সে মুজাহিদ ছিল বার্বার। এমনিতেই বার্বারদের দয়ামায়া কিছুটা কম। তাই সে বন্দীকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সামনে অগ্রসর হতে বলল।
‘ইনি আমার বড় ভাই।’ অপরূপ রূপসী এক মেয়ে তারিক বিন যিয়াদ ও জুলিয়ানের সামনে হাতজোড় করে বলল। মেহেরবানী করে সামান্য সময়ের জন্য আমাকে তার সাথে দেখা করতে দিন।
‘তাকে আসতে দাও। তারিক সেই মুজাহিদকে লক্ষ্য করে বললেন। ‘শেষবারের মতো বোনের সাথে দেখা করে নিক।
আন্দালুসিয় সিপাহী বৃত্তাকারে দাঁড়ানো মেয়েদের নিকটে চলে এলো। সে ধীরে ধীরে তার বোনের দিকে অগ্রসর হল। তার সাথে একজন মুজাহিদও ছিলেন। যেন সে সিপাহসালারের সামনে কোন ধরনের বেয়াদবী না করতে পারে। মুজাহিদের হাতে ছোট বর্শা ছিল। আন্দালুসিয় সিপাহী আর মুজাহিদ যখন সেই মেয়ের সামনে পৌঁছল তখন অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে মেয়েটি মুজাহিদের হাত থেকে বর্শা ছিনিয়ে নিল। তারপর ততোধিক ক্ষিপ্রগতিতে সেই বর্শা আপন ভায়ের বুকে সমূলে বসিয়ে দিল। মেয়েটি বর্শা টেনে বের করে পুনরায় আঘাত করার জন্য হাত উপরে উঠাল। পাশে দাঁড়ানো একজন মুজাহিদ মেয়েটির হাত ধরে ফেলল এবং তার হাত থেকে বর্শা ছিনিয়ে নিল।
বর্শার একটি আঘাতই যথেষ্ট ছিল। বর্শা সমূলে তার বুকের মাঝে বিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। শক্ত-সামর্থ সুদর্শন সেই যুবকের হাটু প্রথমে মাটি স্পর্শ করল, তারপর সে এক দিকে ঢলে পড়ল।
‘তুমি এটা কি করলে?’ জুলিয়ান সেই মেয়েকে জিজ্ঞেস করল। নিজের ভাইকেই হত্যা করে ফেললে? সে হাতিয়ার সমর্পণ করেছে–এ জন্যই কি তাকে তুমি হত্যা করলে?
‘না, আমি আরও আগেই তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সুযোগ পাইনি। মেয়েটি বলল। আপনারা যদি আমাকে এই অপরাধের জন্য শাস্তি দিতে চান তাহলে শাস্তি দিতে পারেন। আপনাদের কাছে তলোয়ার আছে, বর্শা আছে, আপনারা আমার দেহ কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলুন।
মেয়েটির কথা তারিক বিন যিয়াদকে শুনানো হল।
‘তাকে বল, তাকে আমরা কোন শাস্তি দেব না।’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন। তবে তাকে জিজ্ঞেস কর, সে তার ভাইকে কেন হত্যা করেছে?
