‘হেনরি!’ ফ্লোরিডা হেনরির কাঁধ ধরে ঝাঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করল। আমি বুঝতে পারছি, তুমি বলতে এসেছ, মুসলিম বাহিনী রডারিকের হাতে পরাজিত হয়েছে, আর তুমি রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে এসেছ। আমার বাবা কী গ্রেফতার হয়েছেন নাকি মৃত্যুবরণ করেছেন?
‘না, ফ্লোরা!’ হেনরি বলল। কাউন্ট জীবিত আছেন। রডারিক মারা গেছে।’
‘তাহলে তার কর্তিত মাথা কেন আননি?
‘সে পানিতে ডুবে মারা গেছে, তার লাশ পাওয়া যায়নি। হেনরি রডারিকের জুতা ফ্লোরিডাকে দেখিয়ে বলল। তার এই জুতা পাওয়া গেছে। তার সাদা ঘোড়া নদীর তীরে দাঁড়ানো ছিল। ঘোড়ার কাছেই তার তলোয়ার আর জুতা পড়েছিল। এসকল বস্তু আমি এমনি এমনিই পেয়ে যায়নি। আমি তলোয়ার নিয়ে রডারিকের বাহিনীর মাঝে ডুকে পড়েছিলাম। কিন্তু আমি রডারিকের ঝাণ্ডা দেখতে পাচ্ছিলাম না। তাকে খুঁজতে খুঁজতে আমি নদী পর্যন্ত পৌঁছে যাই।
রডারিকের বাহিনী মুসলিম বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে মার খাচ্ছিল। খুঁজতে খুঁজতে এক সময় আমি রডারিকের সাদা ঘোড়া দেখতে পাই। কিন্তু রডারিককে সেখানে দেখতে পেলাম না। দেখি, ঘোড়ার নিচে রডারিকের তলোয়ার আর জুতা পড়ে আছে। আমি তার তলোয়ার আর জুতা উঠিয়ে তার ঘোড়ায় আরোহণ করে সিপাহসালার তারিক বিন যিয়াদের নিকট এসে পৌঁছি এবং তাকে বলি যে, রডারিক নদীতে ডুবে মারা গেছে। ঘোড়া আর বহু মূল্যবান হিরা-মুক্তা খচিত তলোয়ার তারিক বিন যিয়াদ নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। আমি তার নিকট আবেদন করি যে, জুতা জোড়া যেন আমার কাছে রাখা হয়। তিনি আমাকে জুতা জোড়া রাখার অনুমতি দেন। প্রমাণস্বরূপ সেই জুতাই আমি তোমার কাছে নিয়ে এসেছি।’
আনন্দে ফ্লোরিডার চেহারা ঝলমল করে উঠল। এতদিন পর তার প্রতিশোধের আগুন নির্বাপিত হল।
***
প্রফেসর ডোজি এবং গিয়ানগোজ লেখেন, মুসা বিন নুসাইর তারিক বিন যিয়াদের চিঠি পাওয়ামাত্রই অধীর আগ্রহে তা পড়তে লাগলেন। তার চেহারা আবেগের আতিশয্যে লাল হয়ে গেল। তারিক বিন যিয়াদ আট দিনের যুদ্ধের বিবরণ লেখে ছিলেন, কিন্তু সে বিবরণ পড়ে আফ্রিকার আমীর মুসা বিন নুসাইরের মন ভরল না।
‘তুমি নিজে যুদ্ধের বিবরণ দাও।’ মুসা বিন নুসাইর বার্তাবাহককে বললেন। ‘আট দিনের যুদ্ধের প্রত্যেক দিনের পূর্ণ বিবরণ দাও। তুমি নিজ চোখে যা কিছু দেখেছ, সবকিছু আমাকে শুনাও।’
ঐতিহাসিকগণ লেখেন, যুদ্ধের বিবরণ শুনতে শুনতে মুসা আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। তিনি তন্ময় হয়ে ঝুলে ঝুলে গোয়াডিলেট যুদ্ধের সরেজমিন প্রতিবেদন শুনছিলেন। এরপর তিনি খলীফার নিকট যে চিঠি লেখেছিলেন তার কিছু অংশ ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়। খলীফার নিকট যুদ্ধের বিবরণ লেখার পর তিনি এই মন্তব্যও লেখেন :
‘আমীরুল মুমিনিন। এই যুদ্ধ কোন সাধারণ যুদ্ধ ছিল না। এই যুদ্ধকে রোজ কেয়ামতের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। আমি যুদ্ধের যে মৌখিক বিবরণ শুনেছি, তাতে শরীরের প্রতিটি লোমকূপ দাঁড়িয়ে যায়। আমাদের বিজয় অসম্ভব ছিল। মাত্র বার হাজার সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র দল এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে অর্ধ দিবসও ঠিকে থাকার কথা নয়। আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর জীবন উৎসর্গকারীদের কারিশমা এটা। আমরা শুধু তাদের শুকরিয়া জ্ঞাপন করতে পারি। বিনিময় ও প্রতিদান তো কেবল আল্লাহই দেবেন।’
