কোন ঐতিহাসিকই উল্লেখ করেননি, ইসিজায় কত সংখ্যক মুজাহিদ শহীদ হয়েছেন। মুসলিম বাহিনীর ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ থেকে বুঝা যায়, শহীদগণের সংখ্যা কয়েক হাজার হবে। যদিও ইতিপূর্বের বিজয়-সংবাদ শুনে কয়েক হাজার নতুন বার্বার যোদ্ধা মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।
যাহোক, তারিক বিন যিয়াদ কর্ডোভা পৌঁছে কর্ডোভার দুর্গ অবরোধ করলেন। কিন্তু প্রথম দিনই তিনি বুঝতে পারলেন যে, শহরে প্রবেশ করা বড় কঠিন হবে। দুর্গের প্রাচীর ও ফটকের কাছে যাওয়াও ছিল আত্মহত্যার শামিল। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, দুর্গের চতুরপার্শ্বে ছিল পরিখা। তারিক বিন যিয়াদ সর্বাত্মক চেষ্টা করলেন, কিন্তু দুর্গে প্রবেশের কোন উপায়ই তিনি বের করতে পারলেন না। কেবল একটি উপায়ই অবশিষ্ট ছিল, আর তা হল, দীর্ঘ দিন দুর্গ অবরোধ করে বসে থাকা। ইতিমধ্যেই নয় দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে।
‘মুগীস!’ তারিক বিন যিয়াদ সালার মুগীসকে ডেকে বললেন। “তুমি এখানেই থাক, আমি সামনে অগ্রসর হচ্ছি। আমরা তো এ কারণই আমীরের হুকুম উপেক্ষা করেছিলাম, যেন আন্দালুসিয় বাহিনী শান্তিতে কোথাও বসতে না পারে এবং সংঘবদ্ধ না হতে পারে। সুতরাং আমি এখানে দুর্গ অবরোধ করে বসে থাকতে পারি না। দুর্গের যে অবস্থা তাতে মনে হচ্ছে, কয়েক মাস লেগে যাবে। আমি রাজধানী টলেডোর দিকে অগ্রসর হচ্ছি। আমাদের এই বাহিনীকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করে নেব। এক ভাগ তোমার সাথে থাকবে, আরেক ভাগ আমার সাথে টলেডো যাবে।’
‘বেশির ভাগ সিপাহী আপনার সাথে রাখুন, বিন যিয়াদ! মুগীস আর-রুমী বললেন। আমার কাছে মাত্র সাতশ সিপাহী রেখে যান।
‘কেবল সাতশ সিপাহী! তারিক বিন যিয়াদ অবাক হয়ে বললেন। মাত্র সাতশ সিপাহীর সহযোগিতায় তুমি এ দুর্গ জয় করতে পারবে?
‘মুগীস মাত্র সাতশ সিপাহীর মাধ্যমে এ দুর্গ দখল করতে পারবে কি না-সে ব্যাপারে আমি আপনাকে কোন নিশ্চয়তা দিতে পারছি না। জুলিয়ান বললেন। তবে ইবনে যিয়াদ! এটা আমি আপনাকে নিশ্চয় করে বলতে পারি, আপনি স্বল্পসংখ্যক সিপাহী নিয়ে টলেডো জয় করতে পারবেন না। টলেডো হল রাজধানী, আন্দালুসিয়ার প্রাণকেন্দ্র। টলেডোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুবই মজবুত। এটাই উত্তম হবে যে, আপনি অধিকাংশ সিপাহী আপনার সাথে নিয়ে যাবেন।
‘আমার জন্য চিন্তা করবেন না।’ মুগীস বললেন। আল্লাহর সাহায্যই আমার জন্য যথেষ্ট। এ দুর্গ আমি দখল করবই, ইনশাআল্লাহ্।
‘আকাশ-কুসুম চিন্তার কথা রাখ, মুগীস!’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন। ‘আল্লাহ তাআলা শুধু তাদেরকেই মদদ করেন, যারা বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
