প্রবল ঝড়-তুফান আর ঝবায়ু উপেক্ষা করে মুগীস আর-রুমী সাতশ অশ্বারোহীকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে, বা কোথাও বজ্রপাত হলে ঘোড়াগুলো ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে এদিক-সেদিক ছুটতে চেষ্টা করত। কিন্তু অশ্বারোহী মুজাহিদগণ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ঘোড়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখছিলেন। তুফানের সাথে প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টি অশ্বারোহীদের চেহারা ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছিল।
কর্ডোভা নগরীর অবস্থান ‘এ্যাশবেলিয়া নদীর অববাহিকায়। মুসলমানগণ এই নদীর নাম রেখেছিলেন কর্ডোভা নদী। এখনও এই নদীর অস্তিত্ব আছে। অশ্বারোহীদেরকে প্রাচীর থেকে দূরে রাখা প্রয়োজন ছিল, তাই নদীর যেখানে হাঁটু পানি ছিল সেখানে ঘোড়াগুলোকে রাখা হল। নদী উপর দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়ার জন্য কোন সমম্যা ছিল না। আসল সমস্য ছিল, মুষলধার তুফান আর শিলাবৃষ্টি।
পাহারাদাররা প্রাচীরের চোরা কুঠরিতে আশ্রয় নিয়েছিল। মুগীস আর-রুমী তাঁর চারজন সহযোগীসহ প্রাচীরের সেই স্থানে গিয়ে পৌঁছলেন যেখানে প্রাচীর সামান্য ভাঙ্গা ছিল এবং গাছের ডাল সেই প্রাচীরের উপর পড়ে ছিল।
‘সালার!’ আবু আতীক চাঁপা আওয়াজে বললেন। প্রাচীর ভাঙ্গার প্রয়োজন নেই। আমি রশী সাথে এনিছি, আমাকে গাছে উঠতে দিন।
আবু আতীক রশি নিয়ে গাছে উঠে পড়লেন এবং ডাল বেয়ে প্রাচীরের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। মুষলধার বৃষ্টির কারণে গাছের ডাল ভিজে পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল। পা পিছলে পড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। সেই সাথে প্রচণ্ড বাতাসের ঝাঁপটা ডালটাকে স্থির থাকতে দিচ্ছিল না।
আবু আতীক গাছের মগডালে চেপে বসলেন। প্রচণ্ড তুফানী বাতাসে ডাল একদিকে কাত হয়ে পড়ল। পর মুহূর্তে ডাল আবার নিজ স্থানে ফিরে এলে তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেয়ালের উপর লাফিয়ে পড়লেন। দেয়ালও বৃষ্টির কারণে পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছিল। টাল সামলাতে না পেরে তিনি দেয়াল থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলেন। দেয়ালের শেষ প্রান্তে এসে অলৌকিকভাবে তার দেহ আটকে গেল। অল্পের জন্য তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেন।
আবু আতীক দ্রুত হাতে তার শরীরে পেচাননা রশি খোলে রশির এক মাথা প্রাচীরের খুঁটির সাথে বেঁধে বাকী অংশ নিচে নামিয়ে দিলেন। সাথে সাথে সাত-আটজন সিপাহী রশি ধরে ঝুলে প্রাচীরের উপর উঠে এলো। তাদের প্লান ছিল নদীর দিকে দুর্গের যে দরজা আছে, তা তারা উনাক্ত করে দেবে। তারা তলোয়ার বের করে প্রহরীদের একটি কুঠরিতে ঢুকে পড়ল। কুঠরিতে মশাল জ্বলছিল। চারজন প্রহরী আরামে বসে গল্পগুজব করছিল। মুজাহিদরা তাদেরকে সামান্য সুযোগ দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল।
