‘দুশমন আসছে। দুর্গপতি প্রাচীরের উপর হতে সুউচ্চস্বরে আওয়াজ দিল।
দুর্গের সৈন্যরা প্রত ছিল। কমান্ডাররা গত রাতে সিন্ধান্ত নিয়েছিল যে, দুর্গের মাঝে অবরোদ্ধ হয়ে পড়ার চেয়ে খোলা ময়দানে আক্রমণকারীদের মুকাবেলা করা হবে। তাদের ধারণা ছিল, মুসলমানদের সিপাহসালার এবং আরও দুজন সহকারী সালার নিহত হয়েছেন। তাই মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রা ব্যহত হবে।
নিজেদের উপর তাদের পূর্ণ আস্থা ছিল। কারণ, তারা পূর্ণরূপে প্রস্তুতি নিয়েছিল। তারা এ কথা ভেবে মনে মনে খুশী হচ্ছিল যে, মুসলিম বাহিনী যদি তাদের সিপাহসালার ছাড়া হামলা করে তাহলে তারা খুব তাড়াতাড়ি মারা পড়বে। তারা এটা ভাবতেই পারছিল না যে, মুসলিম বাহিনীর সিপাহসালার এত সুন্দর মেয়েদেরকে প্রত্যাখ্যান করবে, এবং তাদের হাতে নিহত হওয়া থেকে বেঁচে যাবে।
দুর্গপতির ঘোষণার সাথে সাথে দুর্গের তামাম দরজা খুলে গেল এবং ইসিজার সৈন্যবাহিনী দ্রুতবেগে দুর্গ ছেড়ে বাইরে চলে এলো। ইসিজার বাহিনীতে নওজোয়ান ও মধ্যবয়সি জনসাধারণও ছিল। লড়াইয়ের সামান্য অভিজ্ঞতাও তাদের ছিল না। সুতীব্র আওয়াজে যুদ্ধের ডঙ্কা বেজে উঠল। নিয়মিত সিপাহী এবং সাধারণ মানুষের মাঝে সুস্পষ্টরূপে যুদ্ধের উন্মাদনা পরিলক্ষিত হচ্ছিল।
***
তারিক বিন যিয়াদের বাহিনী সুতীব্র বেগে এগিয়ে আসছিল। অগ্রগামী বাহিনীর কমান্ডার দেখতে পেল, দুর্গ হতে সৈন্যরা বের হয়ে ময়দানে সারিবদ্ধ হচ্ছে। কমান্ডার সাথে সাথে অগ্রগামী বাহিনীর প্রতিটি ইউনিটকে সেখানেই থামিয়ে দিল। তারপর তিনি তাঁর ঘোড়া হাঁকিয়ে তারিক বিন যিয়াদের নিকট পৌঁছে ঘটনা বর্ণনা করল।
তারিক তার সৈন্যবাহিনীকে তিন ভাগে বিভক্ত করলেন। এক ভাগের দায়িত্ব দিলেন মুগীস আর-রুমীকে, আরেক ভাগের দায়িত্ব দিলেন যায়েদ বিন কুসাদাকে, আর তৃতীয় ভাগের দায়িত্ব নিজ হাতে রাখলেন। দায়িত্বশীলদেরকে অতি দিকনির্দেশনা দিয়ে রণাঙ্গনে পাঠিয়ে দিলেন। মুগী আর-রুমীকে তিনি শহরের শেষ প্রান্তে পাঠিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্য হল, তারা শহরের পিছন দিকে অবস্থান নিবে।
যায়েদ বিন কুসাদাকে সেখান থেকেই ডান দিকে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি তাকে এই নির্দেশ দিলেন যে, দুশমনের দৃষ্টি এড়িয়ে যথাসম্ভব দূরে চলে যাবে। তার পর পথ ঘুরে শত্রুবাহিনীর বাম পার্শ্বে অবস্থান নিবে। আক্রমণের নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। অতঃপর তারিক নিজে শত্রুবাহিনীকে লক্ষ্য করে সামনে অগ্রসর হলেন। তিনি শত্রুবাহিনীর নিকট পৌঁছামাত্রই শত্রুবাহিনীর মধ্য ভাগ মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করতে বসল।
