আন্দালুসিয়ার যুদ্ধবন্দীদেরকে মিসর পাঠানোর জন্য আন্দালুসিয়ার একটি বড় যুদ্ধ-জাহাজ নেওয়া হল। যুদ্ধবন্দী সৈন্য আর আহত ঘোড়ার সংখ্যা এত অধিক ছিল যে, সেই জাহাজে করে যুদ্ধবন্দী ও ঘোড়াগুলো কায়রোয়ান সমুদ্রসৈকতে রেখে আসতে তিন দিন লেগে গেল।
উত্তর আফ্রিকার বার্বার গোত্রসমূহ চরম উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠার মাঝে দিন অতিবাহিত করছিল। তারা কায়রোয়ানের সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে আন্দালুসিয়ার সমুদ্রসৈকতের দিকে তাকিয়ে থাকত। রণাঙ্গনের সংবাদ শুনার জন্য অধীর আগ্রহে তারা অপেক্ষা করছিল। কেউ কেউ তো সিউটার সমুদ্রবন্দরে গিয়েও বসেছিল।
অবশেষে যখন কায়রোয়ানের বন্দরে যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে প্রথম জাহাজটি এসে ভিরল তখন বাবার জনগোষ্ঠি মাঝি-মাল্লাদের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। বন্দীদের সাথে বার্বার মুজাহিদও ছিল। তারা যুদ্ধ জয়ের সংবাদ শুনালে আগত লোকেরা তাদের গোত্রের নিকট সংবাদ পৌঁছানোর জন্য ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
যেখানে যেখানে তারিক বিন যিয়াদের বিজয় আর আন্দালুসিয়ার বিশাল সেনাবাহিনীর পরাজয়ের কথা পৌঁছল, সর্বত্র আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। নারী-পুরুষ-আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই পাগলের ন্যায় নাচতে শুরু করল।
অলিগলি সর্বত্র ঘোষণা হতে লাগল, ‘তারিকের সৈন্য সংখ্যা খুবই কম। সামনে অগ্রসর হলে তার বিপদ হতে পারে। তারিকের সাহায্যের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।
এমন অসংখ্য ঘোষণা শ্লোগানে রূপান্তরিত হয়ে গেল। প্রতিটি পাড়া-মহল্লা শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠল। কিশোর-যুবক-মধ্যবয়সী পুরুষরা দল বেঁধে সিউটা এবং কায়রোয়ানের সমুদ্রসৈকতে জড়ো হতে লাগল। কয়েক দিন পূর্বেই আন্দালুসিয়ার যুদ্ধ-জাহাজ বন্দীদেরকে রেখে ফিরে গেছে। নিরুপায় হয়ে বাবার সিপাহীরা নৌকার ব্যবস্থা করে তারিক বিন যিয়াদের সৈন্যদলে যোগ দেওয়ার জন্য আন্দালুসিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হল।
যুদ্ধবন্দীদের রেখে যাওয়ার জন্য যেসব জাহাজ সিউটা এসেছিল তার একটিতে হেনরি সিউটা বন্দরে এসে নামল। সে জাহাজ থেকে নেমেই জুলিয়ানের মহলের দিকে ছুটে গেল। হেনরি যখন সিউটার বন্দরে এসে নামল তখন পর্যন্ত আন্দালুসিয়ার রণাঙ্গন সম্পর্কে কোন খবর সিউটা এসে পৌঁছেনি।
হেনরি জাহাজ থেকে নেমে যখন জুলিয়ানের মহল লক্ষ্য করে দৌড়াতে লাগল। তখন দুই-তিনজন বাবার সম্প্রদায়ের লোকও তার পিছনে পিছনে দৌড়ে এলো।
‘তুমি কি আন্দালুসিয়া থেকে আসছ?’ দৌড়াতে দৌড়াতে একজন বার্বার হেনরিকে জিজ্ঞেস করল।
‘হা।’ হেনরি না থেমেই উত্তর দিল। আমি জানি তোমরা কি জানতে চাচ্ছ…, বার্বারদেরই বিজয় হয়েছে।’
