এই বিজয়ের মাধ্যমে একাত্ববাদের অনুসারী মুজাহিদগণ ইসলামী ইতিহাসের আরেক সোনালী অধ্যায় রচনা করেন। বরং এভাবে বললেও ভুল হবে না যে, আন্দালুসিয়ার মাটিতে খ্রিস্টানরা স্বহস্তে নিজেদের রক্ত দিয়ে ইসলামী ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায় রচনা করে।
***
তারিক বিন যিয়াদ তাঁর সহকারী সেনাপতিদের ডাকলেন। জুলিয়ান ও আউপাস তার সাথে ছিলেন।
‘আমরা এখানে আর বেশি দিন থাকতে পারি না। তারিক তার সহকারী সেনাপতিদের বললেন। এই রণাঙ্গন থেকে যেসব সিপাহী পালিয়ে গেছে, কোথাও তাদের বিশ্রাম নেওয়ার এবং সংঘটিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না। তাদের পিছু ধাওয়া করতে হবে এবং এখনই সামনে অগ্রসর হতে হবে।’
জুলিয়ান ও আউপাসের দিক-নির্দেশনায় মুসলিম বাহিনী সামনে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। এমন সময় তারিক বিন যিয়াদের নিকট সংবাদ এলো যে, অসংখ্য বার্বার মুসলমান সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে মিসর থেকে আন্দালুসিয়া এসে পৌঁছেছে।
বার্বার জাতিগোষ্ঠির লোকেরা বিজয়ের সংবাদ শুনামাত্রই কায়রোয়ান ও সিউটার সমুদ্রসৈকত থেকে নৌকা ভাড়া করে আন্দালুসিয়া আসতে শুরু করেছিল। তারিক বিন যিয়াদ ঘোষণা করলেন, অগিত বার্বারদেরকে সেনাবাহিনীতে শামিল করে নেওয়া হোক। তবে তাদেরকে ভালোভাবে এ কথা বুঝতে হবে যে, এখানে লড়াই করতে হবে। লুটতরাজ করার কোন ইচ্ছা থাকলে, তা যেন মন থেকে বের করে দেয়।
সামনে ছিল ‘শাদুনা’ দুর্গ। এটি ছিল ছোট্ট একটি দুর্গ। মুসলিম বাহিনীকে দূর থেকে আসতে দেখে এই দুর্গে যত সৈন্য ছিল সকলেই পালিয়ে গেল। শহরের অধিবাসীরাও পালিয়ে যেতে লাগল। তারিক বিন যিয়াদ তৎক্ষণাৎ অশ্বারোহী বাহিনীর কমান্ডারকে বললেন, ‘জলদি কয়েকজন ঘোড়সওয়ারকে পাঠিয়ে পলায়নরত শহরের অধিবাসীদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা কর। তাদেরকে এই অভয় দাও যে, তাদের জান-মাল ও ইজ্জতের পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করা হবে।’
অশ্বারোহী বাহিনী পলায়নরত শহরবাসীদেরকে ফিরিয়ে আনল। এর কিছুক্ষণ পরই শহরবাসীদের একটি প্রতিনিধি দল তারিক বিন যিয়াদের সাথে সাক্ষাৎ করতে এলো।
‘আমরা অসহায়। প্রতিনিধি দলের সবচেয়ে বৃদ্ধ সামনে অগ্রসর হয়ে বললেন। ‘আমরা দুর্বল। আর দুর্বলের এই অধিকার নেই যে, সে সবলের উপর কোন শর্ত আরোপ করবে। একমাত্র বাদশাহই পারেন, আপন সমর-শক্তির মাধ্যমে দুর্বল রাজ্যের উপর আক্রমণ করে সে রাজ্যকে দখল করে নিতে। তখন তার সৈন্যরা বিজিত রাজ্যের লোকদের ঘর-বাড়ী লুটতরাজ করে এবং তাদের কন্যাদেরকে বেআবরু করে। আপনিও বোধ হয় তাই করবেন! এই শহরে আপনাকে বাধা দিতে পারে এমন কোন শক্তি নেই। মেহেরবানী করে আমাদেরকে যেতে দিন। খোঁজ করে দেখুন, আমরা আমাদের যুবতী মেয়েদেরকে ছাড়া আর কিছুই সাথে নেইনি। আপনি শহরে প্রবেশ করুন, আমরা আপনাকে স্বাগত জানাব।’
