‘আক্রমণকারীদের রণহুঙ্কারে ভয় পেয়ো না।’ রডারিক তার বাহিনীকে বলল। এরা কোন বাদশাহর ফৌজ নয়, এরা ডাকাত; এরা লুটেরা।’
‘হে আমার মুসলিম ভায়েরা!’ তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীর মাঝে বিজয়ের উদ্দীপনা সৃষ্টির জন্য বললেন। “বিজয় তোমাদেরই হবে। তোমরা দুশমনের মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করতে পেরেছ। আর এটা ভুলে যেয়ো না যে, হাজার হাজার গোথ সৈন্য তাদের জালিম বাদশাহর হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য তোমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলার নির্দেশ হল, কোন জনবসতির উপর যদি জুলুম-নির্যাতন করা হয় এবং তাদেরকে সাহায্য করার কেউ না থাকে তাহলে তোমরা তাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে যাও। তোমরা তোমাদের এই গোথ বংশীয় ভাইদেরকে জালিম বাদশাহর হাত থেকে মুক্ত করার জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দাও।
‘আমরা জীবনবাজি রেখে তাদের জন্য যুদ্ধ করব, আমরা তাদের জন্য আমাদের জীবন উৎসর্গ করে দেব।’ বার্বার সিপাহীরা এক সাথে চিৎকার করে বলে উঠল।
***
রডারিক হামলা করার নির্দেশ দেওয়ামাত্র তার অশ্বারোহী সৈন্যরা উন্মাদের ন্যায় ছুটে এলো। তারিক বিন যিয়াদ তার অশ্বারোহী বাহিনীকে সামনের কাতারে রেখেছিলেন। যখন দুশমনের অশ্বারোহী দল কাছাকাছি চলে এলো তখন হঠাৎ করে মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী সামনে চল এলো। তারা অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে আন্দালুসিয়দের উপর তীর নিক্ষেপ করতে লাগল।
বার্বার সৈন্যদের ধনুক ছিল খুবই মজবুত। এসব ধনুক হতে নিক্ষিপ্ত তীর খুবই দ্রুত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানত। এসব ধনুকের মাধ্যমে দূরপাল্লার লক্ষ্য বস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব ছিল।
তীরের আঘাতে বেশ কয়েকজন আন্দালুসিয় অশ্বারোহী মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, কিন্তু তাদের ঘোড়া সমান গতিতে সামনের দিকে ধেয়ে আসতে লাগল। ঘোড়র গতি একটুও কমল না। তারা যখন একেবারে কাছে চলে এলো তখন তীরন্দাজ বাহিনী দ্রুতগতিতে অশ্বারোহী বাহিনীর পিছনে চলে গেল।
মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী পূর্ব হতেই তৈরী ছিল। উভয় বাহিনী প্রচণ্ড সংঘর্ষে লিপ্ত হল। উভয় বাহিনী যখন পুরোদমে যুদ্ধে লিপ্ত ঠিক তখনই তারিকের ইশারায় গোথ সৈন্যদল অতর্কিতে আন্দালুসিয়দের উপর হামলা করে বসল।
রডারিক এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রণাঙ্গনের পরিস্থিতি লক্ষ্য করছিল। গোথ সৈন্যদল আক্রমণ করার সাথে সাথে সে আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। সে পদাতিক বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দিল।
