মুগীস আর-রুমী ছিলেন অত্যন্ত চৌকস ও সচেতন। তিনি তার কয়েকজন সৈন্যকে সংবাদ সগ্রহের জন্য সামনে পাঠিয়ে ছিলেন। তাদের একজন দৌড়ে এসে তাকে সংবাদ দিল, শত্রুবাহিনীর কয়েকটা দল এদিকে আসছে। মুগীস তারিক বিন যিয়াদের নির্দেশের অপেক্ষা না করে তার বাহিনীকে সামনে অগ্রসর হওয়ার হুকুম দিলেন। তার নিকট যথেষ্ট সংখ্যক অশ্বারোহী ছিল।
মুগীস আর-রুমী ধেয়ে আসা খ্রিস্টান বাহিনীর সাথে সামনা-সামনি লড়াই করতে চাচ্ছিলেন না। তিনি তাঁর বাহিনীকে আরও সামনে নিয়ে গিয়ে শত্রুবাহিনীর ডান পার্শ্বে আক্রমণ করলেন। তার আক্রমণ এতটাই কঠিন ও তীব্র ছিল যে, শত্রুপক্ষ পিছু হঠতে বাধ্য হল। তাদের পিছনেই ছিল শহর-রক্ষা প্রাচীর। তারা সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করছিল, কিন্তু মুগীস আর-রুমী তাদের উপর এমন প্রচণ্ড আক্রমণ করেছিলেন যে, তারা পিছু হটতে গিয়ে শহর-রক্ষা প্রাচীরের কারণে বাধাপ্রাপ্ত হল। তারা সামনে অগ্রসর হয়ে পাল্টা আঘাত হানার আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু মুসলিম বাহিনী তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ করে দিল।
বার্বার যোদ্ধারা এখানে সাহসিকতা ও রণনৈপুন্যতার এমন পারঙ্গমতা প্রদর্শন করল, যা বহুকাল সমর-ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ইসিজার বাহিনীও জীবনবাজি রেখে লড়াই করছিল।
যুদ্ধ এখন তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। তারিক বিন যিয়াদ সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় ছিলেন। তাঁর উভয় পাশের সৈন্যরা পৃথক পৃথকভাবে যুদ্ধ করছিল। তারিক কোন নতুন কৌশল অবলম্বন করতে পারছিলেন না। তাঁর প্রতিটি সৈন্যই মরণপণ লড়াই করছিল। তাঁর কোন রিজার্ভ বাহিনীও ছিল না। তিনি নিজেও একজন সাধারণ সৈনিকের মতো লড়াই করছিলেন। তার বাহিনীর সৈন্যদেরই বেশি ক্ষতি হচ্ছিল।
যায়েদ বিন কুসাদা যেহেতু পিছন দিক হতে আক্রমণ করেছিলেন, তাই তিনি শত্রুবাহিনীর বেশি ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যায়েদ বিন কুসাদা ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ সালার। তিনি দূর থেকে দেখতে পেলেন, তারিক বিন যিয়াদ বেশ বিপদের মধ্যে আছেন। তিনি তার বাহিনীর এক চতুর্থাংশকে তারিকের সাহায্যে পাঠিয়ে দিলেন। ফলে তারিকের বিপদ কিছুটা হালকা হল। কিন্তু খ্রিস্টান সৈন্যরা তাদের পবিত্র নগরী রক্ষার্থে জীবনবাজি রেখে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধ করছিল। লাকাসহ অন্যান্য রণাঙ্গন ও দুর্গ থেকে পালিয়ে আসা সৈন্যরা আহত সিংহের ন্যায় লড়াই করছিল। তারা বীরবিক্রমে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করে তাদেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলছিল।
