‘বাবার ভায়েরা আমার! তোমাদের যুদ্ধ-স্পৃহা ও ঈমানী শক্তির পরীক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে। আমি আরব, কিন্তু আজ তোমাদেরকে প্রমাণ করতে হবে, যুদ্ধের ময়দানে আরবদের চেয়ে বার্বাররা বেশি সাহসী ও জানবাজ। মনে রেখো, তোমাদের সঙ্গি-সাথীরা অন্য শহরের দিকে গেছে। তাদের কাছ থেকে তোমাদেরকে এমন তিরস্কার যেন শুনতে না হয় যে, গ্রানাডার দিকে যারা গেছে, তারা ভীরু ও কাপুরুষ। সবচেয়ে বড় কথা হল, তোমরা যদি পরাজিত হও তাহলে আল্লাহর সামনে তোমরা কী জবাব দেবে?’
যায়েদ বিন কুসাদা এতটুকু বলার সাথে সাথে বার্বার সিপাহীরা উচ্চস্বরে বলে উঠল, ‘যায়েদ! আমরা আপনার সাথে আছি…, আমরা আপনার সম্মুখেই থাকব…, আমরা কখনই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করব না…।’
এই যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে ঐতিহাসিক প্রফেসর ডোজি লেখেন, যায়েদ বিন কুসাদা ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন, তিনি ঘোড়াকে কেবলামুখী করে অবনত মস্তকে দুআর জন্য হাত উঠালেন। তার ঠোঁট নড়ছিল। জানা নেই, তিনি কী বলে আল্লাহর কাছে বিজয় কামনা করেছিলেন। ধীরে ধীরে তার মাথা আসমানের দিকে উঁচু হতে লাগল। সেই সাথে তিনি উভয় হাত আসমানের দিকে প্রসারিত করে ধরলেন। কিছুক্ষণ পরই তার হাত ও মাথা তরিগতিতে নিচের দিকে নেমে এলো। মুনাজাত শেষ না করেই তিনি উচ্চ আওয়াজে বলতে লাগলেন, “হে ইসলামের রক্ষকগণ! আল্লাহ তাআলা আমাকে বিজয়ের সুসংবাদ দান করেছেন।’
তারপর তিনি নিচে নেমে এসে প্রায় একশত জানবাজ বাবার মুজাহিদকে পৃথক করে তাদেরকে বিশেষ নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ অনুযায়ী তারা যে রাস্তা দিয়ে এখানে এসেছিল সে রাস্তা দিয়ে পিছনে চলে গেল। কিছু দূর যাওয়ার পর তারা একদিকে মোড় নিয়ে উঁচু-নিচু টিলার মাঝে অদৃশ্য হয়ে গেল।
জেনারেল থিয়োডুমির ইতিপূর্বে দুইবার মুসলিম বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। তারিক বিন যিয়াদ যে কৌশল অবলম্বন করে তার বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিলেন, সে কৌশল এখনও তার মনের পর্দায় ভেসে বেরাচ্ছিল। তাই সে তার জুনিয়র কমান্ডারদেরকে কঠোরভাবে নিষেধ করে বলল, ‘মুসলিম বাহিনী হামলা করার পর যদি পিছু হটে যায় তাহলে তোমরা তাদের পিছু নিবে না; তোমরা পিছনের দিকে চলে আসবে।‘
থিয়োডুমির তার কমান্ডার ও সৈনিকদেরকে এ ধরনের আরও কিছু নির্দেশনা দিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার হুকুম দিলেন।
অপর দিকে যায়েদ তার সৈন্যদেরকে বললেন, ‘তোমরা যে ক্লান্ত-শ্রান্ত এটা যেন দুশমনের কাছে প্রকাশ না পায়। দুশমনের যে সৈন্য এখানে রয়েছে তার অধিকাংশ রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে এসেছে। তারা সকলেই বার্বারদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত। সুতরাং এমনভাবে লড়তে হবে যেন তাদের সে ভয় আরও বেড়ে যায়। এমন যেন না হয় যে, উল্টো আমাদের মাঝেই তাদের সম্পর্কে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে।’
