হেনরি প্রমোদবালাদের তাঁবুতে প্রবেশ করল। সেখানে রডারিকের লালসার শিকার মেয়েরা জড়সড় হয়ে বসেছিল। হেনরি তাদেরকে ধমক দিয়ে রডারিকের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল। তারা সকলেই জবাব দিল, তারা কেউ রডারিকের ব্যাপারে কিছুই জানে না।
হেনরি দ্রুত তাঁবু থেকে বের হয়ে রডারিকের তলোয়ার ও জুতা উঠিয়ে তার ঘোড়ায় আরোহণ করল। তারপর দ্রুত বেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করতে লাগল, ‘রডারিক নিহত হয়েছে, রডারিক নিহত হয়েছে।’
ঘোষণা করতে করতে হেনরি তারিক বিন যিয়াদের নিকট পৌঁছে বর্ণনা করল, কীভাবে রডারিকের ঘোড়া, তলোয়ার ও জুতা তার হস্তগত হয়েছে।
হেনরির ঘোষণার সাথে সাথে আট দিনের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। লেনপোল লেখেন, এই আট দিনের যুদ্ধই মুসলমানদেরকে আন্দালুসিয়ার উপর আটশত বছর রাজত্ব করার ক্ষমতা প্রদান করেছিল। এরপরও মুসলমানদেরকে আরও কয়েকটা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে হয়েছিল, কিন্তু চূড়ান্ত যুদ্ধ হিসেবে ‘গোয়াডিলেটের যুদ্ধ’ই ইতিহাসে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হয়ে আছে।
সকল ঐতিহাসিকই একমত হয়ে লেখেছেন যে, এই ঘটনার পর রডারিকের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। তার সফেদ ঘোড়া, মণি-মুক্তা খচিত তলোয়ার, আর জুতা গোয়ডিলেট নদীর তীরে পড়েছিল। কেউ কেউ বলেছেন, সে নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করেছে। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে সে পলানোর উদ্দেশ্যে নদী পাড়ি দিচ্ছিল, কিন্তু নদীর উত্তাল তরঙ্গরাশী তাকে অপর পাড়ে পৌঁছতে দেয়নি।
অধিকাংশ ঐতিহাসিক এই বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আন্দালুসিয়ার খ্রিস্টানদের মাঝে পূর্ণমাত্রায় এ বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল যে, রডারিক নিহত হয়নি; বরং সে অতিসত্ত্বর ভিন্ন রূপে খ্রিস্টবাদের প্রচারক ও রক্ষক হিসেবে ফিরে আসবে। এ বিশ্বাস দীর্ঘদিন যাবৎ আন্দালুসিয়ার অধিবাসীদের মাঝে বদ্ধমূল ছিল।
সে সময়ে রচিত যেসকল ঐতিহাসিক প্রমাণপঞ্জি পাওয়া যায় এবং যার অধিকাংশই জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা থেকে আরেকটি নতুন বিষয় প্রতীয়মান হয়। তা হল, রডারিক নদীতে ডুবে মারা যায়নি; বরং সে নদী পার হয়ে একটি দ্বীপে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই দ্বীপে বিষাক্ত সাপের আধিক্য ছিল। প্রতিদিন একটি করে বিষাক্ত সাপ রডারিককে দংশন করত। কিন্তু তা সত্ত্বেও রডারিক মৃত্যুবরণ করত না। আল্লাহ তাআলা রডারিককে তার পাপের শাস্তি স্বরূপ সুদীর্ঘ জীবন দিয়েছিলেন। প্রতিদিনই সাপ তাকে দংশন করত। অবশেষে সে যেদিন মারা যায়, সেদিন তার মৃত দেহ সাপের খাদ্যে পরিণত হয়। যেসকল ঐতিহাসিক এই তত্ত্ব লেখেছেন, তাদের সকলেই হলেন খ্রিস্টান।
এই যুদ্ধে পঞ্চাশ হাজার আন্দালুসিয় সৈন্য নিহত হয়। এই বিপুল পরিমাণ সৈন্যের মাঝে নামকরা জেনারেল এবং আন্দালুসিয়ার ধনী ও বনেদি বংশের লোকেরাও ছিল। ত্রিশ হাজার সিপাহী এবং ছোট-বড় অসংখ্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। ঐতিহাসিক দলীল-প্রমাণে পাওয়া যায় যে, রডারিকের সৈন্যরা মুসলমানদেরকে বন্দী করে বেঁধে আনার জন্য বড় বড় রশি নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস এই যে, মুসলিম বাহিনী সেই রশি দ্বারাই রডারিকের। ত্রিশ হাজার সৈন্যকে বেঁধে তাদেরকে সাথে নিয়ে সামনে অগ্রসর হয়।
৫. যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে
০৫.
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। রডারিকের পরাজিত সৈন্যরা আত্মরক্ষার জন্য দিগবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছোটাছুটি করছে। আহত সৈন্যদের মর্মভেদি চিৎকার আর চেঁচামেচিতে গোটা রণাঙ্গনে কেয়ামতের বিভীষিকা বিরাজ করছে। “লাকা পর্বতের পাদদেশ থেকে গোয়াডিলেট নদীর তীর পর্যন্ত বিশাল-বিস্তৃত জায়গাজোড়ে শুধু লাশ আর লাশ। নিহিত সৈন্যদের শরীর থেকে প্রবাহিত রক্ত আর রণাঙ্গনের মাটি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আহত সৈন্যদের অনেকেই উঠতে চেষ্টা করছিল, কিন্তু পরক্ষণেই আবার মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল। অনেকে শেষ নিঃশ্বাস গ্রহণ করছিল। সবচেয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করছিল সে সকল সৈন্য, যাদের শরীরে তীর বিদ্ধ হয়েছিল। ছুটন্ত ঘোড়া আর পদাতিক বাহিনীর পায়ের আঘাতে উড়ন্ত ধুলা খণ্ড খণ্ড মেঘমালার ন্যায় আন্দালুসিয়ার রাজধানী টলেডোর দিকে উড়ে যাচ্ছিল।
ঐতিহাসিক স্ট্যাফিজ লেখেন : ‘বড় আশ্চর্যের বিষয় হল, মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ অবাক হয়ে রডারিকের পরাজয়ের শেষ দৃশ্যাবলী দেখছিলেন। আজ পর্যন্ত বিশ্ব ইতিহাসের বিস্ময় এই যে, মাত্র বার হাজার সৈন্যের একটি ক্ষুদ্র বাহিনী এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনীকে কীভাবে এমন করে ধ্বংস করে দিল?’
রডারিকের অশুভ আত্মা যখন রক্ত ও মাটির মাঝে গড়াগড়ি খাচ্ছিল তখন তারিক বিন যিয়াদ ঘোড়া ছুটিয়ে এক উঁচু পাহাড়ের উপর এসে দাঁড়ালেন। সেখান থেকে তিনি রণাঙ্গনের পূর্ণ দৃশ্য দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন, তাঁর জানবাজ মুজাহিদ সাথীরা শহীদ ও আহত মুজাহিদগণকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে রণাঙ্গন থেকে উঠিয়ে আনছে। আর কয়েকজন মুজাহিদ আন্দালুসিয় সৈন্যদেরকে গ্রেফতার করছে। আন্দালুসিয় সৈন্যরা ঝোঁপঝাড়ে, গাছের আড়ালে এবং লাশের নিচে আত্মগোপন করতে চেষ্টা করছে। তারা হয়তো এই আশঙ্কা করছে যে, মুসলিম সৈন্যরা তাদেরকে হত্যা করে ফেলবে।
