যাহোক, আন্দালুসিয়ার বাহিনী মুসলিম বাহিনীর সামনে টিকতে পারল না। তারা পিছু হটতে বাধ্য হল। মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহী বাহিনীকে অতর্কিত হামলা করে নাজেহাল করে তুলল। আন্দালুসিয়ার সৈন্যবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পূর্ণরূপে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। একেকজন মুসলিম যোদ্ধা কয়েকজন আন্দালুসিয় সৈন্যকে হত্যা করে অকুতোভয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহী সৈন্যদেরকেও তারা সমানতালে হত্যা করছিল। অনেক সৈন্যকে তারা ঘোড়াসহ জীবন্ত পাকড়াও করল।
মুসলিম বাহিনীর মুহুর্মুহু তাকবীর-ধ্বনীতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর পরই যুদ্ধের দামামা বেজে উঠছিল। যুদ্ধের ময়দানে বার্বার সৈন্যরা এক ধরনের বিশেষ দামামা বাজাতে অভ্যস্ত ছিল। সেই দামামার বিকট আওয়াজ শত্রুবাহিনীর অন্তরে মৃত্যুর বিভীষিকা ছড়িয়ে দিত।
রডারিকের সৈন্যদের মাঝে পূর্ব হতেই আতঙ্ক বিরাজ করছিল। ফলে যুদ্ধের ময়দানে এসে শত্রুপক্ষের দুর্দমনীয় আক্রমণ দেখে তাদের যুদ্ধ-স্পৃহা একেবারেই খতম হয়ে গেল। তাদের অনেকেই হাতিয়ার ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে লাগল।
***
রডারিকের নির্দেশে রাতের বেলা ক্যাম্পের চতুর্দিকে পাহারা জোরদার করা হল। তারপরও জানবাজ কয়েকজন মুজাহিদ ক্যাম্পে পৌঁছে কমান্ডো আক্রমণের মাধ্যমে বেশ কিছু সৈন্যকে হত্যা করে এবং অসংখ্য ঘোড়া জখম করে নিমিষেই অন্ধকারে পালিয়ে গেল।
সকালে রডারিক অগ্নিশর্মা হয়ে বলল, ‘আজ আমি এই দস্যুবাহিনীর উপর শেষ আঘাত হানব। আজকের লড়াই হবে শেষ লড়াই। আজ আমি নিজেই যুদ্ধের নেতৃত্ব দেব।’
রডারিক এক গৌথ জেনারেলকে লক্ষ্য করে বলল, এখন পর্যন্ত কোন গোথ সিপাহীকে আমি সম্মুখ যুদ্ধে পাঠাইনি। তুমি তোমার গোথ সিপাহীদেরকে প্রস্তুত হতে বলে দাও। গোথ সিপাহীরাই এখন আমার একমাত্র ভরসা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, একমাত্র তোমরাই বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবে। আমার সম্প্রদায়ের সিপাহীরা আমাকে ভীষণ লজ্জায় ফেলে দিয়েছে।’
এই সেই জেনারেল, যাকে মেরিনা নিজের পক্ষে আনতে চেষ্টা করেছিল। মেরিনা তাকে এই প্রস্তাব দিয়েছিল যে, যখন পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হবে তখন সে যেন গোথ বাহিনীকে নিয়ে মুসলিম বাহিনীর সাথে মিশে যায়। কিন্তু এই জেনারেল মেরিনার কথায় রাজি হয়নি। অবশেষে মেরিনা একটি সুন্দরী মেয়ের লোভ দেখিয়ে তাকে বাগে আনতে চেষ্টা করেছিল। মেরিনা তাকে বলেছিল,
এই মেয়েকে আমি রডারিকের জন্য এনেছি। যুদ্ধের দিনগুলোতে সে রডারিকের মনোরঞ্জনের জন্য রডারিকের সাথে থাকবে। তুমি যদি আমার কথায় রাজি হও তাহলে এই মেয়ে সুযোগ করে তোমারও মনোরঞ্জন করবে। চিন্তা করে দেখ, এমন সুযোগ বারবার আসবে না।’
