ওদিকে উত্তর আফ্রিকার রাজধানী কায়রোয়ানে আমীর মুসা বিন নুসাইর আঠার হাজার সিপাহী একত্রিত করলেন। তিনি ইতিপূর্বে খলীফা আবদুল মালেক বিন মারওয়ানের নিকট থেকে আন্দালুসিয়ার যুদ্ধে শরীক হওয়ার জন্য অনুমতি নিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল তারিক বিন যিয়াদ তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী যুদ্ধ বন্ধ করে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। মুসা বিন নুসাইর চাচ্ছিলেন, সামনের বিজয়-অভিযানে শামিল হবেন।
কিন্তু তারিক বিন যিয়াদ ও তার সালারগণ আমীর মুসা বিন নুসাইরের নির্দেশ অমান্য করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। আমীরের নির্দেশ অমান্য করার কারণে আন্দালুসিয়ার ইতিহাসে আরেকটি নতুন অধ্যায় রচিত হচ্ছিল।
৬. যায়েদ বিন কুসাদা
০৬.
যায়েদ বিন কুসাদাকে তারিক বিন যিয়াদ যেদিকে প্রেরণ করেছিলেন, সেদিকে ছিল আন্দালুসিয়ার এক বড় শহর গ্রানাডা। আন্দালুসিয়ার বিখ্যাত জেনারেল থিয়োডুমির তারিক বিন যিয়াদের হাতে কাকা উপত্যাকায় পরাজিত হয়ে পালিয়ে গ্রানাডা এসে আশ্রয় নিয়েছিল। সে মুসলিম বাহিনীর বিজয়-সংবাদ শুনতে পাচ্ছিল। সে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে গ্রানাডার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্ভেদ্য করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছিল।
গ্রানাডার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এমনিতেই অত্যন্ত দুর্ভেদ্য ছিল। শহর-রক্ষা প্রাচীরের কোথাও কোন ক্রটি ছিল না। দুর্গে সৈন্যও ছিল প্রচুর। শুধু একটি অভাবই থিয়োডুমিরকে বিচলিত করছিল। আর তা হল, সেনাবাহিনীর লড়াই করার কোন স্পৃহাই ছিল না। তারা একেবারেই হীনমনোবল হয়ে পড়েছিল। মুসলিম বাহিনীর একের পর এক বিজয় আন্দালুসিয় বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে দিয়েছিল। দুর্গের সিপাহীদের মনোবল ভাঙ্গার জন্য পিছনের রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে আসা সিপাহী ও সাধারণ লোকজনই যথেষ্ট ছিল। মুসলিম বাহিনী সম্পর্কে তারা এমনভাবে কথাবার্তা বলত যে, মনে হত, মুসলিম বাহিনী কোন জিন-ভূতের দল।
রডারিকের মৃত্যু সংবাদ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। সাধারণ মানুষ রডারিককে বীরপুরুষ ও অকুতোভয় যোদ্ধা মনে করত। তার ব্যাপারে মশহুর ছিল, সে মহলে জালিম বাদশাহ, আর রণাঙ্গনে মহাবীর। কোন বাদশাহই তাকে পরাজিত করতে সক্ষম হবে না। এ জন্য মানুষের প্রবল ধারণা ছিল, রডারিক মারা যাইনি; সে এখনও জীবিত আছে। দ্রুতই সে ফিরে আসবে। অনেকে তো এমনও বলছিল, সে যদি মরেও গিয়ে থাকে তাহলেও সে ফিরে আসবে। তবে প্রত্যেকেই এমন ধারণা করত না। যারা এমনটি ধারণা করত না তারা বলত, মুসলিম বাহিনীর প্রতিটি সৈনিকই ভয়ঙ্কর রকম যুদ্ধবাজ। তারা শুধু রডারিককে পরাজিতই করেনি; বরং তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে।
আন্দালুসিয় বাহিনীর এই মানসিক অবস্থা থিয়োডুমিরের জন্য অনেক বড় চিন্তার কারণ ছিল। সে একবার মুসলিম বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়েছিল। সেই পরাজয়কে বিজয়ে পরিণত করার জন্য সে অস্থির ছিল। সেই সাথে আন্দালুসিয়ার বাদশাহ হওয়ার খোয়াবও তার মনে উঁকি দিচ্ছিল। ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন, থিয়োডুমির বাদশাহ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তার অধীনস্থ সেনা-অফিসারদেরকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখাচ্ছিল। সে তারদেরকে বলছিল,
‘এখন দেশে কোন বাদশাহ নেই। যে বিজয় অর্জন করতে পারবে, সেই বাদশাহ হবে। আফ্রিকার বার্বাররা লুটতরাজের জন্য এসেছে। তারা একটি জায়গায়ও যদি পরাজিত হয় তাহলেই পালিয়ে যাবে। তখন এই রাজ্য হবে আমাদের। তোমরা আমার স্থলাভিষিক্ত হবে, আর আমি হব রডারিকের স্থলাভিষিক্ত। তোমাদের সকলকেই সেনাবাহিনীর বড় বড় অফিসার বানাব। রডারিকও এভাবেই বাদশাহ হয়েছিল। তবে প্রথম শর্ত হল, হানাদার বাহিনীকে এই রাজ্য থেকে বিতাড়িত করতে হবে।’
ফৌজি অফিসারদের জন্য এতটুকু ইঙ্গিতই যথেষ্ট ছিল। তারা বড় বড় পদের আশায় হানাদার বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করার জন্য পূর্ণরূপে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগল।
‘তোমরা সকলেই ওছেন যে, বার্বারদের বাহিনী গ্রানাডার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। থিয়োডুমির বলল। এখন তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল, তারা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে তিন দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একটি দল গ্রানাডার দিকে আসছে। তাদেরকে সমুলে ধ্বংস করতে হবে। যদি আমরা এই বাহিনীকে ধ্বংস করতে পারি তাহলে আমরা সামনে অগ্রসর হয়ে তাদের দ্বিতীয় অংশের উপর আক্রমণ করব, যারা কর্ডোভার দিকে গেছে। তারপর টলেডোর দিকে যে দল গেছে তাদেরকে সহজেই খতম করতে পারব।
এই বার্বার বাহিনীকে পরাস্ত করার একটি পদ্ধতি আমি চিন্তা করে রেখেছি। তা হল গ্রানাডার দিকে যে দলটি অগ্রসর হচ্ছে, আমরা তাদরেকে পথিমধ্যে স্থানে স্থানে আক্রমণ করে এতটাই ব্যতিব্যস্ত রাখতে চেষ্টা করব যেন, তারা গ্রানাডা পৌঁছতেই না পারে। আর যদি গ্রানাডা পৌঁছেও যায় তাহলে তাদের সৈন্যসংখ্যা হবে খুবই কম এবং তারা থাকবে ক্লান্ত-শ্রান্ত। তখন আমরা তাদেরকে দ্রুত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করতে পারব।’
‘আপনার পরিকল্পনা খুবই উত্তম।’ একজন উচ্চপদস্থ সেনা-অফিসার বলল। ‘আমরা বার্বারদের গ্রানাডা অবরোধ করার সুযোগই দেব না। গ্রানাডা থেকে দূরে উন্মুক্ত প্রান্তরে তাদের সাথে যুদ্ধ হবে।’
‘আপনি রডারিকের আসনে আসীন হবার কথা বলছিলেন, আপনি কি ভুলে গেছেন যে, রডারিকের একজন নওজোয়ান পুত্র আছে? তার নাম হল, রাচমান্ড। তার বর্তমানে আপনি আন্দালুসিয়ার মুকুট কীভাবে পরিধান করবেন?
