মেয়েটি আশ্চর্য হয়ে তারিক বিন যিয়াদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে তারিকের সাথে অনেক কথা বলতে চাচ্ছিল। কিন্তু সে তারিকের ভাষা বুঝে না, আর তারিকও তার ভাষা বুঝে না। তবে সে এটা ভালো করেই বুঝত যে, পাপাচারিতার জন্য কোন ভাষার প্রয়োজন হয় না। সুতরাং এই ব্যক্তি কেন মাঝখানে আরেকজনকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে, যে উভয়ের মনের ভাব ও ভাবনাকে তরজমা করে বুঝাবে?
দোভাষী মেয়েটিকে এ কথা বুঝানোর চেষ্টা করল যে, সিপাহসালার এখানে তার উপস্থিতি একেবারে পছন্দ করছেন না। তিনি চান, তুমি এখান থেকে চলে যাবে। কিন্তু মেয়েটি এখানেই থাকবে বলে গো ধরে রইল।
‘তাকে বল, সে যেন এখান থেকে বের হয়ে যায়। তারিক রাগান্বিত কণ্ঠে বললেন। সে যদি আমার কথা না শুনে, তা হলে আমি তাদের সকলকে এখন থেকে বের করে দেব।’
দোভাষী মেয়েটিকে বলল, ‘সিপাহসালার তোমার আচরণে অত্যন্ত রেগে গেছেন। তুমি এখান থেকে চলে যাও, অন্যথায় তোমাদের সকলকে এখান থেকে বের করে দেওয়া হবে।
মেয়েটি আরও বেশি আশ্চর্য হয়ে তারিক বিন যিয়াদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর উঠে ধীরে ধীরে তারিক বিন যিয়াদের দিকে অগ্রসর হল। সে আর কাপড় সামান্য উঠিয়ে ডান হাত কমরে রাখল। অতঃপর যখন সে তার হাত বের করে আনল তখন দেখা গেল, তার হাতে একটি খঞ্জর। মেয়েটি তারিক বিন যিয়াদের সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে খঞ্জর তাঁর পদতলে রেখে দিল।
তারিক বিন যিয়াদ হতভম্ব হয়ে দোভাষীর দিকে তাকালেন। দোভাষী মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, এটা আবার কি?
‘আমি যা শুনেছিলাম তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। মেয়েটি বলল। আজ আমি এমন এক ব্যক্তিকে দেখলাম, যে আমার মতো সুন্দরী যুবতী একটি মেয়েকে উপেক্ষা করল। আমি এই সিপাহসালারকে হত্যা করতে এসেছিলাম। আমার সাথে যে দুজন মেয়ে এসেছে তারাও একই উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে। ঐ বৃদ্ধ ব্যক্তি যে আমাদের সাথে এসেছে, সে আমাদের কোন আত্মীয় নয়। তাকে আমাদের বড় পাদ্রি ও ইসিজার দুর্গপতি পাঠিয়েছে। তারা আমাদেরকে বলেছিল, তোমরা এভাবে মুসলমানদের প্রধান সেনাপতির কাছে পৌঁছবে। তারপর সে তোমাদের সৌন্দর্য ও রূপ-যৌবন দেখে তোমাদেরকে তার খাছ কামরায় স্থান দেবে। তখন তোমরা সুযোগ বুঝে, তার বুকে খঞ্জর বসিয়ে দেবে এবং তার মুখ চেপে ধরে শাহরগ কেটে ফেলবে। তারপর স্বভাবিকভাবে তাঁবু থেকে বের হয়ে আসবে। অন্য যে দুজন মেয়ে আমার সাথে এসেছে তাদেরও দায়িত্ব হল, দুজন সালারকে তাদের রূপ-যৌবনের ফাঁদে ফেলে হত্যা করা। তুমি তোমার সিপাহসালারকে বল, তিনি আমাকে যে শাস্তি দেবেন। আমি তা মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত আছি।’