‘একটু থেমে ভালো করে বল, ভাই!’ বার্বার লোকটি দৌড়ে হেনরিকে ধরে ফেলল।
হেনরি না থেমেই সংক্ষেপে আন্দালুসিয়ার বিজয়, রডারিকের মৃত্যু এবং তার বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের সংবাদ দিল।
‘কায়রোয়ান চলে যাও।’ হেনরি বলল। সেখানে আন্দালুসিয়ার হাজার হাজার যুদ্ধবন্দীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
বার্বার লোকগুলো বিজয়-ধ্বনী করতে করতে চলে গেল। হেনরিও পুনরায় মহলের উদ্দেশ্যে দৌড় লাগাল। দুর্গের ভিতর জুলিয়ানের মহল ছিল। দুর্গ বেশি দূরে ছিল না।
ফ্লোরিডা দুর্গের উপর দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিল। এটা তার প্রতিদিনের অভ্যাস। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অসংখ্যবার সে দুর্গের উপর এসে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকত। কোন জাহাজ দেখা গেলে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে জাহাজ দৃষ্টির আড়াল না হত, ততক্ষণ পর্যন্ত সে ঐ জাহাজের দিকে তাকিয়ে থাকত। জাহাজ দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলে তার চেহারায় হতাশার চিহ্ন ফুটে উঠত; অন্তর দমে যেত। এমনিভাবে দিনের পর দিন অতিবাহিত হয়ে যেতে লাগল।
অবশেষে একদিন তার অপেক্ষার পালা শেষ হল। সে দূর থেকে দেখেই চিনতে পারল যে, হেনরি জাহাজ থেকে নিচে নেমে আসছে। সাথে সাথে সে দৌড়ে নিচে নেমে এলো।
হেনরি দুর্গের ছোট দরজা লক্ষ্য করে ছুটে আসছিল। এটাই মহলে প্রবেশের রাস্তা। দিনের বেলা মহলের দরজা খোলাই থাকত। হেনরি দরজা পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল। মহলের সকলেই তাকে চিনত। কেউ তাকে বাধা দিল না।
হেনরি মহলের বাগিচায় প্রবেশ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। এই বাগিচায় বাইরের কারো প্রবেশের অনুমতি ছিল না। হেনরি অত্যন্ত উত্তেজিত ছিল। সে বিশাল বড় এক সংবাদ নিয়ে এসেছে। তাই সে কোন কিছুর পরোয়া করল না। বাগিচায় পৌঁছে সে কিছুটা সাভাবিক হতে চেষ্টা করল।
‘হেনরি!’ হেনরি শুনতে পেল, কে যেন পিছন দিক থেকে তার নাম ধরে ডাকছে এবং তাকে লক্ষ্য করে ছুটে আসছে।
সে পিছনে তাকাতেই ফ্লোরিডা তাকে দুই বাহু প্রসারিত করে ঝাঁপটে ধরল। সেও ফ্লোরিডাকে বাহুবন্দী করে নিল। অনেক দিন পর প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার অনুভূতি তাদেরকে সবকিছু ভুলিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পরই ফ্লোরিডা হেনরির বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে তাকে হালকা ধাক্কা দিয়ে দুই পা পিছনে সরে এলো। তার চেহারায় অসন্তুষ্টির স্পষ্ট ছায়া পরিলক্ষিত হল।
‘তুমি খালি হাতে এসেছ কেন?’ ফ্লোরিডা হেনরিকে জিজ্ঞেস করল। মনে পড়ে, কি ওয়াদা করেছিলে আমার সাথে? রডারিকের মাথা কোথায়?
হেনরি চুপ করে শুনছিল, আর মিটি মিটি হাসছিল।