‘এই ভাই আমাকে বাদশাহ রডারিকের অন্দরমহলে যেতে বাধ্য করেছে। মেয়েটি বলল। ‘আমার ভাই ছিল একজন সাধারণ সৈনিক, কিন্তু সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল তার। তাই সে আমাকে ধোঁকা দিয়ে একদিন রডারিকের অন্দরমহলে নিয়ে যায়। তারপর সে আমাকে এই মহিলার নিকট রেখে চলে আসে। মহিলা আমাকে মহল দেখানোর অযুহাতে মহলের অভ্যন্তরে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে। তখন থেকে বৃদ্ধ রডারিক আমাকে তার ইচ্ছা মতো ব্যবহার করতে থাকে। আমি ছিলাম তার হাতের খেলনা। দুই বছর যাবৎ আমি অন্দরমহলে আছি। এই মহিলাকে আমি কয়েকবারই বলেছি, আমাকে আমার ভায়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে দাও। প্রতিবারই সে আমাকে উত্তর দিয়েছে, অন্দরমহলের কোন মেয়ের বাইরে যাওয়ার কোন নিয়ম নেই এবং অন্য কোন পুরুষেরও এখানে আসা নিষেধ। এই মহিলাই আমাকে বলেছে, আমার ভাই সেনাবাহিনীতে উচ্চ পদ পাওয়ার জন্য আমাকে অন্দরমহলে রেখে গেছে। দুই বছর পর আজ আমার ভায়ের পাওনা মিটানোর সুযোগ এসেছে।
‘যে বাহিনীতে এমন ভাই থাকবে সে বাহিনীর পরিণতি এমনই হবে।’ কমান্ডার মুগিস আর-রুমি মন্তব্য করলেন।
‘এ সকল মেয়েরা যদি নিজ নিজ ঘরে যেতে চায় তাহলে তাদেরকে যুদ্ধবন্দী বানানোর প্রয়োজন নেই। সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ নির্দেশ দিলেন। এদেরকে আমাদের বাহিনীর সাথেই থাকতে দাও। এদের যেন কোন রকম কষ্ট না হয়। আমরা সামনে অগ্রসর হওয়ার সময় যখন এদের এলাকা আসবে তখন এদেরকে যার যার ঘরে পৌঁছে দেওয়া হবে।’
***
দ্বিতীয় দিন তারিক বিন যিয়াদ আমীর মুসা বিন নুসাইরের নিকট এক দীর্ঘ চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে তিনি গোয়াডিলেট যুদ্ধের পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরেন। সবশেষে তিনি লেখেন :
‘এখন পর্যন্ত আমি কোন শহর বিজিত করতে সক্ষম হইনি, তাই বিশেষ কোন তোহফা প্রেরণ করছি না। আমার মনে হয়, আমীরুল মুমিনিন যুদ্ধবন্দীর তোহফাঁকেই বেশি পছন্দ করবেন। এ সকল যুদ্ধবন্দী সবসময় তাঁর নিকটই থাকবে। কেননা, তাদের বাদশাহ পানিতে ডুবে মারা গেছে। এসকল বন্দীকে মুক্ত করার জন্য, কিংবা তাদের মুক্তিপণ দেওয়ার জন্য কেউ বেঁচে নেই। আমাদের কোন সিপাহীও তাদের কাছে যুদ্ধবন্দী হিসেবে নেই, যার মুক্তিপণের জন্য হলেও এদের কাউকে মুক্ত করার প্রয়োজন হবে।
সম্মানিত আমীর! আরেকটি মূল্যবান তোহফা আছে, তা হল আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিকের প্রিয় সাদা ঘোড়া। ঘোড়াটির নাম হল, উরলিয়া। বাদশাহর তলোয়ারটিও পাঠানো হল। এখন আমি সামনে অগ্রসর হচ্ছি। আমার সফলতার জন্য যেন মসজিদসমূহে দুআর আয়োজন করা হয়।‘
যুদ্ধবন্দী ও যুদ্ধলব্ধ আহত ঘোড়াগুলোকে মিসর পাঠানোর জন্য যুদ্ধ জাহাজের প্রয়োজন দেখা দিল। জুলিয়ানের চারটি বড় বড় যুদ্ধ-জাহাজ তারিক বিন যিয়াদ জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। মুসলমানদের নিজস্ব কোন যুদ্ধ-জাহাজ ছিল না।
ঐতিহাসিকগণ লেখেন, ইতিপূর্বে মুসলিম বাহিনী কখনও নৌযুদ্ধের সম্মুখীন হয়নি। তাদের যুদ্ধ-জাহাজের কোন প্রয়োজনও পড়েনি। পরবর্তীতে মুসলিম বাহিনী যখন যুদ্ধ-জাহাজে চড়ে নৌযুদ্ধের জন্য সমুদ্র-অভিযান শুরু করেন তখন সে সকল বাদশাহর নৌশক্তিকে অতল সমুদ্রে ডুবিয়ে ছাড়েন, যারা নিজেদের যুদ্ধ-জাহাজগুলোকে অপরাজেয় মনে করত।