মুগীস আর-রুমী খ্রিস্টান বাহিনীকে ফাঁদে ফেলে তাদের বেশ ক্ষতিসাধন করছিলেন। তাদের পদাতিক বাহিনী দুর্গপ্রাচীর আর অশ্বারোহী বাহিনীর মধ্যবর্তী স্থানে বন্দী হয়ে পড়েছিল। তাদের অনেকেই ঘোড়র পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা পড়ল। ঘোড়াগুলো পরস্পরে এমনভাবে জড়সড় হয়েছিল যে, অশ্বারোহীদের জন্য তীর-তলোয়ার ও বর্শা চালানো একেবারে অসম্ভব হয়ে গেল। ফলে তারা নিজেদের হাতিয়ার দ্বারাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে লাগল।
রণাঙ্গনে তারিক বিন যিয়াদের একটি স্থায়ী নির্দেশ ছিল, ঘোড়ার যেন কোন ক্ষতি করা না হয়। কারণ, ঘোড়াগুলো মুসলিম বাহিনীর কাজে লাগবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মুগীস আর-রুমী ঘোড়ার পরোয়া না করে নির্দেশ দিলেন, তীর ছুঁড়ে দুশমনের ঘোড়াগুলো জখম করে ফেল। নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে মুসলিম বাহিনী ঘোড়াগুলো লক্ষ্য করেও তীর-বর্শা ছুঁড়তে লাগল। তীরের আঘাতে আহত ঘোড়া আরোহীর নিয়ন্ত্রণ মুক্ত হয়ে এলোপাথাড়ি ছুটতে লাগল। নিয়ন্ত্রণহীন ঘোড়া তার আরোহীকে ফেলে দিলে অন্য ঘোড়া এসে তাকে পদপিষ্ট করে চলে যেত।
মুগীস আর-রুমীর ফাঁদ থেকে খ্রিস্টান বাহিনী পালানোর চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু খুব কম সংখ্যকই পালাতে পারল। মুগীস তার কিছু সৈন্যকে তারিক বিন যিয়াদের সাহার্যে পাঠিয়ে দিলেন। এতে তারিকের বিপদ আরও হালকা হয়ে গেল এবং যুদ্ধের যে হাওয়া খ্রিস্টানদের অনুকূলে প্রবাহিত হচ্ছিল, তা এখন তাদের প্রতিকূলে বইতে শুরু করল।
ইতিহাসে ইসিজার খ্রিস্টান সৈন্যবাহিনীর ভূয়ষী প্রশংসা করা হয়েছে। কারণ, তারা সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সাথে লড়াই করে মুসলিম বাহিনীর যে ক্ষতি সাধন করেছিল, মুসলিম বাহিনী ইতিপূর্বের যুদ্ধগুলোতে এই পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি।
মুসলিম বাহিনী এত বিপুল পরিমাণ ক্ষয়-ক্ষতির জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। প্রাথমিক পর্যায়ের কয়েকটি যুদ্ধে বিজয়ের আনন্দে তারা বিভোর ছিল। ইসিজার খ্রিস্টানরা তাদের সেই মুগ্ধতা দূর করে দিল।
একজন পোর্তগিজ ঐতিহাসিক লেখেন, এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী এমন ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, যা তারা কল্পনাও করতে পারেনি। সন্ধ্যা নাগাদ খ্রিস্টান বাহিনী পরাজিত হয়ে গেল টিকই, কিন্তু মুসলমানদের দেমাগ থেকে এই আনন্দ-অনুভূতি বের হয়ে গেল যে, তারা যেদিকেই যাবে বিজয় তাদের পদচুম্বন করবে।’
***
শেষ বিকেলের সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ডুবে গেল। সেই সাথে আন্দালুসিয়ায় খ্রিস্টানদের বীরত্বের সূর্য অস্তমিত হয়ে গেল। তাদের দুর্গপতিসহ জেনারেলদের সকলেই নিহত হল। সাধারণ সিপাহীদের মাঝে খুব স্বল্প সংখ্যকই জীবিত রইল। তারিক বিন যিয়াদকে যখন তার বাহিনীর ক্ষয়-ক্ষতি সম্পর্কে জানানো হল তখন তিনি একেবারে বাকহীন হয়ে গেলেন। তার মুখ থেকে একটি কথাও বের হল না। তার শারীরিক অবস্থা ছিল একেবারে শোচনীয়। মনে হচ্ছিল, তাঁর শরীরের বিভিন্ন জায়গার হাড়-গুড় ভেঙ্গে গেছে। সারাদিন তিনি একজন সাধারণ সিপাহীর মতো লড়াই করেছেন।
