যুদ্ধের শুরুতে যায়েদ বিন কুসাদা একশ জানবাজ সিপাহীকে আত্মগোপন করে থাকার জন্য রণাঙ্গনের বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে ছিলেন। তারা বহু দূরের পথ ঘুরে শহরের পিছনে পৌঁছে গেল। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পেল, দুর্গপ্রাচীরের উপর একজন প্রহরীও নেই।
সালার যায়েদ বিন কুসাদা এই ভেবে তাদেরকে দুর্গের দিকে পাঠিয়ে ছিলেন যে, গ্রানাডার সকল সিপাহী দুর্গের বাইরে চলে এসেছে। সম্ভবত দুর্গের ভিতর কোন সিপাহী নেই। যদি থাকে তাহলে তাদের সংখ্যা খুবই কম হবে। একশ সদস্যের সেই বাহিনীকে বলা হয়েছিল যে, তারা যেন দুর্গের ফটক ভাঙ্গার চেষ্টা করে, কিংবা রশির সাহায্যে দুর্গপ্রাচীরের উপর আরোহণ করে।
একশ সদস্যের এই জানাবাজ দলটি যখন শহরের পিছনে পৌঁছল তখন প্রাচীরের উপর দাঁড়ানো এক ব্যক্তি তাদেরকে দেখতে পেল। সে দ্রুত নিচে নেমে ঘোড়ায় চড়ে থিয়োড়মিরের কাছে গিয়ে খবর দিল যে, কিছু সংখ্যক মুসলিম সৈন্য পিছন দিক হতে শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। থিয়োডুমির প্রায় তিনশ অশ্বারোহীকে শহরের পিছন দিকে পাঠিয়ে দিল, আর যেসব সৈন্য এখনও যুদ্ধে লিপ্ত হয়নি তাদেরকে হুকুম দিল, তারা যেন শহরের ভিতর চলে যায়।
আন্দালুসিয় সিপাহীরা শহরের দিকে যাওয়ার জন্য পিছন দিকে ফিরতেই যায়েদ বিন কুসাদা তার রক্ষিত সৈন্যদের নিয়ে আন্দালুসিয় বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। পিছন দিক থেকে হামলা হওয়ার কারণে আন্দালুসিয় বাহিনীর অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতি হল।
লেনপোল এবং উইলিয়াম স্কাট লেখেন, আন্দালুসিয় বাহিনী সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত হল। এমন বিপুল পরিমাণ প্রাণহানী ইতিপূর্বের কোন যুদ্ধে হয়নি। থিয়োডুমির যে তিনশ সিপাহীকে শহরের পিছনে পাঠিয়ে ছিল বার্বার মুজাহিদগণ তাদেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলল। এই যুদ্ধে আন্দালুসিয় কোন সিপাহী যদি প্রাণে বেঁচে থাকে তাহলে নিশ্চিতরূপে বলা যায়, সে শহরের দিকে যায়নি, বরং জঙ্গলের দিকে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করেছিল বলেই প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল।
***
থিয়োডুমিরকে রণাঙ্গনে পাওয়া গেল না। দুর্গের খোলা ফটক বন্ধ করে দেওয়া হল। অনেকক্ষণ হয় আন্দালুসিয় বাহিনীর পতাকা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। যায়েদ বিন কুসাদার নির্দেশ ছিল কোন দুশমনকে যেন জিন্দা রাখা না হয়।
রণাঙ্গন থেকে গ্রানাডা বেশ দূরে অবস্থিত। আন্দালুসিয় বাহিনীকে পূর্ণরূপে ধ্বংস করে সালার যায়েদ বিন কুসাদা গ্রানাডার দিকে রওনা হলেন। তিনি তাঁর বাহিনীকে সুসংবাদ দিলেন যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বিজয় দান করেছেন। এখন আমরা দুর্গে প্রবেশ করে শহরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করব। শহরে হয়তো কেউ আর প্রতিরোধ করার মতো নেই।
