জুলিয়ান দুই-আড়াই শ’ সিপাহীসহ দুর্গে প্রবেশ করলেন। প্রহরীরা কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই জুলিয়ানের সিপাহীরা প্রহরীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সকলকে হত্যা করে ফেলল। জুলিয়ানের সাথে অগিত সিপাহীরা দৌড়ে অন্যান্য ফটকের নিকট পৌঁছে গেল। ফটক-প্রহরীরা কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই মুর্দা লাশে পরিণত হল। একে একে সকল ফটক খুলে দেওয়া হল। দুর্গের সিপাহীরা অবরোধ উঠে যাওয়ার আনন্দে শরাব পান করে বেহুঁশ হয়ে ঘুমাচ্ছিল। মুসলিম বাহিনী অবরোধ উঠিয়ে দূরে কোথাও যায়নি। আশেপাশেই ছিল। জুলিয়ানের ইশারার অপেক্ষা করছিল। রাতের অন্ধকার তাদেরকে ঢেকে নিল।
এটা ছিল জুলিয়ানের একটা কুটকৌশল। জুলিয়ান তারিক বিন যিয়াদের সাথে পরামর্শ করে এ কৌশল তৈরী করেছিলেন।
দুইজন ঐতিহাসিক লেখেছেন, জুলিয়ানের সাথে যে দুই-আড়াইশ সিপাহী ছিল তারা সকলে ছিল গ্রিক এবং জুলিয়ানের নিজস্ব ফৌজ। কিন্তু অন্য ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন, তারা সকলেই ছিল মুসলমান। তারা নিজেদের লেবাস পরিবর্তন করে নিয়েছিল। এই তথ্যকেই সঠিক বলে মনে হয়। কারণ, জুলিয়ানের সাথে তার নিজস্ব কোন ফৌজ ছিল না।
প্রহরীদেরকে হত্যা করে দরজা খোলে জুলিয়ান স্বয়ং মশাল হাতে নিয়ে প্রাচীরের উপর উঠলে। তিনি মশাল উঁচু করে ধরে ডানে-বামে ঘুরাতে লাগল। তারিক বিন যিয়াদ এই ইঙ্গিতেরই অপেক্ষায় ছিলেন। তিনি সাথে সাথে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন। তাঁর বাহিনী পূর্ব থেকেই প্রস্তুত ছিল। তারিক বিন যিয়াদকে অগ্রসর হতে দেখে বাবার বাহিনী প্লাবনের ন্যায় দুর্গের দিকে ছুটে চলল। তারা খোলা দরজা দিয়ে দুর্গে প্রবেশ করল। দুর্গের ভিতর হৈহুল্লোড় শুরু হয়ে গেল। দুর্গের সিপাহীরা জাগ্রত হয়ে দেখতে পেল, তারা মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী।
মুজাহিদ বাহিনী দুর্গে প্রবেশ করার পর দুর্গের কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ও সাধারণ সিপাহী সুযোগ বুঝে পালিয়ে গেল। বিশ-পঁচিশ মাইল সামনে দুর্গের মতো দেখতে একটি শহর ছিল। নাম ইসিজা। এটা ছিল বিরাট এক শহর। শহরের চতুর্পার্শ্বে মজবুত প্রাচীর। গোটা শহরটি দুর্ভেদ্য এক দুর্গ। তাছাড়া ইসিজা হল খ্রিস্টধর্মের প্রাণকেন্দ্র। এখানে বিশাল বড় এক গির্জা আছে। গির্জার পাশে ধর্মীয় পাঠশালা। এখানে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট গির্জা ও খানকা ছিল।
এটা সে সময়ের কথা যখন পাদ্রিরা খ্রিস্টধর্মের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে খানকা কেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা চালু করেছিল। তারা ধর্মের ব্যাপারে চরম স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছিল। ফলে প্রত্যেক পাদ্রিই ধর্মের মনগড়া ব্যাখ্যা দিত। তাদেরকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা স্বয়ং বাদশাহরও ছিল না। জনসাধারণ তাদেরকে পূত-পবিত্র মনে করত।
