‘তোমরা চাও, শরাবের নেশায় যেন আমার জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়।’ রডারিক বলল। তোমরা চাও, আমি যেন এই কঠিন বাস্তবতাকে ভুলে যাই।
জেনারেল রডারিকের তাঁবু থেকে বের হয়ে মেয়েদের তাঁবুর দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর জেনারেল যখন ফিরে এলো তখন তার সাথে একটি অপরূপ সুন্দরী মেয়ে ছিল। রডারিক মেয়েটিকে খুবই পছন্দ করত। জেনারেল মেয়েটির সাথে কি যেন বলল। তাঁবুর নিকটবর্তী হয়ে সে মেয়েটিকে তাঁবুতে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি তাঁবু থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো। রডারিক তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে তাঁবু থেকে বের করে দিল। তাল সামলাতে না পেরে মেয়েটি হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর উঠে ধীরে ধীরে মেয়েদের কামরার দিকে চলে গেল।
***
রডারিক চিৎকার করে বৃদ্ধ জেনারেলকে ডাকল। জেনারেল হন্তদন্ত হয়ে রডারিকের তাঁবুতে এসে উপস্থিত হল। রডারিককে কিছুটা শান্ত মনে হচ্ছিল।
‘মনে হয়, সেই ইহুদি জাদুকর ব্যর্থ হয়ে গেছে।’ রডারিক হতাশার সুরে বৃদ্ধ জেনারেলকে লক্ষ্য করে বলল। সেই জাদুকর আমাকে বলেছিল, একটি অল্প বয়স্কা কুমারী মেয়েকে বলি দিলে আমি অশুভ শক্তির মন্দ প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারব। আমি তাকে একটি কুমারী মেয়ে দিয়েছিলাম। সে হয়তো তাকে বলি দিয়েছে, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়ে গেছে। সেই ইহুদি আমাকে ধোঁকা দেয়নি তো?
‘আমি এখনই একজন দ্রুতগতি সম্পন্ন অশ্বারোহী টলেডো পাঠিয়ে দিচ্ছি, সে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সংবাদ নিয়ে ফিয়ে আসবে।’ বৃদ্ধ জেনারেল বলল।
‘সে কবে পৌঁছবে, আর কবেইবা ফিরে আসবে?’ পরাজিত সৈনিকের মতো হতাশার সুরে রডারিক বলল। আসলে হিরাক্লিয়াসের দুর্গ খোলা আমার ঠিক হয়নি। দুর্গের রক্ষক সেই পাদ্রি দুজন আমাকে বাধা দিয়েছিল। তুমি আমার সাথে ছিলে, তুমিও আমাকে নিষেধ করেছিলে।
‘শাহানশা! অন্তর থেকে এই দুশ্চিন্তা এখন বের করে দিন। বৃদ্ধ জেনারেল বলল।
‘কীভাবে আমি আমার অন্তর থেকে এই দুশ্চিন্তা বের করে দেব। রডারিক ভীত-সন্ত্রস্ত কণ্ঠে বলল। তুমি কি দেখতে পাচ্ছে না, দুর্গে আমরা যুদ্ধের যে দৃশ্য দেখেছিলাম, সে দৃশ্য আমরা এখানে প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি। মুসলমানদের সেই রণহুঙ্কার শুনতে পাচ্ছি। প্রতিদিন আমার বাহিনী মার খেয়ে পিছু হটে আসছে। দুর্গের সেই ছায়াচিত্রে আমি নিজেকে দেখতে পেয়েছিলাম। আমি দেখেছিলাম, আমার ঘোড়া আমাকে ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে। আর যে মেয়েটিকে আমি পাম্পালুনায় হত্যা করেছিলাম, তাকে আবারও স্বপ্নে দেখতে পাচ্ছি।’
ঐতিহাসিক লেনপোল তকালীন আন্দালুসিয়ার তিনজন ঐতিহাসিকের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেছেন, ‘রহস্যময় দুর্গ, আর সেই কিশোরী মেয়ে রডারিকের মন-মস্তিষ্কের উপর প্রেতাত্মার ন্যায় বেঁকে বসেছিল। যে ইহুদি জাদুকর রডারিককে এই প্রেতাত্মার হাত থেকে মুক্তি দেবে বলে কথা দিয়েছিল, সে জাদুকর মেরিনার হাতে নিহত হয়েছে। তারপর বিশ-পঁচিশ হাজার সিপাহীর বিশাল বাহিনী কেবলমাত্র রডারিকের পক্ষই ত্যাগ করেনি, বরং তার বিরুদ্ধে দস্তুরমতো লড়াই করছে। তারপরও রডারিকের নিকট যে পরিমাণ সৈন্য ছিল, তার সংখ্যাও মুসলিম বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি ছিল। কিন্তু তার বাহিনীর প্রতিটি সৈন্য মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল। রণাঙ্গনের কর্তৃত্ব পুরোদমে তারিক বিন যিয়াদের হাতে চলে এসেছিল। তারিক কোন দুশ্চিন্তা বা প্রেতাত্মার অশুভ প্রভাবের শিকার ছিলেন না। তাঁর মনে কোন পাপের অনুশোচনা ছিল না। তার দৃঢ় বিশ্বাস তার মনোবলকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। পক্ষান্তরে পাপের অনুশোচনা রডারিককে কুরে কুরে খাচ্ছিল। সে ভাবছিল তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার সময় উপস্থিত হয়েছে।
***
গোয়াডিলেট নদীর তীরে যুদ্ধের অষ্টম দিনের সর্য উদিত হল। রডারিক তার সকল সৈন্যকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে ময়দানে দাঁড় করাল। সে তার সফেদ ঘোড়া উরলিয়ার উপর বসাছিল। সে ঘোড়ায় চড়ে সারিবদ্ধ সৈন্যদের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছুটতে ছুটতে ঘোষণা করতে লাগল,
‘আজকের যুদ্ধেই চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে। আজ তোমরা যদি দুশমনকে পরাজিত করতে পার তাহলে এত বিপুল পরিমাণ পুরস্কার তোমাদেরকে দেব যে, তোমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও শাহানশা রডারিককে স্মরণ করবে।’
ওদিকে তারিক বিন যিয়াদ সোথ সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এক জ্বালাময়ী ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন : ‘হে গোথ সম্প্রদায়, তোমরা যদি আজ পরাজিত হও তাহলে আন্দালুসিয়া হতে তোমাদের বংশ নির্মূল করা হবে। তোমাদের স্ত্রী-কন্যা ও ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে রডারিক জীবন্ত কবর দেবে।
হে আমার বাবার সম্প্রদায়! তোমরা কি কখনও কারো কাছে পরাজিত হয়েছ? আজ যদি তোমরা পরাজিত হও তাহলে কোথায় যাবে? তোমরা এই প্রথম অন্য একটি দেশে আক্রমণ করতে এসেছ। আরব মুসলমানরা কয়েকটি রাজ্যকে ইসলামী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। তোমরা কি এটা পছন্দ করবে যে, তোমাদের আরব ভাইরা বলবে, বার্বাররা অন্য দেশে গিয়ে যুদ্ধ করার যোগ্য ছিল না?’
‘না, তারিক! কক্ষণও না! বার্বার মুজাহিদগণ সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল। আমরা তোমার সাথে আছি, তোমার সাথেই থাকব।