মুসা বিন নুসাইর চিঠির সাথে রডারিকের ঘোড়া ও তলোয়ার খলীফার নিকট পাঠিয়ে দেন। ত্রিশ হাজার যুদ্ধবন্দীকেও তিনি দামেস্কের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন।
ইবনে মানছুর নামে এক আরব কবি বন্দীদের এই দুর্দশা দেখে যে কাব্য রচনা করেন, তার মর্মার্থ হল :
‘ত্রিশ হাজার যুদ্ধবন্দীর এই বিশাল বহর দেখে মনে হচ্ছে, ইসলামের মোকাবেলায় কুফুরী শক্তি কতটা অসহায়, কতটা অক্ষম। বন্দীদের জন্য আমার মায়া লাগে, প্রথমে তো তারা একটি ভ্রান্ত বিশ্বাসের ভেজালে বন্দী ছিল, তার পর তারা বাদশাহর হুকুমের গোলাম ছিল। এখন তারা যুদ্ধবন্দী হয়ে নাঙাপায়ে পথ চলছে, এখনও তাদেরকে কেউ এই সুসংবাদ দেয়নি যে, তোমরা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছ, মিথ্যা থেকে সত্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাদেরকে এখনও বলা হয়নি যে, ইসলামে বাদশাহর পক্ষ থেকে কোন বাধ্যবাধকতা নেই, কোন জুলুম-নির্যাতনের আশঙ্কা নেই, ইসলামে বাদশাহ ও গোলামের মাঝে কোন ব্যবধান নেই।‘
লুকহার্ট নামে এক ইউরোপিয়ান কবি রডারিকের পরাজয় কবিতার আকারে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি তার সেই কবিতার নাম দিয়েছেন। ‘আন্দালুসিয়ার শোকগাথা।
রডারিকের বাহিনী যখন পূর্ণরূপে পরাজিত হয়ে যায় তখন রডারিক উঁচু একটি স্থানে গিয়ে সে দৃশ্য দেখতে থাকে। এই দৃশ্যকেই লুকহার্ট তার চমৎকার রচনা শৈলী ও কাব্যরসে পরিপূর্ণ শোকগাথায় এভাবে তুলে ধরেছেন :
‘রডারিক তার শাহীঝান্ডা দেখতে পেল গতকালও তা মাথা উঁচু করে বাতাসে পতপত করে উড়ছিল কিন্তু আজ তা এক টুকরো ছিন্ন কাপড়ে পরিণত হয়েছে রক্তে রঞ্জিত হয়ে ধুলোবালিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। রডারিক বিজয়-ধ্বনী শুনতে পাচ্ছিল, কিন্তু এটা ছিল মুসলিম বাহিনীর বিজয়-ধ্বনী।
তার ক্লান্ত ও হতাশাগ্রস্ত চোখের দৃষ্টি রণাঙ্গনের সর্বত্র ঘুরে ফিরছিল সে তার জেনারেল ও সেনাপতিদের খোঁজছিল রণাঙ্গনে যারা মারা গেছে, তারা ব্যতীত সকলেই পালিয়ে গেছে। রডারিক আফসোস করে নিজেকে বলল, আমার বাহিনীর নিহত সৈন্যদের লাশ কেউ গুণতে পারবে না এত লাশ গণনা করা করো পক্ষেই সম্ভব নয়। বিশাল-বিস্তৃত রণাঙ্গন রক্তে লাল হয়ে আছে তার দৃষ্টি সেই রক্তের সরোবরে বারবার আটকে যাচ্ছে। তার চোখ থেকে এমনভাবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে যেমনভাবে কোন আহত সিপাহীর শাহরগ থেকে রক্তের শেষ ফুটা গড়িয়ে পড়ে। রডারিক নিজেকে সম্ভোধন করে বলল, গতকালও আমি আন্দালুসিয়ার বাদশাহ ছিলাম আজ আমি কিছুই না। সুউচ্চ প্রাসাদের শাহীদরজা আমার আগমনের বার্তা শুনামাত্রই খোলে যেত। কিন্তু আজ আমার জন্য পৃথিবীর কোথাও এতটুকু জায়গা নেই, যেখানে আমি নিশ্চিন্তে বসতে পারি। পৃথিবীর সকল দরজাই আমার মুখের উপর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হতভাগা! তুমি তো মনে করতে, গোটা পৃথিবীর সমস্ত শক্তি তোমার হাতের মুঠোয় …। হাঁ, আমি তো হতভাগাই, আজ আমি শেষবারের মতো সূর্যের অস্ত যাওয়া দেখছি। হে মৃত্যু! তুমি ধীরে ধীরে কেন আসছ? আমাকে আলিঙ্গন করতে তোমার কিসের এত ভয়? এসো মৃত্যু, জলদি এসো।‘