তারিক বিন যিয়াদ এবার তাঁর বিশেষ রণকৌশল প্রয়োগ করতে লাগলেন। তিনি গোথ সৈন্যদেরকে সামনাসামনি যুদ্ধ করতে বললেন, আর মুসলিম বাহিনীকে ডানে-বামে পাঠিয়ে দিলেন। একদিকে গেলেন মুগীস আর-রুমী, আর অপরদিকে গেলেন আবু জারু’আ তুরাইফ। তারা বহুদূর ঘুরে পূর্ব থেকে নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে পৌঁছলেন।
রডারিক পূর্ণোদ্যমে আক্রমণের জন্য অগ্রসর হচ্ছিল। রডারিক বাহিনীর পিছনে ছিল গোয়াডিলেট নদী। রডারিকের চতুপার্শ্বে যে বাহিনী ছিল মুগীস আর-রুমী ও আবু জারু’আ তুরাইফ সে বাহিনীর উপর বীর বীক্রমে আক্রমণ করে বসলেন। তাঁরা এতটাই আচমকা হামলা করে বসলেন যে, আন্দালুসিয় সৈন্যরা পুরোপুরি ঘাবড়ে গেল। রডারিক নিজেও বুঝে উঠতে পারল না যে, কি হতে যাচ্ছে।
রডারিকের বাহিনী নিজেদেরকে সামলে নিয়ে পাল্টা আক্রমণ করার পরিবর্তে ভীত-সন্ত্রস্ত মেষ পালের ন্যায় একজন আরেকজনের সাথে হুড়াহুড়ি শুরু করে দিল। যারা অস্ত্র সমর্পণ করল তারাই কেবল মুজাহিদদের হাত থেকে রেহাই পেল।
উভয় সালার ডান ও বাম দিকের বাহিনীকে পরাজিত করে রডারিকের মূল বাহিনীর পিছন দিকে আক্রমণ করে বসল। গোথ সৈন্যরা এই বাহিনীর সাথেই সামনাসামনি লড়ায়ে লিপ্ত ছিল। পিছন দিকের এমন অতর্কিত হামলার জন্য রডারিক বাহিনী মোটেই প্রস্তুত ছিল না। আক্রমণ প্রতিহত করে পাল্টা আক্রমণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠল না। ফলে অসংখ্য আন্দালুসিয় সৈন্য বেঘোরে জীবন হারাল। যারা আত্মসমর্পণ করল তারাই শুধু বাঁচতে পারল।
সমর বিশেষজ্ঞ ঐতিহাসিকদের মতে গোয়াডিলেটের যুদ্ধ বিশ্বের বড় বড় যুদ্ধসমূহের মাঝে একটি অন্যতম যুদ্ধ। এই যুদ্ধে যেমন বীরত্ব প্রদর্শিত হয়েছে তেমনিভাবে মুসলমানদের পক্ষ হতে এমনসব রণ-কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে, যা খুব কম যুদ্ধেই পরিলক্ষিত হয়।
ভয়ঙ্কর এই যুদ্ধের ময়দানে এক ব্যক্তি উন্মুক্ত তলোয়ার নিয়ে কাউকে যেন তালাশ করে ফিরছিল। গৌরবর্ণের সে যুবক যুদ্ধ করছিল না। কাকে যেন খুঁজতে খুঁজতে সে গোয়াডিলেট নদীর তীরে এসে পৌঁছল। তারপর প্রমোদবালাদের কামরায়ও গেল, কিন্তু মনে হচ্ছিল, সে যাকে খোঁজ করছিল তাকে পাচ্ছিল না।
এই যুবকই হল হেনরি, যে ফ্লোরিডার কাছে ওয়াদা করে এসেছিল যে, রডারিকের মস্তক কেটে এনে ফ্লোরিডার পদতলে রাখবে। হেনরি হন্তদন্ত হয়ে রডারিককে তালাশ করছিল।
রডারিকের ঝাণ্ডা দেখা যাচ্ছিল না। অনেক্ষণ হয় সেই ঝাণ্ডা ভূপাতিত হয়েছে। আন্দালুসিয় সৈন্যদের হতোদ্যম হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হল, তাদের শাহীঝাণ্ডা ভূপাতিত হয়ে গিয়েছিল। যার অর্থ হল, বাদশাহ হয়তো নিহত হয়েছে, নয়তো গ্রেফতার হয়েছে।
হেনরি নদীর তীরে রডারিকের সাদা ঘোড়া দেখতে পেল, কিন্তু রডারিককে দেখতে পেল না। ঘোড়র কাছেই একটি তলোয়ার পড়েছিল। তলোয়ারের হাতলে বহু মূল্যবান মণি-মুক্তা খচিত ছিল। এটা যে রডারিকের তলোয়ার তাতে কোন সন্দেহ ছিল না। আশ্চর্যের বিষয় হল, রডারিকের জুতাও তলোয়ারের কাছে পড়েছিল।
