অসম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকগণ, বিশেষ করে মুসলিম ইতিহাসবিদগণ লেখেছেন যে, মুসা বিন নুসাইরের এই নির্দেশ সঠিক ছিল। কারণ, তিনি চিন্তা করেছিলেন, তারিক বিন যিয়াদ বয়সে তরুণ। আবেগের বশবর্তী হয়ে সামনে অগ্রসর হতে গিয়ে শোচনীয়ভাবে পরাজয়ের শিকার হতে পারেন। তখন যে সকল এলাকা বিজয় হয়েছে সেগুলোও হাত ছাড়া হয়ে যাবে।
কোন রকম পক্ষপাতিত্বের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে এবং কোন রকম মন্তব্য থেকে বিরত থেকে, মুসা বিন নুসাইর তারিককে সামনে অগ্রসর না হওয়ার যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সমরশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে তা কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল–সে ব্যাপারে তল্কালিন পরিস্থিতিতে তারিক বিন যিয়াদ ও তাঁর সালারগণ কী মতামত ব্যক্ত করেছিলেন এবং তাঁরা কী সিন্ধান্ত নিয়েছিলেন, নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকগণের বরাত দিয়ে তা-ই এখানে আমরা উল্লেখ করছি।
তারিক বিন যিয়াদ কবরস্থান থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে তার সালারদেরকে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। এই আলোচনায় সালারদের সাথে তিনি জুলিয়ানকেও উপস্থিত হতে বললেন। এর প্রথম কারণ হল, জুলিয়ান আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততার সাথে তারিক বিন যিয়াদের সাহায্য-সহযোগিতা করছিলেন। এমনকি তিনি একজন খ্রিস্টান হওয়া সত্ত্বেও তার স্বজাতিকে ধোঁকা দিয়ে কারমুনা দুৰ্গ তারিক বিন যিয়াদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় কারণ হল, জুলিয়ান ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি। বিশেষ করে সমরশাস্ত্রে তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা ছিল অতুলনীয়।
‘হে আমার বন্ধুগণ!’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন। তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমীরের এই হুকুমের পিছনে কি এমন হেকমত লুকিয়ে আছে? একদিকে ইসলামের বিধান হল, আমীরের আনুগত্য করো; তার বিরুদ্ধাচরণ করো না। অপর দিকে আমরা যদি সামনে অগ্রসর না হয়ে এখানে বসে থাকি তাহলে আন্দালুসিয় সৈন্যরা মনে করবে, ইসিজার যুদ্ধে আমরা যে বিপুলসংখ্যক সৈন্য হারিয়েছি, তা আমরা বরদাশত করতে পারছি না। তাই সামনে অগ্রসর হতে ভয় পাচ্ছি।’
‘বিন যিয়াদ! মুগীস আর-রুমী বললেন। আন্দালুসিয়রা যা মনে করার তা করুক। আমদের চিন্তা করার বিষয় হল, আমরা আন্দালুসিয়দের ঘাড়ের উপর চেপে বসেছি। এখন আমরা যদি সেখান থেকে নেমে যাই তাহলে আন্দালুসিয়রা তাদের বিক্ষিপ্ত সামরিক-শক্তিকে একত্রিত করে ফেলবে। তখন তারাই আমাদের জন্য মহাবিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আমরা শত্রুপক্ষের উপর আতঙ্ক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছি। এখন শত্রুপক্ষকে সংঘবদ্ধ হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া ছাড়া, আমীরের এই নির্দেশের মাঝে আমি আর কোন হেকমত খুঁজে পাচ্ছি না।’
‘বিন যিয়াদ! আপনি চিন্তা কর দেখুন। জুলিয়ান বললেন। আমীরের হুকুম মান্য করার ব্যাপারে আপনাদের ধর্মের যে নির্দেশ রয়েছে, সে ব্যাপারে আমি কোন মন্তব্য করব না। আমাদের ধর্মের নির্দেশও এমনিই। তবে আমীর যদি এমন কোন নির্দেশ দেন, যার কারণে ধর্মের ও ধর্মের অনুসারীদের ক্ষতি হয় তাহলে আমি মনে করি–এমন হুকুম পালন করা পাপ।
বিন যিয়াদ! আপনি চিন্তা করে দেখুন, আপনি লাকা উপত্যকা জয় করেছেন। গোয়াডিলেটের যুদ্ধে আপনি রডারিকের সাথে তার প্রধান প্রধান প্রশাসক এবং অভিজ্ঞ জেনারেলদেরকে হত্যা করেছেন। আন্দালুসিয়ার প্রকৃত বাহিনীকে আপনি ধ্বংস করে দিয়েছেন। যেসকল সৈন্য পালিয়ে গেছে তারা আপনাদের সম্পর্কে জনসাধারণের মাঝে ভীতি ছড়াচ্ছে। তারা সামান্য সময়ের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলে হাল ছেড়ে দেয়। এমতাবস্থায় আপনি কি তাদেরকে এই সুযোগ করে দেবেন, যাতে তারা একত্রিত হয়ে আপনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে, নাকি তাদের পিছু ধাওয়া করবেন, যেন তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে না পারে?
‘আমি কোথাও তাদেরকে নিশ্চিন্তে বসার সুযোগ দেব না।’ তারিক বিন যিয়াদ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন।
‘আমীর মুসা বিন নুসাই এখান থেকে অনেক দূরে। যায়েদ বিন কুসাদা বললেন। এখানকার বাস্তবতা ও আন্দালুসিয় বাহিনীর অবস্থা সম্পর্কে তার সঠিক কোন ধারণা নেই।’
‘তাছাড়া এই ইসিজা শহরের ব্যাপারটিই লক্ষ্য করুন। জুলিয়ান বললেন। ‘এটা আন্দালুসিয়ার চৌরাস্তা। এখান থেকে একটি রাস্তা গেছে কর্ডোভার দিকে। আরেকটি গ্রানাডার দিকে। তৃতীয়টি মালাগার দিকে। আর চতুর্থটি গেছে আন্দালুসিয়ার রাজধানী টলেডোর দিকে। আপনি যদি এ চারটি শহর দখল করে নিতে পারেন তাহলে মনে করবেন, গোটা আন্দালুসিয়াই আপনি দখল করে নিয়েছেন। আপনি সামনে এগিয়ে চলুন, আমীর যদি নারাজ হন তাহলে আমি তার সাথে কথা বলব।’
‘আমি নিজেই তার সাথে কথা বলতে পারব।’ তারিক বললেন। তবে তাঁর সাথে কথা পরে হবে, এখন আমরা সামনে অগ্রসর হব।
***
আমীরের হুকুমের পরোয়া না করে তারিক বিন যিয়াদ অন্য শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সিন্ধান্ত নিলেন। তার বাহিনীকে তিনি দু’ভাগে ভাগ করলেন। এক ভাগের সেনাপতি নিযুক্ত করলেন যায়েদ বিন কুদাকে। ঐতিহাসিকদের অনেকে তাঁর নাম লেখেছেন, যায়েদ বিন কায়সারী। তারিক বিন যিয়াদ তাকে মালাগার দিকে পাঠিয়ে দিলেন। অপরভাগের নেতৃত্ব তারিক বিন যিয়াদ নিজ হাতে রেখে কর্ডোভার দিকে অগ্রসর হলেন।