তারিক বিন যিয়াদকে জানানো হল, বৃদ্ধ কী বলছে।
‘তাকে বলো’, তারিক বিন যিয়াদ বললেন। আমরা এমন এক ধর্ম সাথে নিয়ে এসেছি, যা দুর্বলকে সবলের হাত থেকে হেফাযত করে এবং কাউকে বাদশাহ হওয়ার অনুমতি দেয় না। আমাদের ধর্মে কাউকে লুণ্ঠন করার কোন অনুমতি নেই। আর কোন নারীকে বেআবরু করার শাস্তি হল, অপরাধীকে লক্ষ্য করে এই পরিমাণ পাথর নিক্ষেপ করা হবে যেন, সে পাথরের আঘাতে মারা যায়।
এদেরকে বলো, আমরা রাজ্য জয় করতে আসিনি; বরং এই রাজ্যের লোকদের অন্তর জয় করতে এসেছি। তবে ক্ষমতা প্রয়োগ করে নয়; প্রেম-ভালোবাসা দিয়ে। সকলেই নিজ নিজ গৃহে চলে যাও। ধন-সম্পদ গোপন করার কোন প্রয়োজন নেই। যার যা আছে, তা তারই থাকবে।
প্রতিনিধি দলকে যখন তারিক বিন যিয়াদের কথা শুনানো হল তখন তাদের চেহারায় অনাস্থা ও অবিশ্বাসের চিহ্ন ফুটে উঠল। তারা কোন কিছু বলার আগেই তারিক বিন যিয়াদ ঘোড়া ছুটিয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে গেলেন। তার পিছনে মুজাহিদ বাহিনীও চলতে শুরু করল। এমনিভাবে শাদুনা দুর্গ রক্তপাতহীনভাবে মুসলিম বাহিনীর করায়ত্ব হয়ে গেল।
তারিক বিন যিয়াদ শহরের প্রশাসনিক কাজের জন্য যাদেরকে নিযুক্ত করেন তাদের সকলেই ছিল গোথ ও খ্রিস্টান। একজন মুসলমানকে শুধু প্রধান প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। সিপাহীদের মধ্য থেকে কেউ শহরবাসীদের দিকে চোখ উঠিয়েও দেখল না। একদিন অতিবাহিত হতে না হতেই শহরবাসীদের অন্তর থেকে বিজয়ীদের ব্যাপারে সকল ভয় ও দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেল।
***
সামনে ছিল আরেকটি ছোট শহর কারমুনা’। তারিক বিন যিয়াদ আট-দশ দিন শাদুনায় অবস্থান করেন। বাবার গোত্রসমূহ থেকে যেসব জোয়ানরা এসেছিল, কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে তাদের সংখ্যা ছিল বার হাজার। আবার কেউ কেউ লেখেছেন, তাদের সংখ্যা হল, পঞ্চাশ হাজার। প্রকৃত সত্য হল, তাদের সংখ্যা বিশ থেকে পঁচিশ হাজার হবে। তারিক বিন যিয়াদ তাঁর সালারদের নির্দেশ দিলেন, এসকল নবাগত যুবকদেরকে যেন ভালোভাবে যুদ্ধের নিয়ম-শৃঙ্খলা শিক্ষা দেওয়া হয়।
অবশেষে তারিক বিন যিয়াদ সৈন্যবাহিনীসহ কারমুনার উদ্দেশ্যে রওনা হতে চাইলে শহরের দুইজন সম্মানিত ও বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি তারিক বিন যিয়াদের নিকট এসে বললেন,
‘প্রথম দিন আমরা আপনার কথার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারিনি। কিন্তু আপনি কার্যত প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, আপনার ধর্ম মানবতার ধর্ম। আপনার ধর্ম প্রজা সাধারণের উপর কোন ধরনের অন্যায়ের অনুমতি দেয় না। এই শহরের প্রতিটি শিশু পর্যন্ত আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমরা আপনার অনুগ্রহের প্রতিদান এভাবে দিতে পারি যে, আমরা আপনাকে সামনের বিপদ সম্পর্কে অবহিত করে দেব।
