‘আমার চেয়েও বড় কমান্ডারের নির্দেশে আমি আপনার কাছে এসেছি।’ থিয়োডুমির বলল। এই কমান্ডার এখানকার সকল সৈন্যের কমান্ডার। তিনি আপনার কাছে পয়গাম পাঠিয়েছেন যে, দুর্গের ভিতর এত বিপুল সংখ্যক সৈন্য আছে যে, আপনি যদি দুর্গ অবরোধ করেন তাহলে কমপক্ষে এক বছর অতিবাহিত হয়ে যাবে। দুর্গপ্রাচীরের দিকে তাকালেই আপনি বুঝতে পারবেন যে, দুর্গের অভ্যন্তরে কত বিপুল সংখ্যক সৈন্য মওজুদ আছে।
‘এত বিপুল সংখ্যক সৈন্য থাকতে সন্ধির প্রয়োজন কি?’ যায়েদ বিন কুসাদা দুভাষীর মাধ্যমে জবাব দিলেন। আমার বাহিনী তো তুমি দেখতেই পাচ্ছ। পূর্বের তুলনায় আমার সৈন্যসংখ্যা এখন আরও কমে গেছে।
‘আমাদের জেনারেল খুবই দয়ালু।’ থিয়োডুমির বলল। তিনি দেখেছেন, তার বাহিনী কত নির্মমভাবে মার খেয়েছে। আপনার বাহিনীরও সমূহ ক্ষতি হয়েছে। তাই তিনি বলেছেন, আর কোন রক্তপাত তিনি বরদত করতে পারছেন না। এজন্য তিনি সন্ধি করতে চাচ্ছেন। এখন আপনি যদি সন্ধি করতে না চান তাহলে আমি তো আপনাকে বলেছিই, আমাদের কাছে এখনও যে পরিমাণ সৈন্য আছে, তাতে দুর্গ দখল করা আপনার জন্য মোটেই সম্ভব হবে না।’
যায়েদ বিন কুদার সন্দেহ হচ্ছিল যে, থিয়োডুমির হয়তো তাকে ধোঁকা দিচ্ছে। কিন্তু সে এমনভাবে কথা বলছিল যে, যায়েদ বিন কুসাদা তার কথায় প্রভাবিত হয়ে সন্ধি প্রস্তাবে সম্মত হয়ে গেলেন।
তবে সন্ধির শর্ত আমাদের পক্ষ থেকে পেশ করা হবে।’ থিয়োডুমির বলল। ‘সবচেয়ে বড় শর্ত হল, শহরবাসীদের জান-মাল, ইজ্জত-আবরু হেফাজত করার দায়িত্ব হবে আপনার। আপনার কোন সৈন্য কোন শহরবাসীর ঘরে প্রবেশ করতে পারবে না। দ্বিতীয় শর্ত হল, রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারে যা কিছু আছে তা আমরা নিজেরাই আপনার কাছে পেশ করব। তৃতীয় শর্ত হল, আপনি আমাকে যুদ্ধবন্দী বানাবেন না। আমি দুর্গেই থাকব এবং আপনার পক্ষ হতে এলাকার গভর্নর নিযুক্ত হব। আমি আপনার আনুগত্য গ্রহণ করছি। ওয়াদা করছি, আমি আপনার সকল আদেশ-নিষেধ মেনে চলব এবং কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করব না।
সন্ধির শর্তাবলী লিপিবদ্ধ করা হল। যায়েদ বিন কুসাদা দলিল-দস্তাবেজে স্বাক্ষর করে নিজের সীল-মোহর লাগিয়ে দিলেন।
‘কাল ভোরে আপনি দুর্গের ফটক খোলা পাবেন।’ থিয়োডুমির এ কথা বলে দুর্গের ভিতর চলে গেল।
‘ইবনে কুসাদা? যায়েদ বিন সাদার এক সহকারী কমান্ডার একটু গোসার স্বরে বলল। আপনি আমাদের সকলের মৃত্যু-পরওনার উপর দস্তখত করে সীল-মোহর লাগিয়েছেন।’
‘সে ঠিকই বলেছে, বিন কুসাদা!’ আরেকজন কমান্ডার বলল। মনে হচ্ছে, আপনি খুব ক্লান্তড় হয়ে পড়েছেন, তাই আপনার বুদ্ধি কাজ করছে না।
‘আল্লাহর উপর আমার পূর্ণ ভরসা রয়েছে। যায়েদ বিন কুদা বললেন। ‘তোমরা কি আশঙ্কা করছ যে, থিয়োডুমির আমাদেরকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছে? আমরা যদি দুর্গের ভিতর প্রবেশ করি তাহলে দুর্গের সকল সিপাহী এবং অধিবাসী আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং আমাদের নাম-নিশানা মিটিয়ে দেবে?