মেরিনা চাচ্ছিল, জেনারেল যদি রাজি হয় তাহলে যুদ্ধ চলাকালীন সময় অন্তরঙ্গ কোন এক মুহূর্তে মেয়েটি জেনারেলকে এক ধরনের নেশাকর পানীয় পান করাবে। সেই নেশার প্রভাবে মেয়েটি তাকে যা বলবে, সে তাই করতে বাধ্য হবে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে রডারিকের নির্দেশে মেয়েটিকে জাদুকর বোসজনের হাতে তুলে দিতে হল। ফলে মেরিনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হল না। ইহুদি জাদুকর বোসজন সেই মেয়েটিকে জবাই করার জন্য নিয়ে গেল।
আজ যুদ্ধের তৃতীয় দিন। গোয়াডিলেট নদীর তীরে গোথ সিপাহীরা মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করার জন্য সম্মুখে অগ্রসর হল। তাদের পিছনে ছিল অন্য সম্প্রদায়ের সৈন্যবাহিনী। রডারিক তাদের মাধ্যখানে অবস্থান করছিল। সে তার সফেদ ঘোড়া উরলিয়ার উপর বসেছিল। তার মাথার উপর ছিল আন্দালুসিয়ার পতাকা, আর চতুরপার্শ্বে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী।
তারিক বিন যিয়াদ রডারিকের পতাকা দেখে ঘোড়া ছুটিয়ে সৈন্যবাহিনীর সম্মুখ দিকে চলে এলেন। তারিক বিন যিয়াদের পিছনে তার রক্ষী বাহিনী এগিয়ে এলে তিনি তাদেরকে পিছনে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং মুগীছ আর-রূমীকে কাছে ডেকে তার কানে কানে কি যেন বললেন।
মুগীছ আর-রূমী আন্দালুসিয়ার ভাষা বুঝতেন। তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে ঘোষণা করলেন, আমরা আন্দালুসিয়ার শাহানশাকে স্বাগতম জানাচ্ছি। আমাদের সিপাহসালার তারিক বিন যিয়াদ বলছেন, বাদশাহ রডারিক যদি যুদ্ধের জন্য এসে থাকেন তাহলে তিনি যেন আমাদের মতো রক্ষিবাহিনী ছাড়া একাকী সামনে আসেন।’
‘আমার মতো কোন বাদশাহ যদি তোমাদের মাঝে থাকত তাহলে আমি তোমাদের সামনে যেতাম। অপর দিক থেকে রডারিক ঘোষণা করাল। একজন দস্যুসরদারের সামনে যাওয়া আমার মতো বাদশাহর জন্য শোভা পায় না। তোমাদের উচিৎ ছিল তোমাদের বাদশাহকে সাথে নিয়ে আসা।’
‘আমরা তোমাকে অচিরেই আমাদের বাদশাহর নিকট পৌঁছে দেব। তারিক বিন যিয়াদের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হল। আমাদের বাদশাহ হলেন আল্লাহ। আমরা কোন মানুষকে বাদশাহ বানাই না। আমাদের সকলের বাদশাহ একমাত্র আল্লাহ” এই পয়গাম পৌঁছানোর জন্য এবং তোমাদের বাদশাহী চিরতরে খতম করার জন্যই আমরা এসেছি।’
‘সামনে অগ্রসর হও।’ গোথ জেনারেলের নাম নিয়ে রডারিক হুঙ্কার ছেড়ে বলল। এই বর্বর জংলিদের মুখ বন্ধ করে দাও।
‘গোথ সিপাহীরা, আঁপিয়ে পড়। শত্রু বাহিনীকে ধ্বংস করে দাও।’ গোথ জেনারেল চিৎকার করে নির্দেশ দিয়ে সে নিজেও প্রবল বেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে দিল।
