খ্রিস্টান সিপাহীদের মধ্যে যারা বেঁচে ছিল, তারা ক্লান্তির কারণে চলা-ফেরা করতে পারছিল না। যে যেখানে ছিল সেখানেই বসে পড়ল। এখন তারা যুদ্ধবন্দী। সিপাহীদের মাধ্যে যারা পলানোর চেষ্টা করছিল তাদেরকে পাকড়াও করে নিয়ে আসা হচ্ছিল। শহরে ঘোষণা করে দেওয়া হল, কেউ যদি কোন সিপাহীকে আশ্রয় দেয় তাহলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
তারিক বিন যিয়াদ নির্দেশ দিলেন, আহতদেরকে মুসলিম বাহিনী ময়দান থেকে নিয়ে আসবে, আর শহরবাসী তাদেরকে সাহায্য করবে। আহত ব্যক্তি মুসলমান হোক বা খ্রিস্টান সকলের সাথে এক রকম ব্যবহার করা হবে। কেউ এই হুকুম অমান্য করলে তাকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
তারিক বিন যিয়াদ ঐ মেয়ে তিনটিকে তলব করলেন, যারা তাঁকে হত্যা করার জন্য এসেছিল। তিনি বড় পাদ্রিকেও ডেকে পাঠালেন। বড় পাদ্রি এলে তারিক বিন যিয়াদ মেয়েদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এই ব্যক্তিই কি তোমাদেরকে পাঠিয়েছিল আমাকে হত্যা করতে?
‘হ্যাঁ, সিপাহসালার!’ একটি মেয়ে বলল। সেই আমাদেরকে পাঠিয়েছিল এবং হত্যা করার পন্থাও বলে দিয়েছিল।’
‘আমার বাহিনীর কোন সিপাহী তোমাদের কোন উপাসনালয়ের বারান্দায়ও পাও রাখবে না। তারিক বিন যিয়াদ পাদ্রিকে লক্ষ্য করে বললেন। উপাসনালয় যে ধর্মেরই হোক না কেন, আমাদের কর্তব্য হল, তার সম্মান রক্ষা করা। আমরা কারও ধর্মের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করব না। প্রত্যেক ধর্মের লোক নিজস্ব ইবাদত ও ধর্ম-কর্ম সম্পাদনের ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন। কিন্তু তোমরা তোমাদের ধর্মীয় বিধানকে কলঙ্কিত করেছ, আমি তোমাদের এই অপরাধ ক্ষমা করব না। কুমারী মেয়েদেরকে রক্ষিতা বানিয়ে রাখার শিক্ষা কি হযরত ঈসা আলাইহিস্সালাম তোমাদেরকে দিয়েছেন? কক্ষণও না। তিনি তোমাদেরকে এমন বিধান কখনও শিক্ষা দেননি। তোমাদেরকে হত্যা করা উচিৎ।
পাদ্রি অনেক কাকুতি-মিনতি করে প্রাণ ভিক্ষা চাইল। নিজেকে রক্ষার জন্য সে অনেক অযুহাত পেশ করল। কিন্তু তারিক বিন যিয়াদ তাকে বন্দী করার নির্দেশ দিলেন এবং ভোরেই তাকে হত্যা করার হুকুম জারি করলেন।
অন্যান্য ধর্মীয় পণ্ডিতদেরকে ডেকে তারিক বিন যিয়াদ নির্দেশ দিলেন, সকল ধর্ম-যাজিকাদেরকে তাদের মা-বাবার নিকট পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যে যেই এলাকার তাকে সেই এলাকায় পৌঁছে দিতে হবে।’
তারিক বিন যিয়াদ ইসিজা বাসীদের উপর মোটা অংকের জরিমানা আরোপ করলেন। কারণ তারা তাদের বাহিনীর সাথে সমান তালে যুদ্ধ করছিল। ফলে মুসলিম বাহিনীর যথেষ্ট ক্ষতি সাধিত হয়েছিল। এছাড়াও তিনি তাদের উপর নিরাপত্তা-কর আরোপ করেন।’
ইসিজার প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব তারিক বিন যিয়াদ খ্রিস্টানদের উপরই ন্যস্ত করেন। তবে প্রধান প্রশাসক হিসেবে একজন মুসলিমকে নিয়োগ দেন।