‘আমি বলছি, বাছাইকৃত সাতশ সিপাহী আমার কাছে রেখে আপনি সামনে রওনা হয়ে যান। মুগীস বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ্ তাআলা আমাদের বিজয়ের ব্যবস্থা করে দেবেন। আমরা শুধু শুধু পরিখার এপাশে এভাবে বসে থাকব না।’
অগত্যা তারিক বিন যিয়াদ মুগীস আর-রুমীর পছন্দমতো সাতশ সিপাহী রেখে অবশিষ্ট সৈন্যদেরকে নিয়ে টলেডোর দিকে রওনা হয়ে গেলেন। জুলিয়ান ও আউলাস তার সাথে গেলেন।
কর্ডোভার দুপ্রাচীরের উপর তীর-ধনুক ও বর্শা হাতে নিয়ে যে মানব-প্রাচীর সৃষ্টি হয়েছিল তা বিস্ফোরণ উনখ আগ্নেয়গিরির ন্যায় বিকট শব্দে ফেটে পড়ল। সেই বিস্ফারিত আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের পরিবর্তে আকাশ বির্শিকারী জয়-ধ্বনি বের হতে লাগল। সেই সাথে তারা মুসলিম বাহিনীকে দুয়োধ্বনি দিতে লাগল।
চলে গেছে…, ওরা চলে গেছে…।’
‘এত তাড়াতাড়ি কেন চলে যাচ্ছি…, হে লুটেরার দল…!?
‘দেখ…, দেখ…, আমাদের মেহমানরা চলে যাচ্ছে…।’
‘থামো…, থামো…, একটু দাঁড়াও…, আমরা দরজা খুলে দিচ্ছি…।’
তীর, ধনুক আর বর্শা হাতে নেচে-কুদে খ্রিস্টান বাহিনী বিজয়-উল্লাস পালন করছিল। তারা মুসলিম বাহিনীকে তিরস্কার করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল। তারিক বিন যিয়াদ তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। অবরোধ উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। মুগীস আর-রুমী তার সাতশ সিপাহীকে খন্দক হতে দূরে পিছন দিকে নিয়ে গেলেন। কর্ডোভার খ্রিস্টানরা আত্মতুষ্টিতে ভোগতে লাগল যে, মুসলিম বাহিনী নিরাশ হয়ে অবরোধ উঠিয়ে নিয়েছে।
রাতে শহরে আনন্দ-উৎসব হচ্ছিল। গির্জাসমূহে যাজক-যাজিকারা খুশীতে মেতে উঠেছিল। ইসিজা থেকে পালিয়ে আসা বেশকিছু সিপাহী ও শহরবাসী কর্ডোভায় আশ্রয় নিয়েছিল। তারা ইসিজা যুদ্ধের অত্যন্ত ভয়াবহ চিত্র শহরবাসীর সামনে তুলে ধরছিল। সাধারণ মানুষ এভেবে খুশী ছিল যে, তাদের উপর থেকে বিপদ দূর হয়ে গেছে। সবমিলিয়ে তাদের কাছে এই রাত ছিল আনন্দের রাত; উৎসবের রাত।
কর্ডোভা শহরের অদূরে সবুজ লতা-গুল্মে ঘেরা ছোট-বড় অসংখ্য টিলা ছিল। মুগীস আর-রুমী তার বাহিনীকে সেই টিলাসমূহের মাঝে আত্মগোপন করে থাকতে বলে নিজে তাদের থেকে পৃথক হয়ে এক স্থানে একাকী নিবিষ্ট চিত্তে নফল নামায পড়ছিলেন। নামায শেষ করে তিনি আল্লাহর দরবারে হাত তুলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন,
‘হে আল্লাহ! তুমি এক, তোমার কোন শরীক নেই। হে পরওয়ারদিগার! তুমি যাকে ইচ্ছে তাকে ইজ্জত দান কর, যাকে ইচ্ছে তাকে বেইজ্জতি কর। তুমি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান। আমি তোমার উপর ভরসা করেই মাত্র সাতশ সৈন্য নিয়ে এ শহর জয় করার ওয়াদা করেছি। আমি এ শহরের বাদশাহ হতে চাই না; বরং তোমার বাদশাহী এ শহরে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।
