তাদের নিজ হাতে বানানো নৌকার পুলের কোন ক্ষতি হয়নি। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সেই পুল পার হয়ে পালাতে চেষ্টা করল। সকলেই ধাক্কাধাক্কি করে সামনে অগ্রসর হল। ধাক্কাধাক্কির কারণে কয়েকজন পুল থেকে পানিতে পড়ে গেল। যারা হাতিয়ার সমর্পণ করে বন্দীত্ব বরণ করে নিয়েছিল তারাই শুধু নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত মনে বসেছিল।
কে যেন নির্দেশ দিল, পুল দিয়ে যেসকল আন্দালুসিয় নদী পার হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, তাদেরকে বাধা প্রদান করো। সাথে সাথে কয়েকজন তীরন্দাজ মুজাহিদ নদীর তীরে চলে এলো। তারা কয়েকজন বন্দীকে দিয়ে ঘোষণা করাল যে, ‘আন্দালুসিয় সকল সিপাহী যেন ফিরে আসে, অন্যথায় তাদের উপর তীর নিক্ষেপ করা হবে। ঘোষণা শুনে পিছনে আসার পরিবর্তে তারা আরও দ্রুতগতিতে সামনে অগ্রসর হতে লাগল। ফলে তাদেরকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করা হল এবং বেশ কয়েকজন আন্দালুসিয় সৈন্য তীর বিদ্ধ হয়ে পুলের উপরই পড়ে গেল। তাদেরকে দেখে অন্য সৈন্যরা পিছনে চলে এলো। কিন্তু যারা পুলের শেষ প্রান্তে চলে গিয়েছিল তারা পালিয়ে গেল। পলায়মান এই সৈন্যদের সংখ্যাও খুব কম ছিল না।
তারিক বিন যিয়াদ রণাঙ্গনের অন্য দিকে তাকিয়ে দেখেন, কয়েকজন মুজাহিদ বিশ-পঁচিশজন যুবতী মেয়েকে পিছন দিক থেকে হাঁকিয়ে নিয়ে আসছে। এরা সকলেই রডারিকের অন্দরমহলের মেয়ে ছিল। রডারিকের মনোরঞ্জনের জন্য তার সাথে রণাঙ্গনে এসেছিল।
তারিক বিন যিয়াদ নিচে নেমে এলেন। মেয়েদেরকে তার সামনে নিয়ে আসা হল। তাদের মধ্যে মাত্র একজন ছিল মধ্য বয়সের। তাকেই এসকল মেয়েদের দায়িত্বশীল মনে হচ্ছিল। অন্যসব মেয়েদের সকলেই ছিল অল্প বয়স্ক যুবতী। কারো রূপ-লাবণ্য কারও চেয়ে কম ছিল না।
‘এ সকল মেয়েরা কি শাহীখান্দানের সাথে সম্পর্কিত?’ তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।
‘না, ইবনে যিয়াদ!’ জুলিয়ান বললেন। এরা বিভিন্ন খান্দানের সাধারণ মেয়ে। শাহানশাহে আন্দালুসিয়া এদের মাধ্যমে চিত্তরঞ্জন ও মনোরঞ্জন করত। সে আবার কিসের বাদশাহ, যার অন্দরমহলে বিশ-পঁচিশজন রক্ষিতা না থাকে!
এদেরকে জিজ্ঞেস করো, এদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে, যে বাদশাহর অন্দরমহলে আনন্দে ছিল না?’ তারিক জানতে চাইলেন।
যখন তাদেরকে এই প্রশ্ন করা হল তখন তাদের প্রায় সকলেই একযোগে উত্তর দিল, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদেরকে বাদশাহর নিকট অর্পণ করা হয়েছে। এই সকল মেয়েদের মধ্যে খ্রিস্টান মেয়েও ছিল, কিন্তু বেশিরভাগই ছিল ইহুদি।
‘বাদশাহ কোথায়? তারিক বিন যিয়াদ জিজ্ঞেস করলেন।
এই প্রশ্নের উত্তর কোন মেয়েই দিতে পারবে না।’ সরদারনী বলল। চার রাত হল, বাদশাহ কোন মেয়েকে তার তাঁবুতে ডাকেনি। প্রতি রাতেই আমি তাকে জিজ্ঞেস করতাম, কিন্তু সে রাগ করে তাঁবু থেকে আমাকে বের করে দিত। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন থেকেই সে রাগে-গোসায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। রাতের বেলা সে এত বেশি শরাব পান করত যে, এক রাতে আমি তাকে বেহুশ অবস্থায় মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি, তখন আমি একজন দারোয়ান ডেকে তাকে বিছানায় শুইয়ে দেই। সকাল হওয়ার সাথে সাথে সে পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠত।
রডারিকের বাহিনী মুসলিম বাহিনীর হাতে চরমভাবে পরাজিত হল। মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদের মাথার উপর ছিল আল্লাহ তাআলার কুদরতি হাত, আর তাঁর অন্তরে ছিল রাসূলুল্লাহর এশ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লম পূর্বেই তাঁকে বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। মূলত এই সুসংবাদ রাসূলুল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের নির্দেশ ছিল। রাসূলুল্লাহ তারিক বিন যিয়াদকে এই বলে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারিক! তুমি যদি আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাক তাহলে পরাজিত হয়ে ফিরে যাবে না। আল্লাহ তোমার সাথে আছেন।
তারিক বিন যিয়াদ রাসূলুল্লাহর নির্দেশ পূর্ণরূপে পালন করেছিলেন।
আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিকের এই নির্মম পরাজয়ের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল তার পাপ। পাপের কারণেই সে পরাজিত হয়েছে। কে জানে, কত কুমারী মেয়ে তাকে হৃদয়বিদারী আর্তনাদের মাধ্যমে অভিশাপ দিয়েছিল। কিশোরী উস্তোরিয়া মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে বলেছিল, ‘রডারিক হোর বাদশাহীর উপরও ঘোড়া দৌড়ানো হবে। উস্তোরিয়ার প্রেতাত্মা সব সময় রডারিকের চিন্তা-চেতনায় আতঙ্ক ছড়াত। উস্তোরিয়ার মতো অসংখ্য কুমারী মেয়ের অভিশাপই রডারিককে চরম পরাজয়ের শিকার হতে বাধ্য করেছে।
তারিক বিন যিয়াদ রণাঙ্গনের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রডারিকের রক্ষিতা মেয়েদেরকে তাঁর সামনে উপস্থিত করা হয়েছে। আন্দালুসিয়ার যেসকল সৈন্য পালিয়ে গিয়েছিল তাদেরকে খোঁজে খাঁজে ধরে আনা হচ্ছিল। অন্দরমহলের মেয়েদের সামনে দিয়ে তিন-চারজন বন্দীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। দুজন মুজাহিদ ছিলেন তাদের সাথে। সেই বন্দীদের মধ্যে এক বন্দীর লেবাস-ছুরত ও চালচলন দেখে তাকে সম্ভ্রান্ত মনে হচ্ছিল। তারিক বিন যিয়াদের সামনে বৃত্তাকারে দাঁড়ানো রক্ষিতাদেরকে দেখে সে দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘সামনে অগ্রসর হও।’ একজন মুজাহিদ তাকে ধাক্কা দিয়ে বলল। দাঁড়িয়ে থেকো না।’
‘এই মেয়েদের মাঝে আমার ছোট বোন আছে। সেই বন্দী বলল। তার সাথে একটু দেখা করতে দাও। হয়তো আর কখনও তাকে দেখতে পাব না।’
