‘রাচমান্ড তো পাগল।’ থিয়োডুমির জবাব দিল।
‘তার মা তো আর পাগল নয়।’ অফিসার বলল। তাছাড়া ইউগুবেলজিও আপনার মতো জেনারেল। সে সবসময় টলেডো থেকেছে। রডারিকের রানী তাকে সব সময় নিজের কাছে রাখতে পছন্দ করে। তাছাড়া সিপাহীদের মাঝেও তার জনপ্রিয়তা খুব বেশি। সে সেনাবাহিনীকে আপনার বিরুদ্ধে এবং রানীর পক্ষে উসকে দেবে। সে রাচমান্ডকেই সিংহাসনে বসাবে। আপনি যদি তার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেন তাহলে আপনাকে হত্যা করা হবে। অন্যথায় গৃহযুদ্ধ শুরু হবে।
এদিকে হানাদার বাহিনী যখন একের পর এক যুদ্ধে বিজয় লাভ করে সামনে অগ্রসর হয়ে আসছে, এমন সময় আপনি কি চান যে, রাজ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হোক? জেনারেল থিয়োডুমির! আপনি কি শত্রুবাহিনীর জন্য গোটা রাজ্য দখল করা সহজ করে দিতে চান?
থিয়োডুমির অফিসারের কথা শুনে এমনভাবে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল যেন মনে হল, অফিসার একজন বদ্ধপাগল। থিয়োডুমির তার কথার কোন জবাবই দিতে চাচ্ছিল না।
‘এটা পরে দেখা যাবে। থিয়োডুমির বলল। এখন প্রথম বিষয় হল, সেনাবাহিনীকে সুবিন্যস্ত করা। গ্রানাডা পর্যন্ত পৌঁছতে হানাদার বাহিনীকে যে কয়টি দুর্গ ও শহর অতিক্রম করতে হবে সেগুলোর হিসাব করে সে অনুপাতে সেখানে সৈন্য পাঠাতে হবে।
গ্রানাডা পৌঁছতে পথে চারটি গুরুত্বপূর্ণ শহর পড়ে। সেগুলো হল, আটিডোনা, মালাগা, মুরসিয়া, ওরিহুয়েনা। ওরিহুয়েনার অবস্থান ছিল গ্রানাডার উপকণ্ঠে।
থিয়োডুমির এসকল জায়গায় ঝটিকা সফর করল। সে প্রতিটি শহরের সৈন্যদের খোঁজ-খবর নিল এবং তাদেরকে লক্ষ্য করে একই রকম জ্বালাময়ী ভাষণ প্রদান করল :
‘ঐ শাহানশা রডারিক মৃত্যুবরণ করেছে, যে আন্দালুসিয়াকে নিজের পৈত্রিক জায়গির মনে করত। আর তোমাদেরকে মনে করত তার কেনা গোলাম। আন্দালুসিয়া তোমাদের রাজ্য। আন্দালুসিয়ার জমিতে উৎপাদিত প্রতিটি শস্যদানা তোমাদের। রক্ত পানি করে উপার্জন করা প্রতিটি পয়সার মালিকও তোমরা। এখন থেকে তোমাদের জমির উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক আর কেউ জোর করে নিয়ে যেতে পারবে না। তোমাদের হাতে তৈরী প্রতিটি বস্তুর সম্পূর্ণ মূল্য তোমরাই পাবে। তোমরা যারা সেনাবাহিনীতে আছ, তোমাদের বাপ-ভাই ও সন্তানদের থেকে কোন প্রকার কর আদায় করা হবে না। কোন সিপাহী যদি লড়াই এ আহত হয় তাহলে আজীবন তাকে তার নির্ধারিত বেতন-ভাতা প্রদান করা হবে। আর কেউ যদি নিহত হয় তাহলে তার বাবা-মা বা তার স্ত্রী কিংবা সন্তানদেরকে এক সাথে মোটা অংকের টাকা প্রদান করা হবে।’
প্রতিটি স্থানে সিপাহীরা ধিয়োডুমিরের ভাষণ শুনে সমস্বরে চিৎকার করে তাকে মোবারকবাদ জানাত, আর বলত :
‘থিয়োডুমির জিন্দাবাদ, আন্দালুসিয়া জিন্দাবাদ।‘
তাদের প্রশংসা-ধ্বনি শেষ হলে থিয়োডুমির পুনরায় তার ভাষণ শুরু করত :
