মুসলিম বাহিনী কারমুনা থেকে রওনা হয়ে রাস্তায় এক স্থানে যাত্রা বিরতি করবে। যারা যেতে চাও তাদেরকে সেখানে পৌঁছে দেওয়া হবে। তারা সেখানে গিয়ে বলবে, আমরা তারিক বিন যিয়াদের কাছে যেতে চাই। তাদেরকে কেউ বাধা দেবে না। প্রত্যেকের কাপড়ের নিচে একটি করে খঞ্জর লুকানো থাকবে। তারিক বিন যিয়াদ অবশ্যই কোন একজনকে নিজের তাবুতে রেখে দেবে, আর অন্য মেয়েদেরকে তার জেনারেলরা নিয়ে যাবে। তারপর তোমরা নিজেরাই বুঝেতে পারছ, তোমাদেরকে কী করতে হবে। এই কাজের জন্য পাঁচ-ছয়জন মেয়ের প্রয়োজন। বল, কে কে তৈরী আছ?
মেয়েরা একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ পর একটি মেয়ে উঠে দাঁড়াল। তাকে দেখে আরেকজন রাজি হল। তারা উভয়ে এই বিপদজনক মিশনে যাওয়ার জন্য তৈরী বলে নিজেদের ইচ্ছা ব্যক্ত করল। তাদের উভয়ের পীড়াপিড়ীতে আরেকজন রাজি হল।
‘তিনজনই যথেষ্ট। পাদ্রি বলল। ‘তোমরা আমার সাথে এসো।’
পাদ্রি তাদেরকে দুর্গপতির নিকট নিয়ে গেল। দুর্গপতি ছিল একজন অভিজ্ঞ জেনারেল। সে মেয়েদেরকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিল, কীভাবে এই মিশন সফল করতে হবে।
***
তারিক বিন যিয়াদ কারমুনা থেকে ইসিজার দিকে রওনা হলেন। মুসলিম বাহিনী একদিনে পঁচিশ-ত্রিশ মাইল রাস্তা অতিক্রম করত। মুসলিম বাহিনীর দ্রুত অগ্রসর হওয়ার কথা সে সময় সকলের নিকট মশহুর ছিল। পৃথিবীর যেখানেই মুসুলিম বাহিনী যুদ্ধ করেছে সেখানেই তারা দ্রুত অগ্রসর হয়ে দুশমনকে বিস্মিত করে দিয়েছে। সুলতান সালাহ উদ্দীন আইয়ুবী এবং সুলতান মাহমুদ গজনবীর দ্রুত অগ্রসর হওয়াকে ইউরোপিয় ঐতিহাসিকগণ প্রাণ খেলে মোবারকবাদ জানিয়েছিলেন।
তারিক বিন যিয়াদ তাঁর বাহিনী নিয়ে একদিনে পঁচিশ-ত্রিশ মাইল রাস্তা অতিক্রম করতেন। কিন্তু কারমুনা ও ইসিজার মাঝে তিনি এই উদ্দেশ্যে যাত্রা বিরতি করলেন যে, ইসিজা পৌঁছেই তিনি শহর অবরোধ করবেন এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে শহর কজা করে নিবেন। এ জন্য সৈন্যদেরকে একরাতের জন্য বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন ছিল। তাই তিনি ইসিজা ও কারমুনার মাঝে এক রাতের জন্য যাত্রা বিরতি করেন।
সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে তাৰু স্থাপন করা হল। সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে রাতের গাঢ় অন্ধকার গোটা বাহিনীকে ঢেকে নিল। তারিক বিন যিয়াদ তাঁর তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। ইতিমধ্যে তাকে সংবাদ দেওয়া হল যে, একজন আন্দালুসিয় বৃদ্ধ তারিকের সাথে সাক্ষাৎ করতে চায়। বৃদ্ধের সাথে তিনটি যুবতী মেয়েও আছে।
তারিক বিন যিয়াদ তাদের সকলকে ভিতরে ঢেকে দারোয়ানকে নির্দেশ দিলেন দোভাষীকে পাঠিয়ে দিতে।
দারোয়ান বেরিয়ে গেলে তারিক মেয়েদের দিকে তাকিয়ে একেবারে হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁর চেহারায় এমন ছাপ ফুটে উঠল যে, তিনি ইতিপূর্বে এত সুন্দরী মেয়ে কখনও দেখেননি। মেয়েরা গভীরভাবে তারিক বিন যিয়াদকে দেখছিল। তিনজনের ঠোঁটেই মুচকি হাসির রেখা ঝিলিক দিয়ে উঠল।
দোভাষী আসলে তারিক বিন যিয়াদ তাকে বললেন, ‘এদেরকে জিজ্ঞেস কর, এরা এখানে কেন এসেছে?