‘হ্যাঁ, এমনই হবে। কমান্ডাররা বলল।
‘তোমরা নির্বোধের মতো কথা বলছ। যায়েদ বিন কুসাদা বললেন। কোন দুর্গপতিই শত্রুবাহিনীর অল্প কয়েকজন সিপাহীকেও দুর্গের ভিতর প্রবেশ করার অনুমতি দেয় না। অথচ আমাদের গোটা বাহিনীর জন্যই তো তারা কাল সকালে দুর্গের ফটক খুলে দেবে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, বার্বার মুসলমানগণ সংখ্যায় কম হলেও তাদরেকে পরাজিত করা তাদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়।
***
সারারাত যায়েদ বিন কুসাদা ঘুমোতে পারলেন না। তিনি ও বার্বার জেনারেলগণ এ কথা চিন্তা করে খুবই পেরেশান হচ্ছিলেন যে, না জানি, তাদেরকে কোন ফাঁদে ফেলার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। যায়েদ বিন কুসাদা তার কমান্ডারদেরকে রাতে নিদ্রাহীন ও সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে বললেন, সকালে দুর্গে প্রবেশ করার সময় চতুর্দিকে চোখ খোলা রেখে দুর্গে প্রবেশ করবে।
রাত ভোর হল। একজন মুজাহিদ ফজরের নামাযের আযান দিলেন। গোটা বাহিনী যায়েদ বিন কুদার পিছনে নামায আদায় করল। যায়েদ পুনরায় তার অধীনস্থ কমান্ডারদেরকে বললেন, ‘দুর্গে প্রবেশ করার সময় সকলেই যেন সতর্ক থাকে।
ভোরের আলোয় চারদিক ফর্সা হয়ে উঠল। এমন সময় দুর্গ থেকে একজন লোক এসে যায়েদ বিন কুসাদাকে বলল, জেনারেল থিয়োডুমির আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। যায়েদ তাঁর বাহিনীকে তাঁর পিছে পিছে আসার নির্দেশ দিয়ে নিজে আগন্তুকের সাথে রওনা হয়ে গেলেন।
গোটা বাহিনী পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। যায়েদ বিন কুসাদার নির্দেশ পাওয়ামাত্র পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনী রওনা হয়ে পড়ল। তারা ধারণা করছিল, দুর্গপ্রাচীরের উপর পূর্বের ন্যায় সিপাহী অপেক্ষা করবে। কিন্তু দেখা গেল, প্রাচীরের উপর একজন সিপাহীও নেই।
থিয়োডুমির ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে যায়েদ বিন কুসাদার জন্য অপেক্ষা করছিল। থিয়োডুমিরের সাথে তার সেই চাকর উপস্থিত ছিল। সে অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক যায়েদ বিন কুসাদাকে স্বাগত জানাল এবং তাঁকে দুর্গের ভিতরে নিয়ে গেল।
‘আমার বাহিনীও কি দুর্গের ভিতরে আসতে পারবে?’ যায়েদ বললেন।
‘হা, অবশ্যই।’ থিয়োডুমির বলল। আমি কি সন্ধিপত্রে উল্লেখ করিনি যে, দুর্গ আপনাকে সোপর্দ করব?’
