মুসলিম সিপাহীদের ছোট ছোট কয়েকটি দল দুর্গের ফটক পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তারা ফটক ভাঙ্গার চেষ্টা করল।
মুসলিম বাহিনী অত্যন্ত বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে লড়াই করছিল। মনে হচ্ছিল, তারা গোটা দুর্গ প্রাচীরসহ উপড়ে ফেলে দেবে। মুসলিম বাহিনী সম্পর্কে আন্দালুসিয়দের মনে যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল, তা পুনরায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। দুর্গের সিপাহীদের মনোবল ভেঙ্গে পড়তে লাগল।
মুসলিম বাহিনী যে তীর নিক্ষেপ করছিল তার কিছু কিছু লক্ষভ্রষ্ট হয়ে দুর্গের ভিতর গিয়ে পড়ছিল। এ কারণে শহরের অধিবাসীদের মাঝেও ত্রাস ছড়িয়ে পড়ল। তারা দুর্গের মাঝে এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করল যে, দুর্গের সিপাহীদের মনোবল যতটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও নিঃশেষ হয়ে গেল। নিরুপায় হয়ে দুর্গপতি ফটক খোলে দেওয়ার হুকুম দিল।
মুসলিম বাহিনী দুর্গে প্রবেশ করল। বড় ধরনের রক্তপাত ও ক্ষয়-ক্ষতি ছাড়াই অটিডোনার দুর্গ মুসলিম বাহিনীর করতলগত হল।
****
সামনে আছে আরও দুটি বড় শহর মালাগা ও মুরসিয়া। মালাগার সিপাহীরা অত্যন্ত সাহসের পরিচয় দিল। মুসলিম বাহিনী যখন মালাগা দুর্গের সামনে এসে পৌঁছল তখন তারা দেখতে পেল, আন্দালুসিয়ার বাহিনী দুর্গের বাইরে এসে রণসাজে সজ্জিত হয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
থিয়োভুমিরের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা এই যুদ্ধকৌশল অবলম্বন করেছিল। অনেকটা থিয়োডুমিরের প্রলোভনের কারণেও তারা দুর্গবন্দী হয়ে যুদ্ধ করার পরিবর্তে উন্মুক্ত রণাঙ্গনে যুদ্ধ করতে চাচ্ছিল। কিন্তু তাদের জানা ছিল না যে, তারা এমন এক সম্প্রদায়ের সাথে লড়াই করতে নামছে, যুদ্ধ-বিগ্রহ যাদের মজ্জাগত ব্যাপার। জন্মের পর থেকেই যাদেরকে যুদ্ধকৌশল শিক্ষা দেওয়া হয়।
যায়েদ বিন কুসাদা ছিলেন আরবী। এটা সেই সময়ের ইতিহাস বলা হচ্ছে যখন অন্যান্য জাতি-গোষ্টির অন্তরে আরবদের আক্রমণাত্মক হামলার আতঙ্ক বিরাজ করত। সালার যায়েদ বিন কুসাদা তারিক বিন যিয়াদের মতো বিশেষ রণকৌশলে আন্দালুসিয় সৈন্যদেরকে এমনভাবে পিছন দিকে তাড়িয়ে নিয়ে গেলেন যে, তাদের পিঠ দেয়ালে লেগে গেল। আন্দালুসিয় সৈন্যরা নিজেদের ঘোড়ার খুড়ের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হতে লাগল। মুসলিম সৈন্যরা তাদেরকে কেটে টুকরো টুকরো করতে লাগল।
সালার যায়েদ বিন কুসাদা আন্দালুসিয় বাহিনীকে যুদ্ধে ব্যস্ত রেখে কিছু সৈন্যকে ফটক ভাঙ্গার জন্য পাঠিয়ে দিলেন।
আন্দালুসিয় সৈন্যরা দুর্গ থেকে বের হয়ে অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল ঠিকই; কিন্তু তারা দুর্গ রক্ষা করার মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ভুলে গিয়েছিল। দুর্গের বাইরে আন্দালুসিয় সৈন্যরা মুসলিম সৈন্যদের হাতে কচুকাটা হচ্ছিল। আর ওদিকে কয়েকজন জানবাজ সিপাহী দুর্গের ফটক ভেঙ্গে দুর্গ দখল করে নিল। সাথে সাথে সকল সিপাহী হাতিয়ার ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করল।