ঐতিহাসিক লেনপোল এবং সবচেয়ে সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিক উইলিয়াম স্কাট সর্বসম্মতক্রমে লেখেন যে, উভয় বাহিনীর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, মুসলিম বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবে। মুসলিম বাহিনীর বিজয় শুধু এভাবেই হতে পারে যে, তাদের সেনাপতি কোন বিশেষ কৌশল অবলম্বন করবেন। তবেই থিয়োডমির বাহিনীকে পরাজিত করা সম্ভব। এমন কোন সম্ভাবনা আপাত দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছিল না। বিজয়ের সকল সম্ভাবনা থিয়োডুমিরের পক্ষেই ছিল। থিয়োডুমিরও একশ ভাগ নিশ্চিত ছিল যে, বিজয় তারই হবে।
জেনারেল থিয়োডুমির তার বাহিনীকে এমন এক জায়গায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল, যার ডানে-বায়ে উঁচু উঁচু ঢিলা ও বড় বড় পাথর ছিল। ফলে তার বাহিনীর উভয় বাহু নিরাপদ ছিল।
যায়েদ বিন কুসাদা তার বাহিনীকে তিনভাগে ভাগ করলেন। তিনি মধ্যভাগকে সম্মুখে পাঠালেন, আর নিজে পিছনে থাকলেন। বিপরীত দিক থেকে গ্রানাডার দ্বিগুণসংখ্যক সৈন্য সামনে অগ্রসর হল। তাদের একেবারে পিছনে ছিল থিয়োডুমির।
মুসলিম বাহিনী রণহুঙ্কার ছেড়ে আল্লাহু আকবার বলে দ্রুতগতিতে সামনে অগ্রসর হল। বিপরীত দিক থেকে আন্দালুসিয় বাহিনীও তেড়ে এলো। উভয় বাহিনী মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হল। আন্দালুসিয় সৈন্যরা বুঝতে পারছিল না যে, মুসলিম বাহিনী ধীরে ধীরে পিছনে চলে যাচ্ছে। আন্দালুসিয় বাহিনী যুদ্ধের তালে তালে সামনে অগ্রসর হয়ে চলছিল। থিয়োডুমির বহুদূর পিছন থেকে চিৎকার করছিল এবং কাসেদের মাধ্যমে সংবাদ পাঠাচ্ছিল, তারা যেন সামনে অগ্রসর না হয়।
তুমুল তালে যুদ্ধ চলছে। হঠাৎ ডান ও বামের টিলা আর বড় বড় পাথরের পিছন থেকে আন্দালুসিয় বাহিনীর উপর তীরবৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, আশপাশের টিলা আর পাথরখণ্ডগুলো আগ্নেয়গিরির লাভা উদ্গিরণ করছে। সেই সাথে টিলার পিছন থেকে বার্বার অশ্বারোহী বাহিনী বের হয়ে দ্রুতবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে আন্দালুসিয় বাহিনীর পিছনে চলে গেল। পিছন দিক থেকে তারা অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ আক্রমণ করল। টিলার পিছন থেকে ছুটে আসা তীর ও বর্শার আঘাতেই আন্দালুসিয় বাহিনী নাকাল হচ্ছিল বেশি। তীর থেকে বাঁচার জন্য সৈন্যরা দিগবিদিক ছুটতে লাগল। অবশিষ্ট কাজ মুসলিম অশ্বারোহীরা পূর্ণ করল।
ঐতিহাসিক লেনপোল এবং উইলিয়াম স্কাট লেখেন, আন্দালুসিয় সৈন্যদের মনে মুসলমানদের ব্যাপারে যে ত্রাস ছড়িয়ে ছিল, তা তীর-বর্শার চেয়েও বেশি ক্রিয়াশীল ছিল। অন্য রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে আসা সৈন্যরা এতটাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল যে, মুহূর্তের মাধ্যে যুদ্ধের চিত্ৰই পাল্টে গেল।
