হে আমার আল্লাহ! তুমি আমাকে সাহস ও হিম্মতদান কর, যেন আমি তোমার একত্ববাদ ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালতের বাণী নিয়ে এ দুর্গে প্রবেশ করতে পারি এবং বাতিলের ঘোর অমানিশার মাঝে চিরসত্যের প্রদীপ জ্বালাতে পারি। হে দয়াময়! আমাকে তোমার দরবারে এবং আমার সাথীদের সামনে লজ্জিত করো না।’
মুগীস আর-রুমী দুআ শেষ করে আল্লাহর দরবারে প্রসারিত হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ধীরে ধীরে তার বাহিনীর কাছে গিয়ে বসে পড়লেন। সকল সিপাহী তাঁর পাশে এসে একত্রিত হল।
‘প্রিয় সংগ্রামী সাথীগণ! মুগীস আর-রুমী উচ্চস্বরে তাঁর বাহিনীকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন। আমি সিপাহসালারকে বলেছিলাম, আমাকে কেবল সাতশ অশ্বারোহী দিন আমি আপনাকে এ শহর উপহার দেব। আমি আমার দাবি ও প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার জন্য তোমাদেরকে নির্বাচন করেছি। এ প্রতিশ্রুতি আমি সিপাহসালারের নিকট করিনি, বরং স্বয়ং আল্লাহর নিকট করেছি। আমি এ ওয়াদা তোমাদের বীরত্বের উপর ভরসা করে করেছি। আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার কর, আমরা এই শহরের প্রাচীর ভেদ করে তাতে প্রবেশ করব। অন্যথায় আমরা এখানেই জীবন দিয়ে দেব। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের সাথে আছেন, তোমরা আল্লাহর সঙ্গ ছেড়ে দিও না।
‘আমরা আপনার সাথে আছি। আমরা অঙ্গীকার করছি, জীবন দিয়ে হলেও আমরা এই শহর দখল করব।’ সাতশ সিপাহী এক যোগে চিৎকার করে বলে উঠল।
***
সকাল হওয়ার সাথে সাথে মুগীস আর-রুমী একা একা বের হয়ে পড়লেন। তিনি দুর্গ ও শহর-রক্ষা প্রাচীর ভালোভাবে দেখতে চাচ্ছিলেন। হয়তো প্রাচীরের উপর উঠার বা তা ভাঙ্গার উপযুক্ত কোন জায়গা পেয়েও যেতে পারেন। ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন, এমন সময় একজন রাখাল কিছু ভেড়া-বকরী নিয়ে এদিকে আসল। সে মুগীসকে দেখে সালাম করে জিজ্ঞেস করল, “আমাদের বাদশাহকে যারা পরাজিত করেছে, আপনি কি সে বাহিনীর লোক?
মুগীস আন্দালুসিয়ার ভাষা বুঝতেন এবং কথা বলতেও পারতেন। তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ, দোস্ত! তুমি কি আমাকে তোমার দুশমন মনে কর?
‘না, আমরা খুবই গরীব মানুষ। রাখাল বলল। আমরা কাউকে দুশমন বানানোর সাহস করতে পারি না।’
মুগীস আর-রুমী রাখালের সাথে বন্ধুর মতো আলাপ করতে করতে সামনে অগ্রসর হতে লাগলেন।
‘দাঁড়ান।’ রাখাল মুগীসকে বলল। আপনারা যদি শহরের ভিতর প্রবেশ করতে চান তাহলে পিছন দিকে চলে যান। ওদিকে নদী ও খন্দক আছে। ওদিকের এক জায়গায় দুর্গের প্রাচীর সামান্য ভাঙ্গা, কিন্ত জায়গাটা খুবই উঁচু। সেই জায়গার আলামত হল, সেখানে বিশাল একটি বৃক্ষ আছে। সেই বৃক্ষের ডাল প্রাচীরের উপর গিয়ে পড়েছে। সেখান দিয়ে আপনারা প্রাচীর ভাঙ্গতে পারবেন। নিজে গিয়ে দেখে আসুন, এ কাজ করতে পারবেন কি না?