জেনারেল থিয়োডুমিরের জ্বালাময়ী ভাষণ কোন কাজে এলো না। আসলে তীর-তলোয়ারের ঝনঝনানির সামনে বাক্য-বান লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়ে।
এই শহর দুটি বিজিত হওয়ার পর মুসলিম বাহিনীর সামনে একমাত্র লক্ষ্য ছিল গ্রানাডা। জেনারেল থিয়োডুমির স্বয়ং এই শহরে উপস্থিত ছিল। ধারণা করা হচ্ছিল, সে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। কারণ, প্রথমত সে তার পরাজয়কে বিজয়ে রূপান্তরিত করতে চাচ্ছিল। দ্বিতীয়ত তার দৃষ্টি ছিল, আন্দালুসিয়ার রাজমুকুট আর শাহীসিংহাসনের উপর। মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করার সব রকম প্রস্তুতিই সে গ্রহণ করেছিল। সে নিজেও দুর্গবন্দী হয়ে যুদ্ধ করতে পছন্দ করত না, তাই সে তার বাহিনীকে গ্রানাডা থেকে কয়েক মনজিল দূরে অবস্থিত ওরিহুয়েনা নামক উপশহরে নিয়ে এলো এবং সেখানেই যুদ্ধ করার মনস্থ করল।
কোন ঐতিহাসিকই থিয়োডুমির ও যায়েদবিন কুসাদার সৈন্যসংখ্যা লেখেননি। তারা শুধু এতটুকুই উল্লেখ করেছেন যে, আন্দালুসিয়ার সৈন্যবাহিনীর তুলনায় যায়েদ বিন কুসাদার সৈন্যসংখ্যা ছিল একেবারেই অপ্রতুল। আন্দালুসিয় বাহিনীর সাথে সাধারণ মানুষও বিপুল সংখ্যায় যোগ দিয়েছিল। সংখ্যার সল্পতা সত্ত্বেও মুসলিম বাহিনীর আরেকটি বড় দুর্বলতা ছিল এই যে, তারা লাগাতার যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত-অবসন্ন হয়ে পড়েছিল। তাদের দেহে যুদ্ধ করার মতো উদ্যম ছিল না। তারা তাদের আধ্যাত্মিক শক্তির বলে বলিয়ান হয়ে গ্রানাডার উপকণ্ঠে এসে পৌঁছল।
গ্রানাডা পৌঁছে যখন তারা দেখল যে, শত্রুবাহিনী যুদ্ধসাজে সজ্জিত হয়ে তাদের অপেক্ষা করছে তখন তারা কোন রকম বিশ্রাম করা ছাড়াই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল।
যায়েদ বিন সাদা শত্রুবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত দেখতে পেয়ে তার বাহিনীকে থামিয়ে দিলেন। তারপর সামান্য উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে আন্দালুসিয় বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ও তাদের যুদ্ধকৌশল অনুমান করতে চেষ্টা করলেন।
থিয়োভূমির জানত যে, মুসলিম বাহিনীর আল্লাহু আকবার ধ্বনি আর রণহুঙ্কার তার বাহিনীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলে। এর প্রতিকার স্বরূপ সে তার বাহিনীর জন্য বিশেষ ধরনের রণহুঙ্কারের ব্যবস্থা করল। সেই সাথে তার জুনিয়র কমান্ডাররা মুসলিম বাহিনীকে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য আহ্বান করতে শুরু করে দিল। সেনাপতি যায়েদ বিন কুসাদা বুঝতে পারলেন যে, শত্রুপক্ষ দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। প্রতিটি সৈন্যই যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য টগবগ করছে। তাদের উৎসাহ-উদ্দিপনাই বলে দিচ্ছে, তারা জীবন দিতে ও জীবন নিতে প্রস্তুত। যায়েদ বিন কুসাদা এই ভেবে কিছুটা চিন্তিত ছিলেন যে, তার বাহিনীর প্রতিটি সিপাহীই ক্লান্ত। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকা সম্ভব নয়। আর পালিয়ে যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। তাই যায়েদ বিন কুসাদা সেই উঁচু স্থান থেকেই চিৎকার করে তাঁর সিপাহীদেরকে বলতে লাগলেন,
