমাদের যতটুকু প্রয়োজন আমরা ততটুকুই নেব। তার পর আমরা শহরেই থাকব। গির্জায় থাকব না। আমাদের বাড়ী খালী পড়ে আছে। বাড়ীর সকলে অনেক আগেই চলে গেছে।