***
পর দিন সকালে এক হৃদয়বিদারক ও বেদনাবিধুর দৃশ্যের অবতারণা হয়। শহীদগণের লাশ পাঁচটি কাতারে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে। তারিক বিন যিয়াদ জানাযার নামায পড়ানোর জন্য সামনে অগ্রসর হলেন। শহীদগণের কাফনের ব্যবস্থা শহরবাসীরা করেছিল। শহরবাসীরা শহীদগণের জানাযা ও দাফনের দৃশ্য প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করছিল।
এক বিশাল-বিস্তৃত এলাকা জোড়ে গণকবরের ব্যবস্থা করা হল। সর্বপ্রথম যেসকল মুজাহিদীন ইউরোপে আল্লাহ্ তাআলার একত্ববাদ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রেসালাত পৌঁছে দিয়েছিলেন–এটা ছিল তাদের সর্বশেষ আরামগাহ।
তারিক বিন যিয়াদের দু’চোখ বেয়ে অশ্রুর প্লাবন বইছিল। মুজাহিদগণ থেমে থেমে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিচ্ছিলেন। শহীদগণকে দাফন করে তারিক বিন যিয়াদ অশ্রুসজল চোখে কবরস্থান থেকে বের হয়ে এলেন। এমন সময় তাকে সংবাদ দেওয়া হল, কায়রো থেকে মিসর ও আফ্রিকার আমীর মুসা বিন নুসাইরের কাসেদ এসেছে।
তারিক বিন যিয়াদ কাসেদ থেকে পয়গাম নিয়ে পড়তে লাগলেন। পয়গাম পড়তে পড়তে তার চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেল। তার কাছেই জুলিয়ান ও অন্যান্য সালারগণ উপস্থিত ছিলেন।
‘তোমাদের কেউ কি আমাকে বলতে পার, এই নির্দেশের মাঝে কি এমন বুদ্ধিমত্তার পরিচয় আছে?’ তারিক বিন যিয়াদ বিরক্তির সাথে তাঁর সালারদেরকে জিজ্ঞেস করলেন। তারপর তিনি মুসা বিন নুসাইরের পয়গাম পড়ে তাদেরকে শুনাতে লাগলেন।
মুসা বিন নুসাইর তারিককে লেখেছিলেন :
‘বুদ্ধিমত্তার দাবি হল, তুমি যেখানে আছে সেখানেই অবস্থান করবে। এমন যেন না হয় যে, জয়ের নেশায় সামনে অগ্রসর হতে গিয়ে গোটা বাহিনীই চরম পরাজয়ের শিকার হয়। পরবর্তী নির্দেশ না আসার আগ পর্যন্ত সামনে অগ্রসর হবে না। খুব শীঘ্রই এ ব্যাপারে আমি দিক-নির্দেশনা পাঠাচ্ছি, কিংবা আমি নিজেই ফৌজ নিয়ে উপস্থিত হচ্ছি।’
অধিকাংশ ঐতিহাসিকই মুসা বিন নুসাইরের পয়গামের হুবহু বিবরণ না দিয়ে শুধু মন্তব্য পেশ করেছেন। তারা লেখেছেন, মুসা বিন নুসাইর তারিককে শুধু হুকুমই দেননি; বরং তাকে বাধ্য করেছিলেন, যেন তিনি সামনে অগ্রসর না হতে পারেন।
খ্রিস্টান ঐতিহাসিকরা লেখেছেন, ‘মুসা বিন নুসাইর যখন দেখলেন যে, তাঁর গোলাম তারিক বিন যিয়াদ আন্দালুসিয়ার মতো এক বিশাল রাজ্যের বিজেতা হয়ে যাচ্ছে, সে মাত্র বার হাজার সৈন্যের মাধ্যমে রডারিকের এক লাখের চেয়েও বেশি সৈন্যকে শুধু পরাজিতই করেনি; বরং তাদের নাম-নিশানা পর্যন্ত মিটিয়ে দিয়েছে। ফলে ইসলামী সালতানাতের খলীফার কাছেও সে এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী হতে যাচ্ছে, তখন মুসার অন্তরে তারিক বিন যিয়াদের ব্যাপারে পত্রিকার জন্ম নিল। মুসা বিন নুসাইর হিংসার বশবর্তী হয়ে তারিককে সামনে অগ্রসর হতে বাধা দিয়ে নিজে আন্দালুসিয়ার বিজেতা হওয়ার গৌরব অর্জন করতে চাচ্ছিলেন।’
