এই বসতি যতটা সহজে আপনি জয় করেছেন সামনের কোন শহর জয় করা আপনার জন্য এতটা সহজ হবে না। এখান থেকে যেসকল সৈন্য পালিয়ে গেছে তারা আপনার ভয়ে পালিয়ে যায়নি। তাদের কমান্ডার ও দুর্গরক্ষক শহরবাসীদেরকে প্রথমে বলেছিল, তারাও মুসলিম বাহিনীর সাথে লড়াই করবে এবং দুর্গ অবরোধ সফল হতে দেবে না। আমরা উভয়ে সেই মিটিংএ ছিলাম। আমরা বলেছিলাম, এই শহরের সৈন্যসংখ্যা খুবই কম। তাছাড়া শহরবাসীদের অবরোধ বানচাল করার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতাও নেই।’
তখন অন্য আরেকজন সেনা অফিসার বলল, এখানে যুদ্ধ করার মতো রিস্ক নেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। এই শহর হামলাকারীদের জন্য বিনা যুদ্ধেই ছেড়ে দেওয়া হোক। সামনের দুর্গে একত্রিত হয়ে আমরা হামলাকারীদের শক্তি নিঃশেষ করে দেব।’
দুর্গপ্রধান বলল, ‘রডারিকের নির্বুদ্ধিতার কারণে আমাদের পরাজয় হয়েছে। তাছাড়া গোথ সৈন্যদের গাদ্দারীও আমাদের পরাজয়ের আরেকটি বড় কারণ।
অন্য একজন কমান্ডার বলল, আমরা এখন রডারিক থেকে মুক্ত হয়ে গেছি। এখন আমরা উত্তমরূপে লড়াই করতে পারব।’
‘সবশেষে সকলে সর্বসম্মতিক্রমে এই সিন্ধান্তে উপনীত হল যে, মুসলিম বাহিনীকে দূর থেকে দেখা গেলেই দুর্গের সৈন্যরা দুর্গ থেকে পালিয়ে যাবে এবং পরবর্তী শহরে গিয়ে আশ্রয় নিবে।
‘কী বললে, তোমাদের সৈন্যরা ভীত-সন্ত্রস্ত ছিল না?’ তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।
‘যারা গোয়াডিলেটের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসেছিল, তারা খুবই ভীত-সন্ত্রস্ত ছিল।’ দ্বিতীয় বৃদ্ধ উত্তর দিল। কিন্তু দুর্গের সৈন্যরা এবং শহরের লোকেরা তাদেরকে এতটা লজ্জা দিয়েছে যে, তারা এখন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তৈরী হয়ে গেছে। তাদের অন্তরে এখন ভয় নেই, আছে প্রতিশোধের আগুন। এজন্যই আমরা আপনাকে সতর্ক করতে এসেছি, আপনাদের জন্য সামনের লড়াই খুবই কঠিন হবে।’
***
তারিক বিন যিয়াদ কারমুনা পৌঁছে দুর্গ অবরোধ করে বুঝতে পারলেন, সহজে এ দুর্গ দখল করা সম্ভব হবে না। অবরোধ দীর্ঘ হবে। দুর্গপ্রাচীরের উপর তীরন্দাজ ও বর্শা নিক্ষেপকারীরা বীরের ন্যায় দাঁড়িয়েছিল। তারিক বিন যিয়াদ দেয়ালের চতুর্দিক ঘুরেফিরে দেখলেন, কোথাও দেয়াল ভাঙ্গার ব্যবস্থা আছে কিনা, কিন্তু দুর্গের দেয়াল ছিল অত্যন্ত মজবুত। অগত্যা দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা করা হলে উপর থেকে বৃষ্টির ন্যায় তীর-বর্শা নিক্ষেপ হতে লাগল। ফলে বেশ কয়েকজন মুসলিম সৈন্য আহত হলেন এবং কয়েকজন শহীদ হয়ে গেলেন।
কয়েক দিন পর্যন্ত একই পদ্ধতিতে চেষ্টা করা হল, কিন্তু কোন সাফল্য এলো না। উপর থেকে অবিরাম তীর-বর্শা নিক্ষেপ হত, আর অসভ্য ভাষায় খ্রিস্টান সৈন্যরা মুসলিম সৈন্যদেরকে গালাগাল করত।