খ্রিস্টান ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন, পাদ্রিরা গির্জা ও খানকার মতো পবিত্র স্থানকেও ভোগ-বিলাসের কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। তারা সেখানে যৌনকামিতা ও মদমত্ততার স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠা করে রেখে ছিল। এসব সত্বেও সাধারণ মানুষ ইসিজাকে অতি পবিত্র স্থান মনে করত।
***
তারিক বিন যিয়াদের পরবর্তী লক্ষ্য হল এই ইসিজা শহর। জুলিয়ান ও আউপাস তাঁকে আগেই জানিয়ে ছিলেন যে, “ইসিজা খ্রিস্টানদের অত্যন্ত পবিত্র এক নগরী। খুব সহজে তা হস্তগত করা সম্ভব হবে না। শহরের সাধারণ মানুষও জীবনবাজি রেখে লড়াই করবে। অবলা নারীরা পর্যন্ত ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসবে।
জুলিয়ান ইসিজার ব্যাপারে তারিক বিন যিয়াদকে যা বলেছিলেন,তা ছিল পূর্ণরূপে বাস্তব। গোয়াডিলেটের যুদ্ধ থেকে যেসব সৈন্য পালিয়ে এসে প্রথমে শাদুনা ও কারমুনায় আশ্রয় নিয়েছিল, তারপর সেখান থেকে ইসিজা এসে আশ্রয় নিয়েছিল, তারা এ সংবাদ প্রচার করছিল যে, মুসলিম বাহিনী একের পর এক শহর দখল করে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে।
এ সংবাদ শুনে মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু প্রতিরোধের স্পৃহাও তৈরী হয়েছিল। পালিয়ে আসা সৈন্যরা বলছিল, তাদের রাজ্যে কোন সেনাবাহিনী হামলা করেনি; বরং এটা এমন এক ধর্মীয় হামলা, যা খ্রিস্টধর্মের মতো সত্য ধর্মকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।
অন্যান্য রণাঙ্গন থেকে যেসকল সৈন্য পালিয়ে ইসিজা এসে পৌঁছেছিল স্থানীয় লোকেরা তাদেরকে তিরস্কার করে বলছিল,
‘এ সকল কাপুরুষদেরকে শহর থেকে বের করে দেওয়া উচিত।’
‘হে বেহায়া ও নির্লজ্জের দল! শাদুনা ও কারমুনার মেয়েদেরকে কি দুশনের হাতে তুলে দিয়ে এসেছ?
‘আমাদের মেয়েদের হেফাযত আমরা নিজেরাই করব।’
‘এই কাপুরুষদেরকে জীবিত রেখে কোন লাভ নেই।
‘এদের পোশাক খোলে মেয়েলোকের পোশাক পরিয়ে দাও।’
‘ইসিজার নারীরাও লড়াই করবে। ঘর থেকে বেরিয়ে আসা নারীরা চিৎকার করে বলছিল। এ সকল কাপুরুষদেরকে কেউ এক ঢোক পানিও দেবে না। এর পানির পিপাসায় ছটফট করে মরুক।’
‘ক্ষুধার যন্ত্রণায় এরা ধুকে ধুকে মরুক।’
‘এদেরকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হোক।’
এ ধরনের হাজারো অভিসম্পাদ তীরের ন্যায় তাদের প্রতি নিক্ষেপ করা হচ্ছিল। তারা এখানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য এসেছিল, কিন্তু তাদেরকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। সেনাবাহিনীর লোকেরাও তাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করছিল না। তারা যেহেতু সিপাহী ছিল এবং যুদ্ধের জন্য তাদের সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল, তাই তাদের জন্য পানাহারের ব্যবস্থা করা হল। তাদের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে অফিসাররা তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, আক্রমণকারীদের লড়াই করার পদ্ধতি কি?