বৃদ্ধ আপন ভাষায় তার আগমনের কারণ বর্ণনা করল। মেয়েরাও বৃদ্ধের কথায় সায় দিল।
‘বৃদ্ধ বলছে, তারা নাকি ইসিজা হতে কারমুনা যাচ্ছিল। দোভাষী তারিক বিন যিয়াদকে লক্ষ্য করে বলল। এই মেয়েদের একজন বৃদ্ধের ভাগ্নি আর অন্য দু’জন তার ভাতিজি। তাদেরকে বলা হয়েছে, কারমুনায় শান্তি ফিরে এসেছে। এখন ইসিজার উপর হামলা করা হবে। হামলাকারী সৈন্যরা মেয়েদেরকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে তাদের লাশ পাওয়া যায়। এই ভয়ে সে মেয়ে তিনটিকে কারমুনা নিয়ে যাচ্ছে।’
‘সে তাদেরকে আমার কাছে কেন নিয়ে এসেছে?’ তারিক জিজ্ঞেস করলেন।
‘ক্ষুধ-পিপাসা তাদেরকে আপনার এখানে নিয়ে এসেছে। দোভাষী বলল। ‘বৃদ্ধ বলছে, তারা সিপাহীদের কাছে খানা-পানি চাইতে পারত, কিন্তু তার আশঙ্কা হয়েছে, সিপাহীরা মেয়েদেরকে উত্ত্যক্ত করবে। এ জন্য সে আপনার নিকট আসাই ভালো মনে করেছে। আর এই মেয়েরাও আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে চাচ্ছে। এই মেয়েটি বলছে, জেনারেল তারিক বিন যিয়াদ অত্যন্ত বীরপুরুষ, তিনি রডারিককে হত্যা করে ভালোই করেছেন।’
তারিক বিন যিয়াদ দারোয়ানকে ডেকে বললেন, ‘এই চারজনের জন্য তাঁবুর ব্যবস্থা কর, বিশ্রামের জন্য উত্তম বিছানা দাও এবং খানা খাওয়াও।
দোভাষীকে লক্ষ্য করে বললেন, “এদেরকে বলে দাও, মেয়েরা এখানে পূর্ণ হেফাজতে থাকবে। সকালবেলা তারা কারমুনার উদ্দেশ্যে রওনা হতে পারবে।
দারোয়ান ও দোভাষী তাদেরকে তারিক বিন যিয়াদের তাবু থেকে বাইরে নিয়ে গেল। কিন্তু একটি মেয়ে পুনরায় তারিকের তাঁবুতে ফিরে এসে একেবারে তার কাছে বসে পড়ল। সে ইশারায় তাকে বুঝাতে চাচ্ছিল যে, সে আজ রাত এই তাঁবুতে কাটাতে চায়। তারিক দোভাষীকে পুনরায় ডেকে এনে বললেন, ‘মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করো, সে কি বলতে চায়?
দোভাষী তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, “সে তারিক বিন যিয়াদের সাথে কিছুক্ষণ একান্তে অতিবাহিত করতে চায়।’
‘তাকে বুঝিয়ে বল, আমরা এমন ধর্মের অনুসারী, যা কোন বেগানা নারীকে একাকী কোন পরপুরুষের সাথে থাকার অনুমতি প্রদান করে না। তারিক বিন যিয়াদ দোভাষীকে বললেন। তাকে বুঝাতে চেষ্টা কর যে, আমি কেবল এ বাহিনীর সিপাহসালার নই; বরং তাদের ইমামও। তাই আমি এমন কোন কাজ করতে পারি না, যার কারণে অন্যরা ভুল পথে পা বাড়ানোর সুযোগ পেয়ে যায়।
