আমি আমার নিজের যে ঘটনা বর্ণনা করলাম–এটা প্রতিটি ধর্ম্যাজিকার জীবন বৃত্তান্ত। আমি সিপাহসালারের নিকট আবেদন করছি, তিনি যেন এই শহরে–যাকে খ্রিস্টানরা অত্যন্ত পবিত্র শহর মনে করে আগুন লাগিয়ে দেন। অথৈ পাপে নিমজ্জিত এই শহরের নাম-নিশানা মিটিয়ে দেন।
আমার এই শরীর ছাড়া মুসলিম সেনাপতিকে দেওয়ার মতো আর কিছুই আমার কাছে নেই। আমার একান্ত ইচ্ছা এই যে, আমি সেনাপতির ধর্ম গ্রহণ করে নেব, অতঃপর তিনি আমাকে শাদী করবেন। কিন্তু আমি আমার এ বাসনা পূর্ণ হতে দেব না। কারণ, আমি একটি অপবিত্র মেয়ে, আর সিপাহসালার আল্লাহ তাআলার প্রিয়পাত্র এবং অনেক সম্মানী ব্যক্তি। আমি পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে বলছি, বিজয় আপনাদেরই হবে। পরাজয় ঐ সকল পাপীদেরই হয়, যারা ধর্মের লেবাস পরিধান করে লোকচক্ষুর অন্তরালে আকণ্ঠ পাপে নিমজ্জিত থাকে।
‘এই মেয়েকে অন্য মেয়ে দুটির কামরায় নিয়ে যাও। তারিক বিন যিয়াদ দোভাষীকে লক্ষ্য করে বললেন। আর এদের সাথে যে বৃদ্ধ এসেছে, তাকে এখানে নিয়ে এসো।’
মেয়েটি চলে গেলে সেই বৃদ্ধ তারিক বিন যিয়াদের তাবুতে প্রবেশ করল। তারিক বিন যিয়াদের হাতে সেই খঞ্জরটি ছিল, যেটি ঐ মেয়ে তাঁর পদতলে রেখে গেছে।
‘তুমি কি এ খণ্ডর দ্বারা আমাকে হত্যা করতে চাচ্ছিলে?’ তারিক বিন যিয়াদ বৃদ্ধকে খঞ্জরটি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
বৃদ্ধ ভয়ে ও বিস্ময়ে এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন, তার চোখ দুটি কুঠরি ছেড়ে বের হয়ে আসবে। সে থর থর করে কাঁপছিল।
‘যে জাতী তার নারীদেরকে ঘর থেকে বের করে ময়দানে নিয়ে আসে তাদের অবস্থা এমনই হয়, যেমনটি তোমাদের হচ্ছে।’ তারিক বিন যিয়াদ বৃদ্ধকে লক্ষ্য করে বললেন। আমরা মিথ্যা ও অকল্যাণের মূলোৎপাটন করতে এসেছি। আমরা আল্লাহ্ তাআলার এই জমিনকে পাপমুক্ত করতে এসেছি। আর তোমাদের ধর্মগুরু ও সিপাহসালাররা সেই পাপের আশ্রয় নিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথ রুদ্ধ করতে চাচ্ছে।
আমি যুদ্ধের ময়দানে তীর অথবা তলোয়ারের আঘাতে মৃত্যুবরণ করব। আমি যে আল্লাহর পয়গাম নিয়ে এই রাজ্যে এসেছি, সে আল্লাহ আমাকে ব্যভিচারে লিপ্ত অবস্থায় কোন নারীর হাতে মারতে পারেন না। তুমি আমাকে বল, ইসিজার সৈন্য সংখ্যা কত? দুর্গের প্রাচীর কেমন? এমন কোন রাস্তা আছে কি, যেখান দিয়ে আমরা দুর্গের ভিতর প্রবেশ করতে পারব?
