এমন সময় এক অশ্বারোহী গোখ সৈন্য পিছন দিক থেকে দ্রুতগতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে জেনারেলের পিঠ লক্ষ্য করে সজোরে বর্শার আঘাত হানল। তারপর টেনে বর্শা বের করে পুনরায় আঘাত করল। জেনারেল ঘোড় হতে পড়ে সাথে সাথে মারা গেল।
গোখ সৈন্যরা তলোয়ার কোষাবদ্ধ করে মুসলিম বাহিনীর দিকে এগিয়ে গেল। তাদের মাঝে পদাতিক ও অশ্বারোহী বিপুল সংখ্যক সৈন্য ছিল। তারা হৈ-হট্টগোল করে সামনে অগ্রসর হচ্ছিল। তারিক বিন যিয়াদ তো পূর্বে থেকেই জানতেন যে, গোধ ও ইহুদিরা তাদের সাথে মিলে যাবে। কিন্তু রিকের সৈন্যরা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। তারা ভাবছিল, এটা আবার কেমন হামলা! হামলাকারী তলোয়ার কোষবদ্ধ করে রেখেছে।
‘তাদেরকে স্বাগত জানাও। তারিক বিন যিয়াদ ঘোষণা করালেন। এখন থেকে তারা তোমাদের দোস্ত, তোমাদের সহযোদ্ধা।
‘এটা হচ্ছে কি?’ রডারিক হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগল। এরা যাচ্ছে কোথায়? এরা তো দেখছি, নিজেদের জেনারেলকে হত্যা করে ফেলল?
তার এসব প্রশ্নের জওয়াব দেওয়ার কেউ ছিল না। এটা ছিল মেরিনা ও আউপাসের গোপন পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন।
কত সংখ্যক গোথ সৈন্য মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিয়েছে, সে ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, বিশ হাজার। কেউ বলেছেন, পঁচিশ হাজার। আবার কেউ বলেছেন, পনের-বিশ হাজারের মাঝামাঝি হবে।
রডারিকের প্রশ্নের জবাব কেউ দিতে পারছিল না। মুসলিম বাহিনীর দিক থেকে এক গোথ সৈন্য সামনে অগ্রসর হয়ে উচ্চস্বরে বলল,
‘আমরা আমাদের বাদশাহ অর্টিজার প্রতিশোধ নেব। আন্দালুসিয়ায় বাদশাহী করার অধিকার একমাত্র গোয় সম্প্রদয়েরই আছে। রডারিক! তুমি গোথদের রাজত্ব খতম করে নিজে ক্ষমতার মসনদে বসেছিলে। এবার দেখতে পাবে, আমরা আমাদের অধিকার কীভাবে আদায় করি।
***
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে রণাঙ্গনের চেহারাই পাল্টে গেল। আগের দুই দিন রডারিক তার সৈন্যদের মাধ্যমে বিপুল বিক্রমে আক্রমণ করিয়েছিল, কিন্তু প্রতিটি আক্রমণই চরম ব্যর্থতার রূপ নিয়েছিল। আজ যখন এক সাথে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা বিশ হাজার বৃদ্ধি পেল তখন গোটা আন্দালুসিয় বাহিনীর মনোবল একেবারেই ভেঙ্গে গেল।
বিশ হাজারের মতো যে বিপুলসংখ্যক সৈন্য মুসলিম বাহিনীর সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিল, তারা কোন মামুলি সিপাহী ছিল না। তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সামরিক বাহিনীর নিয়মিত সিপাহী ছিল। তাদের সকলের অন্তরেই প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। প্রতিশোধের স্পৃহা নিয়ে যে সকল গৌথ ও ইহুদি সৈন্য মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল, মুসলিম বাহিনী তাদেরকে সাদরে গ্রহণ করল। ফলে মুসলিম, গোথ ও ইহুদি সৈন্যদের সম্মিলিত বাহিনী এক অপ্রতিরুদ্ধ শক্তিতে পরিণত হল।
সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে তারিক বিন যিয়াদ যুদ্ধ পলিসি পরিবর্তন করলেন এবং গোথদের মধ্য থেকেই একজনকে তাদের জেনারেল নিযুক্ত করলেন। তাদের পূর্বের জেনারেল গোথ সৈন্যের হাতে নিহিত হয়েছিল।
‘কে বলতে পারবে, আমার রাসূল সালালাহু আলাইহি ওয়াসালামের ভবিষ্যত্বাণী সত্য প্রমাণিত হবে না?’ তারিক বিন যিয়াদ তার সালারদেরকে সম্বোধন করে বললেন। আল্লাহর সাহায্য যখন আসে তখন তার বান্দার সকল সমস্যাই দূর হয়ে যায়। আল্লাহ অবশ্যই তার মাহবুবের সুসংবাদ পূর্ণ করবেন। এখন আমার সামনে সেই সুসংবাদ চিরসত্যের রূপ ধারণ করেছে। তোমরা তোমাদের অধীনস্থ সকল সিপাহীকে বলে দাও, তারা যেন আল্লাহর দরবারে সেজদাবনত হয়, আর সর্বদা অন্তরে আল্লাহর নাম স্মরণ করে।
রণাঙ্গনের অপর দিকের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। গোয়াডিলেট নদীর তীরে এক জাঁকজমকপূর্ণ তাবুতে রাগে-দুঃখে বাদশাহ রডারিক ছটফট করছিল। কখনও সে কুরসীর উপর বসছিল, কখনও আবার লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে তাঁবুর মাঝে পায়চারী করছিল। কখনও রাগে-গোসায় টেবিলের উপর সজোরে আঘাত করছিল। আবার কখনও এক হাত দ্বারা অন্য হাতে আঘাত করছিল।
সেই তাঁবুর বাইরে দুজন জেনারেল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল। অবশেষে একজন বয়স্ক জেনারেল—-রডারিক যাকে অত্যন্ত সম্মান করত–কামরায় প্রবেশ করে বলল :
‘বাদশাহ নামদার! আপনি এভাবে ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। গোথ সিপাহীরা ধোঁকা দিয়েছে তাতে কী এমন অসুবিধা হয়েছে? আমরা সেসকল বিশ্বাসঘাতক গোথদের বংশ ধ্বংস করে দেব।’
‘আমাদের বংশই তো ধ্বংস হচ্ছে। রডারিক সজোরে মাটিতে পদাঘাত করে গর্জে উঠে বলল। যা বলছ, যদি তোমরা তা করতে পারতে তাহলে প্রথমদিনই এ লড়াই শেষ হয়ে যেত। তোমরা দুশমনের কী ক্ষতি করতে পেরেছ? সংখ্যার বিচারে আমাদের সামনে তাদের দৃষ্টান্ত হলে, মানুষের পায়ের নিচে পিপড়ার ন্যায়। কিন্তু এই পিপড়াই এখন আমাদের অস্তিত্বের জন্য বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুশমন কমজোর হওয়ার পরিবর্তে দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। আমার সামনে থেকে চলে যাও।
জেনারেল চলে না গিয়ে বরং পানপাত্রে শরাব ঢেলে রডারিকের সামনে পেশ করে বলল, ‘আমরা শাহানশাকে এ অবস্থায় দেখতে চাই না। এই নিন; পান করে নিজেকে একটু সামলে নিন।
রডারিক জেনারেলের হাত থেকে পানপাত্র নিয়ে সজোরে তা ছুঁড়ে ফেলে দিল। পানপাত্র শক্ত মেজের সাথে লেগে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