মুসলিম বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে দুর্গের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। তারা দেখতে পেল, দুর্গপ্রাচীরের উপর মানুষের একটি প্রাচীর তৈরী হয়েছে। অন্যান্য দুর্গ অবরোধের সময় দেখা গেছে, সকল দুর্গেই কম-বেশি সিপাহী থাকে, কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক সিপাহী ইতিপূর্বে আর কোন দুর্গে দেখা যায়নি। তাদের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, একজনের বাহু আরেকজনের বাহুর সাথে লেগে ছিল। তাদের দেহের উর্ধ্বাংশ ছিল মজবুত লৌহবর্মে আবৃত, আর মাথায় ছিল শিরস্ত্রাণ।
‘না, এখনই নয়। যায়েদ তার সহকারী সালারকে লক্ষ্য করে বললেন। ‘আমরা তো মনে করেছিলাম, গ্রানাডার সকল সৈন্যকে আমরা খতম করে দিয়েছি। কিন্তু শহর রক্ষার জন্য তো দেখছি, রণাঙ্গনের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি সৈন্য এখনও রয়ে গেছে।’
শেষ বিকেলে দিগন্তজোড়ে সূর্যের আবছা আলো তখনও কিছুটা অবশিষ্ট ছিল। যায়েদ বিন কুসাদা দুর্গ অবরোধ করার নির্দেশ দেন। বেশ কয়েকজন মুজাহিদ শহীদ হওয়ার কারণে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা অনেক কমে গিয়েছিল। অনেক মুজাহিদ আহতও হয়েছিলেন। মোটকথা, সার্বিক পরিস্থিতি ছিল হতাশাজনক। তারপরও সালার যায়েদ বিন কুসদা প্রাচীরের নিকট গিয়ে ঘোষণা করালেন,
‘হে দুর্গবাসী! তোমরা তোমাদের বাহিনীর করুন পরিণতি লক্ষ্য করো। তোমরা যদি যুদ্ধ ছাড়াই দুর্গের দরজা খুলে দাও তাহলে সকলকে নিরাপত্তা প্রদান করা হবে। অন্যথায় প্রত্যেককে হত্যা করা হবে।
দুর্গের ভিতর থেকে কোন ধরনের উত্তর আসছিল না। সাধারণত অবরোধকারীদের পক্ষ থেকে অল্প সময়ের মধ্যে দুর্গ খোলে দেওয়ার জন্য আলটিমেটাম দেওয়া হয়ে থাকে। আর অবরুদ্ধ বাহিনীর পক্ষ থেকে তিরস্কার ও দাম্ভিকতাপূর্ণ জবাব দেওয়া হয়। কিন্তু যায়েদ বিন কুসাদার ঘোষণার কোন প্রতিউত্তর এলো না।
অপ্রত্যাশিতভাবে দুর্গের দরজা খুলে গেল। থিয়োডুমির সাদা পতাকা হাতে বেরিয়ে এলো। প্রথম আশ্চর্যের বিষয় হল, থিয়োডুমির নিজে সন্ধির পতাকা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। দ্বিতীয় আশ্চর্যের বিষয় হল, থিয়োডুমিরের সাথে মাত্র একজন দেহরক্ষী ছিল। সাধারণত কোন জেনারেল বা বাদশাহ যখন বাইরে বের হয় তখন বড়সড় একটি রক্ষী বাহিনী নিয়ে বাইরে বের হয়।
থিয়োডুমিরের সাথে যে দেহরক্ষী ছিল, নিকটে আসার পর জানা গেল যে, সে দেহরক্ষী নয়; বরং সে হল থিয়োডুমিরের ব্যক্তিগত চাকর। খ্রিস্টান বাদশাহ ও জেনারেলরা রক্ষীবাহিনী ছাড়াও এধরনের দুই-একজন চাকর নিজেদের সাথে রাখতেন। থিয়োডুমিরকে দুর্গ থেকে বের হয়ে আসতে দেখে যায়েদ বিন কুসাদা সামনে অগ্রসর হলেন।