এমনিভাবে আরও চারটি কুঠরিতে তারা হানা দিয়ে প্রত্যেকটির প্রহরীকে হত্যা করে ফেলল। তারপর সিঁড়ি বেয়ে ফটকের কাছে চলে এলো। ফটকে কয়েকজন প্রহরী ছিল। তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলল। মুজাহিদগণ তাদরেকে হত্যা করে ফটক খোলে দিল। তার পর আবু আতিক বাইরে গিয়ে মশাল জ্বালিয়ে সংকেত দেওয়ার সাথে সাথে মুসলিম অশ্বারোহীগণ নদী থেকে বের হয়ে তুফানের গতিতে দুর্গে প্রবেশ করল।
দুই-তিনজন আন্দালুসিয় সিপাহীকে ধরে গাইড বানানো হল। সকল সিপাহীই ঘুমিয়ে ছিল। ছাউনিগুলোতে আগুন লাগিয়ে প্রতিটি সিপাহীকে চিরদিনের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হল। যারা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করল তারাই শুধু বাঁচতে পারল। শহরের অধিবাসীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলার কোন সুযোগই পেল না।
ঐতিহাসিক এস.পি.স্কাট লেখেন, সকাল বেলা পূর্বাকাশ ফর্সা হয়ে ঝড়-বৃষ্টি একেবারে থেমে গেল। শহরের অধিবাসীরা ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখল, দুর্গ মুসলিম বাহিনীর দখলে চলে গেছে। কিন্তু দুর্গের ভিতর আরেকটা দুর্গ ছিল। সেটা এখনও মুসলিম বাহিনীর দখলে আসেনি। এটা ছিল খ্রিস্টান ধর্ম যাজকদের কেন্দ্র। এর ভিতরে বহুত বড় একটি গির্জা ছিল। পাশেই ছিল পাদ্রিদের ও যাজিকাদের আবাসস্থল এবং ধর্মীয় পাঠশালা। এই বিশাল-বিস্তৃত দুর্গের চতুর্পাশের প্রাচীর ছিল অনেক উঁচু, আর ফটক ছিল লৌহ নির্মিত। প্রাচীরের চতুর্পাশে তীরন্দাজরা মোর্চা বানিয়ে ওঁৎ পেতে ছিল।
স্কাট লেখেন, কর্ডোভার গভর্নর চল্লিশজন রক্ষিসেনা নিয়ে এই দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিল। তার সাথে চারশ সিপাহীও ছিল। মুগীস গভর্নরকে লক্ষ্য করে ঘোষণা করলেন, বাইরে এসে আত্মসমর্পণ কর তাহলে নিরাপত্তা পাবে, আর মুকাবেলা করলে কঠিন শাস্তি পাবে।’
‘দুর্গপ্রাচীর ও ফটকের কাছে এসে দেখ, কে শাস্তি পায়।’ গভর্নর প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে জবাব দিল। বাঁচতে চাইলে এই শহর থেকে বের হয়ে যাও।’
দুর্গে প্রবেশ করার জন্য মুগীস বহু চেষ্টা করলেন, কিন্তু কোন উপায় খুঁজে পেলেন না। তাকে বলা হল, এই দুর্গের ভিতর ফল-মুল ও খাদ্য-দ্রব্য এত বিপুল পরিমাণে মওজুদ আছে যে, কয়েক মাসেও তা খতম হবে না।
প্রায় এক মাস পর মুগীস জানতে পারলেন যে, শহরের ভিতরে যে ঝর্ণা আছে তার পানি ঐ দুর্গের ভিতরে যায়। দুর্গের লোকেরা এই পানিই পান করে। মাটির নিচে প্রধিত পরনালার মাধ্যমে এই পানি দুর্গে যায়। মুগীস নালার মুখ বন্ধ করে দিলেন। এর তিন-চারদিন পরই দুর্গের ফটক খোলে দেওয়া হল।
মুগীস আর-রুমি প্রথমেই গভর্নরের গর্দান উড়িয়ে দিলেন। তারপর দুর্গের ভিতর যেসকল ফৌজি অফিসার ছিল তাদের সকলকে হত্যা করলেন। যেসকল তীরন্দাজ দুর্গপ্রাচীরের উপর অবস্থান নিয়েছিল তাদেরকে যুদ্ধবন্দী করা হল। শহরের অধিবাসীদেরকে কোন কিছুই বলা হল না। ধর্ম যাজিকাদেরকে মুক্ত করে দেওয়া হল।