‘জঙ্গলি বার্বার। এটা শাদুনা নয়, এটা হল কারমুনা।’ দুর্গপ্রাচীরের উপর থেকে খ্রিস্টান সৈন্যরা বলতে লাগল। এখান থেকে চলে যাও, অসভ্য জঙ্গলি কোথাকার, আমাদের হাতে কেন মরতে এসেছ? বাঁচতে চাইলে ফিরে যাও। ডাকাত, লুঠেরার দল। আমরা স্বর্ণ-রুপার কয়েকটা টুকরা নিক্ষেপ করছি, তা নিয়ে এখান থেকে চলে যাও। কালো চেহারার বানরের দল! পরাজিত রডারিক মরে গেছে। আমাদেরকে রডারিকের মতো বেকুব মনে করো না।
অবরোধ দীর্ঘায়িত হতে লাগল। কোন কোন ঐতিহাসিক লেখেছেন, অবরোধ এক মাস স্থায়ী হয়েছিল। কেউ লেখেছেন, দুই মাস স্থায়ী হয়েছে। অবশেষে এক রাতে অবরোধ উঠিয়ে নেওয়া হল। ফলে দুর্গপ্রাচীরের উপর আন্দালুসিয়ার সৈন্যরা নাচতে শুরু করল। তারা চিৎকার করে মুসলিম বাহিনীকে গালাগাল করতে লাগল। শহরের অধিবাসীরাও দুর্গপ্রাচীরের উপর উঠে এলো। মশালের আলোতে রাতের অন্ধকার দূর হয়ে গেল। গোটা শহর যেন উল্লাসে ফেটে পড়ল।
অর্ধ রাতের পর লোকজন প্রাচীর থেকে নেমে যার যার ঘরে চলে গেল। দীর্ঘ অবরোধের কারণে ক্লান্ত সিপাহী ও সিপাহসালার সকলেই ঘুমিয়ে পড়ল। দুর্গের প্রধান ফটকের উপর চোরা-কুঠরিতে ও ফটকের পিছনে কয়েকজন প্রহরী তখনও জেগেছিল। এমন সময় দুই-আড়াই শ সিপাহী এসে ফটকের সামনে দাঁড়াল। তাদের একজন উচ্চ আওয়াজে প্রহরীদেরকে চিৎকার করে ডাকল। তারা আন্দালুসিয় ভাষায় কথা বলছিল।
‘তোমরা কারা?’ প্রহরীদের কমান্ডার চোরা-কুঠুরি থেকে মাথা বের করে জিজ্ঞেস করল।
‘আমি সিউটার গভর্নর কাউন্ট জুলিয়ান। ফটকের বাহির থেকে আওয়াজ এলো। মশাল নিচু করে আমাকে দেখ।
প্রহরীদের কমান্ডার কাউন্ট জুলিয়ান সম্পর্কে জানত এবং তাকে চিনত।
‘আপনারা কোথা থেকে আসছেন? কমান্ডার জিজ্ঞেস করল।
‘ফটক খোলে প্রথমে আমাদেরকে আশ্রয় দাও।’ জুলিয়ান বললেন। এরা আমার রক্ষিবাহিনীর লোক। আমার আট শ রক্ষিসেনা মারা গেছে। আমরা গোয়াডিলেটের যুদ্ধ থেকে কোন রকম প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছি। পাহাড়ে জঙ্গলে আত্মগোপন করে থেকে অবশেষে আমরা এখানে আসতে পেরেছি। এই দুর্গ অবরোধ করে রাখা হয়েছিল, তাই আমরা দুর্গ থেকে দূরে আত্মগোপন করেছিলাম। আজ অবরোধ উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাই আমরা আশ্রয় নিতে এসেছি। আমি নিজেও আহত, আমার রক্ষিসেনাদের মধ্যে বিশ-পঁচিশজন সৈন্যও আহত। দীর্ঘ ক্লান্তি আমাদেরকে নিঃশেষ করে দিয়েছে। জলদি ফটক খোল।
ঐতিহাসিকগণ লেখেন যে, জুলিয়ানের পোশাক-পরিচ্ছদ ও শারীরিক অবস্থা এই সাক্ষী দিচ্ছিল যে, সে অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত। তার সাথে যে দুই-আড়াই শ সিপাহী ছিল তাদের অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয় ছিল। প্রহরীদের কমান্ডার কয়েকটি মশাল জ্বালিয়ে ভালো করে দেখল যে, আশ্রয়প্রার্থী স্বয়ং জুলিয়ানই। রাতের অর্থ প্রহর অতিবাহিত হয়ে গেছে অনেক্ষণ হয়। কমান্ডার তাই দুর্গপতিকে জাগানো সমীচীন মনে করল না। দুর্গের ফটক খোলে দেওয়া হল।