‘আফ্রিকার বাবার মুসলিম বাহিনী তোমাদের মুলুক ও তোমাদের ঘর-বাড়ী লুট করতে এসেছে। তারা তোমাদের মেয়ে-বোন ও যুবতী স্ত্রীদেরকে ধরে নিয়ে যাবে এবং তাদেরকে তোমাদের সামনে বেআবরু করবে। এ ডাকাতরা দশ-বার বছরের বাচ্চাদেরকেও ধরে নিয়ে যায়। যদি তোমরা তাদের হাত থেকে তোমাদের ধন-সম্পদ, আর মান-ইজ্জত বাঁচাতে চাও তাহলে জীবনবাজি রেখে লড়াই কর। দুশমনের ভয় অন্তর থেকে বের করে দাও। তারা এত বড় বাহাদুর নয়, যতটা তোমরা শুনেছ। যেসব সিপাহী পরাজিত হয়ে পালিয়ে এসেছে তারা তো বলবেই যে, মুসলিম বাহিনী মানুষ নয়; জিন-ভূত। এটা সম্পূর্ণ ভুল কথা, তারা তোমাদের মতোই মানুষ। পৃথিবীতে যদি কোন বাহাদুর থেকে থাকে তাহলে তোমরাই আছ।‘
থিয়োডুমির যাদের সামনে ভাষণ দিচ্ছিল, তারা জানত না যে, সে সর্বপ্রথম মুসলিম বাহিনীর সাথে লড়াই করে পরাজিত হয়েছে এবং কোন রকমে জীবন নিয়ে পালিয়ে এসেছে। সে তার বাহিনীকে বার্বারদের দয়া-দক্ষিণার উপর ছেড়ে এসেছে। রডারিকের সাথেও সে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিল। রডারিকের বাহিনী পরাজিত হলে সে অতি গোপনে পালিয়ে গ্রানাডা এসে আশ্রয় নিয়েছে। আর এখন সে বড় বড় কথা বলে ভাষণ দিচ্ছে। এখন সে বলছে, মুসলিম বাহিনী জিন-ভূতের বাহিনী নয়। অথচ সে-ই প্রথম মুসলিম বাহিনীকে জিন-ভূতের বাহিনী আখ্যায়িত করে রডারিকের নিকট চিঠি লেখেছিল।
সেই খিয়োড়মিরই এখন গ্রানাডা থেকে বের হয়ে তার বাহিনীর মাঝে সাহস ও মনোবল সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
***
থিয়োডুমির গ্রনাডা পৌঁছার পূর্বেই যায়েদ বিন কুসাদা দুর্ভেদ্য প্রাচীরে ঘেরা উপশহর আটিডোনা পৌঁছে যান। তিনি তার বাহিনীকে সামান্য বিশ্রামের সুযোগ না দিয়ে তুফানের বেগে দুর্গ অবরোধ করেন। প্রাচীরের উপর তীরন্দাজ ও বর্শা নিক্ষেপকারী বাহিনী প্রস্তুত ছিল। তারা অবিরাম তীর-বর্শা নিক্ষেপ করতে লাগল।
মুসলিম বাহিনীর ধনুক ছিল অত্যন্ত মজবুত। এসকল ধনুক দ্বারা বহুদূর থেকে তীর নিক্ষেপ করে লক্ষ্য ভেদ করা সম্ভব ছিল। প্রাচীরের উপর থেকে যে তীর নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, তা মুসলিম বাহিনীর কাছে এসে পৌঁছত না। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর নিক্ষিপ্ত তীর সঠিক লক্ষ্যে আঘাত হানত।
মুসলিম বহিনীর রণহুঙ্কার আর তাকবীর ধ্বনি আন্দালুসিয়দের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করত। মুসলিম বাহিনী পাঁচ-ছয়জনের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে দৌড়ে দুর্গের কাছে পৌঁছে যেত। উপর থেকে কোন তীরন্দাজ কুঁকে তাদের দিকে তীর ছুঁড়তে চেষ্টা করলে বার্বার সেনাদের তীর তাকে সোজা হতে দিত না। তীরবিদ্ধ হয়ে সেই সিপাহী দুর্গপ্রাচীরের উপরই লুটিয়ে পড়ত, কিংবা নিচে পড়ে যেত। মুসলিম বাহিনীর একমাত্র চেষ্টা ছিল রশির সাহায্যে প্রাচীরের উপর আরোহণ করা বা প্রাচীর ভাঙ্গার মতো সুযোগ সৃষ্টি করা।