‘দুর্গ বহুত মজবুত।’ বৃদ্ধ বলল। শহর রক্ষাপ্রাচীর এতটাই শক্ত যে, আপনি কিছুতেই তা ভাঙতে পারবেন না। আপনার সিপাহী প্রাচীরের কাছেই যেতে পারবে না। কারণ, শহরের প্রতিটি শিশু পর্যন্ত তীর, বর্শা, পাথর ও জ্বলন্ত লাকড়ি নিয়ে প্রাচীরের উপর প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছে। এই শহর রক্ষার জন্য নারীরা পর্যন্ত লড়াই করবে। বড় পাদ্রি শহরবাসী ও সিপাহীদেরকে পূর্ণরূপে উত্তেজিত করে রেখেছে। যে সকল সিপাহী পরাজিত হয়ে পালিয়ে ইসিজায় আশ্রয় নিয়েছে, তারা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করবে।
‘তুমি কে?’ তারিক বিন যিয়াদ বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন।
‘আমি একজন পাদ্রি। বৃদ্ধ বলল।
‘তুমি কি আমাকে এবং আমার দুইজন সালারকে ঐ মেয়েদের মাধ্যমে হত্যা করার জন্য এখানে এসেছ?’ তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।
‘হা, সিপাহসালার! বৃদ্ধ বলল। আমি এই ইচ্ছা নিয়েই এসেছিলাম, তবে এখন সে ইচ্ছা ত্যাগ করেছি, আমাকে ক্ষমা করুন।’
তারিক বিন যিয়াদের হাতে খঞ্জর ছিল। তিনি আস্তে আস্তে বৃদ্ধের কাছে এসে পূর্ণ শক্তি দিয়ে বৃদ্ধের বুকে খঞ্জর বসিয়ে দিলেন।
‘সাপ কখনও দংশনের ইচ্ছে ত্যাগ করতে পারে না।’ তারিক বৃদ্ধের বুক থেকে খঞ্জর বের করতে করতে বললেন।
বৃদ্ধ তার হাত দুটি বুকের উপর রেখে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। তারিক বিন যিয়াদ দারোয়ানকে ডেকে বললেন, ‘সেনা ছাউনি থেকে বহুদূরে এ লাশ ফেলে আসবে। আর মেয়ে তিনটির ব্যাপারে নির্দেশ হল, তাদেরকে পৃথক পৃথক স্থানে রাখবে এবং তাদের জন্য কঠিন হেফাজতের ব্যবস্থা করবে।’
তারিক বিন যিয়াদ জুলিয়ান, আইপাস ও অন্যান্য সালারদেরকে ডেকে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ পেশ করলেন।
***
ফজরের পর পরই মুসলিম বাহিনী ইসিজার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। নিয়ম অনুযায়ী তারিক বিন যিয়াদ নামাজের ইমামতি করলেন। নামায শেষে তিনি গোটা বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘সামনের শহর জয় করা সহজ হবে না; বরং আমাদেরকে খুব বেশি শক্তি প্রয়োগ করতে হবে।
তিনি সৈন্যদের লক্ষ্য করে অত্যন্ত তেজদ্বীপ্ত ও জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন।
ইসিজার বড় পাদ্রি এবং অভিজ্ঞ দুর্গপতি এ খবরের অপেক্ষায় ছিল যে, মুসলমানদের সিপাহসালার এবং আরও দু’জন সহকারী সালার নিহত হয়েছে, তাই মুসলিম বাহিনীর পক্ষ থেকে সেনা-অভিযান মূলতবী করে দেওয়া হয়েছে।
এসব কথা ভেবেই তারা সাত সকালে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে দুর্গপ্রাচীরের উপর উঠে কারমুনার দিকে তাকিয়ে রইল। তারা আশা করছিল, তাদের লোক মেয়ে তিনটিকে সাথে নিয়ে ঘোড়াগাড়িতে চেপে খুব ভোরেই ইসিজার দিকে রওনা হয়ে যাবে। কিন্তু তারা কোন ঘোড়াগাড়ি দেখতে পাচ্ছিল না। ধীরে ধীরে সূর্য উপরের দিকে উঠছিল, আর তাদের মনেও সন্দেহ দানা বাঁধছিল।
সকাল গড়িয়ে প্রায় দুপুর হয়ে এলো। সূর্য তার পূর্ণ শক্তি দিয়ে পৃথিবীর বুকে আগুন ছড়াতে লাগল। হঠাৎ দূর আকাশে ধূলিঝড় দেখা গেল। তারা প্রমাদ গণল, এটা তো কোন কাফেলার আগমন মনে হচ্ছে না। ছোট কোন কাফেলা আসলে এত ধূলিকণা উড়ত না। তারা সেই ধূলিধূসর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছুটন্ত ঘোড়ার ধূসর আকৃতি তাদের নজরে পড়ল।