ঐতিহাসিক লেনপোল লেখেন, ইসিজা বাহিনীর এই হামলা ছিল মরণপণ হামলা। ইসিজা বাহিনীর আক্রমণের তীব্রতা দেখে মনে হচ্ছিল, শহর রক্ষার জন্য তারা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। অন্যান্য ঐতিহাসিকগণও লেখেছেন, এই প্রথম আন্দালুসিয়ার সৈন্যদের মাঝে লড়াইয়ের প্রচণ্ড উন্মাদনা দেখা যাচ্ছিল।
প্রফেসর ডোজি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, খ্রিস্টান বাহিনী এত প্রবল বিক্রমে আক্রমণ করছিল যে, তা প্রতিহত করা তারিকের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। তারিকের সৌভাগ্যই বলতে হবে যে, কয়েক হাজার নতুন বার্বার সিপাহী এসে তার বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। ফলে তাঁর বাহিনীর সংখ্যা কয়েক হাজার বেড়ে গিয়েছিল। অন্যথায় ইসিজার সৈন্যবাহিনী তাঁকে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করত। বাবার সম্প্রদায় এমনিতেই যুদ্ধবাজ ছিল। যুদ্ধ-বিগ্রহ, আর খুন-খারাবি ছিল তাদের সহজাত বিষয়। তারা কোন অবস্থাতেই পরাজয় স্বীকার করে নিতে পারত না। তারা জীবনবাজি রেখে লড়ে যাচ্ছিল। আর শরীরের তাজা খুন ও জানের নাযরানা পেশ করছিল।
ইসিজা বাহিনীর জেনারেল মুসলিম বাহিনীকে পিছন দিক হতে আক্রমণ করার জন্য তার সৈন্যদলের বামবাহুকে আরও বামদিকে সরে যেতে নির্দেশ দিয়ে বলল, ঘুরপথে মুসলিম বাহিনীর পিছনে গিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করবে। জেনারেলের নির্দেশ অনুযায়ী সৈন্যদলের বামবাহু বাম দিকে সরে যেতে লাগল; কিন্তু তাদের জানা ছিল না যে, সেদিকে মুসলিম বাহিনীর কয়েকটি ইউনিট প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছে।
মুসলিম বাহিনীর কমান্ডার যায়েদ বিন কুসাদা খ্রিস্টান সৈন্যদেরকে বাম দিকে সরে আসতে দেখে তিনি তাঁর বাহিনীকে আরও পিছনে নিয়ে গেলেন, যেন শত্রুবাহিনী তাদেরকে দেখতে না পায়।
খ্রিস্টান বাহিনী যখন সামনে অগ্রসর হয়ে ডানদিকে মোড় নিল এবং বেশ কিছু দূর অগ্রসর হয়ে গেল তখন যায়েদ বিন কুসাদা তাঁর বাহিনী নিয়ে পিছন দিক থেকে খ্রিস্টান বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। খ্রিস্টান বাহিনী আক্রমণের আকস্মিকতায় একেবারে ভড়কে গেল। তারা এই হঠাৎ আক্রমণ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারল না। ফলে তারিক বিন যিয়াদের পিছন দিক একেবারে নিরাপদ হয়ে গেল।
রণাঙ্গনের পরিধি বেড়ে গেল। শহর-রক্ষা প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ এ ভয়াবহ যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করছিল। তারা মুগীস আর-রুমীর বাহিনীকে দেখে ফেলল। মুগীস আর-রুমী শহরের বাম দিকে সামান্য দূরে তারিক বিন যিয়াদের হুকুমের অপেক্ষা করছিল। একজন বেসামরিক লোক তাদের জেনারেলের নিকট ছুটে গিয়ে মুগীস আর-রুমীর বাহিনী সম্পর্কে সংবাদ দিল। জেনারেল তার বাহিনীর ডান বাহুকে মুগীস আর-রুমীর বাহিনীকে শায়েস্তা করার জন্য পাঠিয়ে দিল।