‘আমি এদেরকে কোন শাস্তিই দেব না। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। এই মেয়েরা স্বেচ্ছায় আসেনি তাদেরকে পাঠান হয়েছে। তবে যে ব্যক্তি এদেরকে নিয়ে এসেছে তাকে কাল সকালে ফজর নামাজের পর হত্যা করা হবে।’
মেয়েটি যখন তারিক বিন যিয়াদের ফায়সালা শুনল তখন সে বলল, ‘আমি আরও কিছু কথা বলতে চাই, সম্মানিত সিপাহসালার! আপনি হয়তো এ কথা ভেবে অবাক হচ্ছেন যে, এই মেয়ে কত বড় সাহসী। সে একটি বিজয়ী দলের সিপাহসালারকে হত্যা করতে এসেছে। আমি কখনই এত বড় সাহসী ছিলাম না। আমি তো এই জীবন সম্পর্কে একেবারে বিরক্ত হয়ে গেছি। এমন জীবন গ্রহণ করতে আমরা বাধ্য হয়েছি। আমাদের ধর্মের লোক আমাকে এবং আমার সাথীদেরকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখে থাকে। কারণ, আমরা ধর্ম্যাজিকা। আমাদের দিন-রাত অতিবাহিত হয় উপাসনালয়ে। আমাদেরকে চিরকুমারী মনে করা হয়। এটাই নিয়ম যে, ধর্ম্যাজিকা ও ধর্মযাজক আজীবন অবিবাহিত থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা হল, কোন ধর্মযাজক বা কোন ধর্ম্যাজিকাই কুমার বা কুমারী নয়। আমাদের উপাসনালয়ের পাশেই আমাদের বিশ্রামাগার। সেখানে দিন-রাত অপকর্ম, আর পাপাচার হয়। সেনাবাহিনীর বড় বড় অফিসাররা সেখানে আসে। শরাব পান করে উন্মাদ হয়ে আমাদের সাথে রাত্রি যাপন করে। দিনের আলো ফোঁটার সাথে সাথে গির্জা ও উপাসনালয়সমূহে হিতোপদেশ আর উপাসনার মাধ্যমে মানুষদেরকে খোদার ভয় দেখানো হয়। তাদেরকে এ ধারণা দেওয়া হয় যে, পাদ্রি ও ধর্ম্যাজিকা নারীগণ আসমান থেকে অবতীর্ণ নিষ্পাপ ফেরেশতা। এ সকল ধর্মগুরুরা টলেডোর শাহীমহলকেও নিজেদের করতলগত করে রেখেছে। রডারিকের মতো জালিম বাদশাহও তাদেরকে ভয় পেত।
‘রডারিক তাদেরকে ভয় পেত না। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। বরং সে ধর্মগুরুদের সামনে এ জন্য মাথা নত করে রাখত, যেন তারা তোমার মতো আকর্ষণীয় ও সুন্দরী, যুবতী ধর্ম্যাজিকাদেরকে তার দরবারে পেশ করে।
তারিক বিন যিয়াদ দোভাষীকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘এ মেয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছে। তাকে বল, সে যেন আরও কিছু কথা আমাদেরকে শুনায়।’
‘ইসিজা খ্রিস্টানদের একটি পবিত্র শহর। মেয়েটি বলল। কিন্তু প্রার্থনালয়ে যেসব ধর্মযাজিকা আছে, তাদের অধিকাংশ ইহুদিদের মেয়ে। আমিও ইহুদি। আমার বাবা একজন ব্যবসায়ী। আমার বয়স যখন তের-চৌদ্দ বছর তখন আমাকে জোরপূর্বক এক গির্জায় নিয়ে গিয়ে যাজিকা বানানো হয়। বাবা, মা, ভাই, বোন ঘর-বাড়ী সবই তারা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। তার পর গির্জার ঐ পাদ্রিরা অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে আমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ–আমার সতীত্ব ও কুমারীত্ব ছিনিয়ে নেয়। অথচ সাধারণ মানুষ আমাকে কুমারী ও ধর্মযাজিকা মনে করে তাদের হৃদয়ে স্থান দিয়েছে।
