যায়েদ ইশারা করামাত্র সকল সিপাহী দুর্গের ভিতর প্রবেশ করল এবং পূর্ব নির্দেশ অনুযায়ী তারা পূর্ণরূপে সতর্ক রইল। মুসলিম বাহিনী চতুর্দিকে চোখ-কান খোলা রাখল। কিন্তু দুর্গের ভিতর কোথাও কোন সিপাহী তাদের চোখে পড়ল না। ঘর-বাড়ীর ছাদে ও আঙ্গিনায় শুধু নারী ও শিশুদেরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। ঘরের বাইরেও কয়েকজন বৃদ্ধ পুরুষ ছাড়া বেশিরভাগ নারী ও শিশুদেরকে দেখা যাচ্ছিল। এসব দেখে যায়েদ বিন কুসাদার সন্দেহ আরও প্রবল হল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, নিশ্চয় এটা কোন ফাঁদ হবে।
“আপনার বাহিনী কোথায়?’ যায়েদ বিন সাদা বললেন। দুর্গপতিই কোথায়?
এখানে কোন সৈন্যবাহিনী নেই।’ থিয়োডুমির বলল। এখানে আপনি ফৌজের একজন সদস্যকেও পাবেন না। এখানে আমি একাই আছি। কোন দুর্গপতিও নেই। আমি আপনার সাথে মিথ্যা বলেছিলাম যে, আমার বড় জেনারেল আমাকে সন্ধির জন্য পাঠিয়েছেন। এখানে আমার একজন দেহরক্ষীও নেই। আপনি যে ব্যক্তিকে আমার সাথে দেখেছেন, সে আমার ব্যক্তিগত চাকর। একমাত্র সেই আমাকে ছেড়ে চলে যেতে রাজী হয়নি।’
‘আমি তোমার এ কথা কীভাবে বিশ্বাস করব?’ যায়েদ বিন কুসাদা বললেন।
‘সৈন্যবাহিনী এমন কোন ছোট বস্তু নয়, যা লুকিয়ে রাখা যায়।’ থিয়োডুমির বলল। ‘আমি এই শহর আপনার নিকট সোপর্দ করছি। আপনার কাছে সিপাহী আছে। আপনি গোটা শহর তল্লাশী করে দেখতে পারেন। আমাকে ছাড়া এখানে আপনি কোন সিপাহী দেখতে পাবেন না। আমার সম্পূর্ণ বাহিনী আপনার হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছে। অল্প কিছুসংখ্যক যারা জীবিত ছিল, তারা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেছে।’
‘তুমি মিথ্যা কথা বলছ। যায়েদ বিন কুসাদা বললেন। আমি সেই বাহিনীকে দেখতে চাই, যাদেরকে আমি দেয়ালের উপর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।’
থিয়োডুমির নিজেকে আর সংবরণ করতে পারল না। সে হাসতে হাসতে বৃদ্ধ পুরুষ ও নারী-শিশুদের দিকে ইঙ্গিত করে বলল,
‘এরাই হল সেই বাহিনী, যাদেরকে আপনি প্রাচীরের উপর দেখেছিলেন। আপনি চাইলে আমি আবারও তাদেরকে দুর্গপ্রাচীরের উপর দাঁড় করিয়ে দেখাতে পারি। আমি আপনাকে ধোঁকা দিয়ে সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছি। আমার কাছে একজন সৈন্যও ছিল না। এমন অবস্থায় আমি পালিয়ে না গিয়ে বৃদ্ধ পুরুষ, নারী ও কিশোরদেরকে সিপাহীর পোশাক পরিয়ে তাদের মাথায় শিরস্ত্রাণ রেখে তাদেরকে দুর্গপ্রাচীরের উপর দাঁড় করিয়ে দেই, যেন আপনি মনে করেন, দুর্গের ভিতর বিপুল সংখ্যক সৈন্য রয়েছে।’
‘এই প্রতারণার কি প্রয়োজন ছিল? যায়েদ বিন কুসাদা জিজ্ঞেস করলেন। “তুমি কি এই বৃদ্ধ ও অবলা নারী-শিশুদেরকে আমাদের হাতে মারতে চেয়েছিলে? আমি যদি দুর্গ আক্রমণের ইচ্ছে করতাম তাহলে এ নিষ্পাপ কিশোররা আমাদের তীর-বর্শার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যেত। তখন আমাদেরকে এই পাপের বুঝা মাথায় নিয়ে আল্লাহর দরবারে মাথা কুটে মরতে হত। তুমি মনে করো না, আমি দুর্গপ্রাচীরের উপর তোমার বাহিনী দেখে ভয় পেয়ে এই সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেছি।’
‘আমি এমনটা কখনই মনে করিনি।’ থিয়োভুমির বলল। আমি আপনাকে ভয় দেখাচ্ছিলাম না। আমি চাচ্ছিলাম, আপনি দুর্গ দখল করুন, যেন আর রক্তপাত না ঘটে। আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি যে, আপনার সাথে আমি যে চুক্তি করেছি তা কোন সামরিক চুক্তি নয়, যেমনটা দু’টি সেনাবাহিনীর মাঝে হয়ে থাকে। আমি আন্তরিকভাবেই আপনার আনুগত্য স্বীকার করছি। আমি ওয়াদা করছি, আমার নিজস্ব কোন বাহিনী আমি তৈরী করব না; বরং পরিপূর্ণভাবে আপনার অধীন থাকব।’
ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন, থিয়োডুমিরের বুদ্ধিমত্তা দেখে যায়েদ বিন কুসাদা এত বেশি প্রভাবিত হয়ে পড়েন যে, প্রধান সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদের অনুমতি ছাড়াই তিনি থিয়োডুমিরকে গ্রানাডার গভর্নর নিযুক্ত করেন। তবে তাকে একজন আরব প্রশাসকের অধীনে রাখেন।
গ্রানাডার অধিবাসীদের মাঝে ইহুদিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। ইহুদি সম্প্রদায় যেহেতু রডারিকের শাসনে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল, তাই তারা মুসলমানদের অধীনতা স্বীকার করে নিল। গ্রানাডার প্রশাসনিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য যায়েদ বিন কুসাদা মুসলমানদের সাথে ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকেও নিয়োগ করলেন।
প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এমন লোক মুসলিম বাহিনীতে বেশ কম ছিল। মুসলিম বাহিনীতে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানোর মতো লোক কম থাকার কারণেই ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে প্রশাসনের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হল। পরবর্তীতে ঐসকল ইহুদি ও খ্রিস্টানরাই ইসলামী সালতানাতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং ইসলামী সালতানাতের সর্বপ্রকার ক্ষতি সাধনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়।
***
মুগীস আর-রুমী ও যায়েদ বিন কুসাদা নিজ নিজ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তারিক বিন যিয়াদও টলেডোর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। জুলিয়ান ও আউপাস তার সাথেই ছিলেন। টলেডো হল আন্দালুসিয়ার রাজধানী ও বাদশাহর আবাসস্থল। তাই তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও দুর্ভেদ্য।
জুলিয়ান ও আইপাস তারিক বিন যিয়াদকে টলেডের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে যে তত্ত্ব দিয়েছিলেন, তা থেকে এই শহরের যে চিত্র ভেসে উঠে তা নিম্নরূপ।