মুগীস আর-রুমী ছদ্মবেশ নিয়ে অনেক দূর ঘুরে সমুদ্রের পাড়ে পৌঁছলেন। তিনি সমুদ্র পাড় থেকেই দুর্গপ্রাচীরের সেই ভাঙ্গা স্থানটি দেখতে পেলেন। কিন্তু এই সামান্য ভাঙ্গা দিয়ে দুর্গে প্রবেশ করা সম্ভব হবে না। আরও কিছু জায়গা ভাঙ্গার প্রয়োজন হবে।
প্রাচীরের উপর পাহারাদার টহল দিচ্ছিল। মুগীস চুপি চুপি ফিরে এসে তার সালারদেরকে সবকিছু বললেন। তারা চার-পাঁচজনের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে দেয়ালের সেই ভাঙ্গা জায়গাটি দেখে এসে বলল,
‘প্রাচীরে ঐ ভাঙ্গা জায়গার চেয়ে দুর্গের নিকটবর্তী গাছই বেশি উপকারে আসবে।’ আবু আতিক নামের একজন জেনারেল বললেন। রাতের অন্ধকারে গাছের ডাল বেয়ে প্রাচীরের উপর উঠা সম্ভব হবে, কিন্তু পাহারাদারদের উপস্থিতিই সবচেয়ে ভয়ের কারণ।‘
মুগীস আর-রুমীও এই গাছের কথা চিন্তা করেছিলেন, কিন্তু তাঁর কাছে মনে হয়েছে, এই পথে বিপদ বেশি; সাফল্য কম।
ঐতিহাসিক লেনপোল নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকদের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেন, ‘মুসলিম বাহিনী যুদ্ধ-পারঙ্গমতা ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে অতুলনীয় ছিল। তাদের বিজয়ের মূল কারণও এটাই ছিল। তাদের মানসিক শক্তি ছিল প্রচুর। তাছাড়া ঐশী সমর্থনও ছিল তাদের পক্ষে। রণাঙ্গনে কখনও কখনও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো, যা তারিক বিন যিয়াদের জন্য সাফল্য বয়ে আনত।
মুগীস আর-রুমী প্রাচীরের ভাঙ্গা স্থান এবং নিকটবর্তী গাছের সন্ধান পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই ভাঙ্গা প্রাচীর আর গাছকে কাজে লাগান অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল।
প্লান-পরিকল্পনা করতে করতেই সেদিনের সূর্য অস্তমিত হয়ে গেল। রাতের আঁধারে ঢেকে গেল কর্ডোভা নগরী। কিছুক্ষণ পর শুরু হল প্রবল ঝড়ো হাওয়া। সেই সাথে বজ্রসহ বৃষ্টি। নিকষ কালো অন্ধকার রাত, তার উপর বিকট বজ্রপাতের শব্দে গোটা নগরী থরথর করে কাঁপছিল। তুফানের তোড়ে শিকড়সহ গাছ-পালা উপড়ে পড়ছিল।
মুগীস ও তার মুজাহিদ সাথীদের জন্য এ ভয়াবহ তুফানের হাত থেকে বাঁচার মতো কোন আশ্রয় ছিল না। তাদের কাছে কোন তবুও ছিল না। আর যদি থাকতও তাহলে ঝড়ো বাতাস তা উড়িয়ে নিয়ে যেত। ঘোড়াগুলো চিৎকার করে ছটফট করছিল। টিলার আড়ালে নিয়ে ঘোড়াগুলোকে কোন রকম বেঁধে রাখা হল।
মুগীস আর-রুমী উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন, এখনই দুর্গ আক্রমণ করার উপযুক্ত সময়। এ তুফান আল্লাহ তাআলার নেয়ামত। জলদি ঘোড়ায় জিন লাগিয়ে নদীর দিকে চল। এই তুফানের সময় প্রাচীরের উপর কোন পাহারাদার থাকবে না। সাথে কোদাল নিয়ে নাও।’
