অন্যন্য সৈন্যরা দেখার আগেই লাশগুলো সরিয়ে না ফেলে রডারিক বড় ধরনের একটি ভুল করল। আগে থেকেই আন্দালুসিয়ার বাহিনীর মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। সকাল হতেই বিপুল সংখ্যক সহযোদ্ধার মৃত দেহ দেখে অন্যান্য সৈন্যরা আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। রডারিকের উচিৎ ছিল রাতের অন্ধকারেই লাশগুলো উঠিয়ে সমুদ্রে ফেলার ব্যবস্থা করা। কিন্তু সে হয়তো এ কথা ভেবে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল যে, মুসলিম বাহিনী এক রাতে এত বিপুল সংখ্যক সৈন্য খতম করল কীভাবে? তার ধারণা ছিল, মাত্র কয়েকটি দল আক্রমণ করলেই এই স্বল্প সংখ্যক মুসলমান পলায়ন করতে বাধ্য হবে। কিন্তু প্রথম দিনের যুদ্ধেই তার সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হল।
রডারিক তার জেনারেলদেরকে ডেকে বলল, ‘ময়দানে তোমাদের সৈন্যদের যে পরিমাণ লাশ দেখেছ এই পরিমাণ মুসলমানদের লাশ আজ আমি দেখতে চাই। তোমাদেরকে আজ অবশ্যই প্রতিশোধ নিতে হবে।’
‘আজ আমরা বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে তাদের উপর আক্রমণ করব। একজন জেনারেল বলল।
‘পাহাড়ের অভ্যন্তরে গিয়ে আমরা তাদেরকে খতম করব। থিয়োডুমির বলল।
‘তোমার মাথায় যদি সামান্য বুদ্ধি থাকত তাহলে তুমি তাদের হাতে মার খেয়ে পলায়ন করতে না।’ রডারিক বলল। তুমি যদি সৈন্য নিয়ে পাহাড়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ কর তাহলে তুমি তো মারা পরবেই, তোমার একজন সিপাহীও জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারবে না।’
তারপর সে অন্য জেনারেলকে লক্ষ্য করে বলল, তুমি বলছ, বিপুল পরিমাণ সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করবে। তুমি কি কালকের যুদ্ধ দেখনি? তারা প্রথমে তোমাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। তারপর তোমাদেরকে এক জায়গায় একত্রিত করে ব্যুহ রচনা করে সবাইকে খতম করেছে। তুমি কি জান না, যুদ্ধের ময়দানে দুশমনের সামনে জটলা সৃষ্টি করা ক্ষতিকর?’ আজ বরং স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করবে। একজন মুকাবেলা করবে একজনের। নিজেদের মাঝে এতটুকু দূরত্ব রাখবে, যেন অনায়েসে তলোয়ার চালান যায়। আজকের হামলায় অর্ধেক অশ্বারোহী, আর অর্ধেক পদাতিক থাকবে।’
এদিকে তারিক বিন যিয়াদ কয়েকজন পদাতিক সৈন্য নিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি প্রথমে আক্রমণ করতে চাচ্ছিলেন না, বরং দুশমনের যুদ্ধ-কৌশল বুঝার জন্য প্রথমে তাদেরকে আক্রমণের সুযোগ দিতে চাচ্ছিলেন।
রডারিকের পরিকল্পনা মুতাবেক তার ফৌজ গতকালের মতো দ্রুত বেগে সম্মুখে অগ্রসর হল না, বরং তারা স্বাভাবিক গতিতে সামনে অগ্রসর হতে লাগল। তারা তিনটি সারিতে সারিবদ্ধ ছিল। প্রথম সারিতে ছিল অশ্বারোহী বাহিনী। তারা মুসলিম বাহিনীকে দেখামাত্র দ্রুত বেগে ধেয়ে আসল। মুসলিম সৈন্যগণ পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। তারা সকলেই ছিল পদাতিক। তাদের মাঝে একজন অশ্বারোহীও দেখা যাচ্ছিল না।
মুসলিম বাহিনীর পক্ষ হতে যুদ্ধের নাকারা বেজে উঠল। আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহীরা পূর্ব হতেই বর্শা প্রস্তুত করে রেখেছিল। তারা সামনে অগ্রসর হয়ে মুসলিম বাহিনীকে লক্ষ্য করে তীর-বর্শা নিক্ষেপ করতে লাগল। কিন্তু মুসলিম বাহিনী পাল্টা আক্রমণ না করে আন্দালুসিয়ার বাহিনীকে অবাক করে দিয়ে মাটির উপর বসে পড়ল। ক্ষিপ্রবেগে ছুটে আসা ঘোড় মুহূর্তের মধ্যে মুসলিম বাহিনীকে অতিক্রম করে সামনে চলে গেল। তারা সাথে সাথে ঘোড়া থামাতে ব্যর্থ হল। পরে যখন তারা ঘোড়া থামিয়ে পিছনে ফিরে আসছিল ততক্ষণে মুসলিম বাহিনী আন্দালুসিয়ার পদাতিক বাহিনীর নিকট পৌঁছে পূর্ণ উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে।
এ অবস্থায় আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহী বাহিনী একেবারে কিংকর্তব্যবিমোঢ় হয়ে পড়ল। কারণ, তারা যদি মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করে তাহলে তাদের পদাতিক সৈন্যও আক্রমণের শিকার হয়ে পড়বে। আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহী বাহিনী যখন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে ভাবছিল, কী করা যায়–এমন সময় পিছন দিক হতে মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনীর একটি দল আন্দালুসিয়ার অশ্বারোহীদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে বসল। এই আক্রমণ আন্দালুসিয়ার বাহিনীর কাছে অকল্পনীয় ছিল। তারা কোন কিছু বুঝে উঠার পূর্বেই মুসলিম বাহিনী তাদেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলল।
আন্দালুসিয়ার বাহিনী যখন তাদের অশ্বারোহীদের করুন অবস্থা দেখল তখন তাদের সাহায্যার্থে আরেক দল অশ্বারোহী মুসলিম অশ্বারোহীদেরকে প্রতিহত করার জন্য সামনে অগ্রসর হল। কিন্তু তারা পৌঁছার পূর্বেই মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী দ্রুতবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে যে পাহাড়, আর টিলা হতে বের হয়ে এসেছিল সেদিকে চলে গেল।
আন্দালুসিয়ার যে অশ্বারোহী বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়েছিল–পিছন থেকে তাদেরকে বারবার এই বলে সতর্ক করা হল, “খবরদার, পাহাড়ের ভিতর যেও না। ফিরে এসো।’
অগত্যা আন্দালুসিয়ার দ্বিতীয় অশ্বারোহী দলটিও যখন ফিরে আসতে লাগল তখন মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনীর আরেকটি দল পিছন হতে আক্রমণ করে তাদেরকে খতম করতে লাগল। মুসলিম বাহিনী তাদের উপর আক্রমণ করেই দ্রুত পালিয়ে যেত।
ঐতিহাসিকগণ লেখেন, উভয় পক্ষের সৈন্যরাই সমানতালে বীরত্ব প্রদর্শন করছিল, কিন্তু মুসলমানদের মাঝে যে স্পৃহা ছিল আন্দালুসিয়দের মাঝে তা ছিল না। মুসলিম বাহিনী ছিল বাবার সম্প্রদায়ের লোক। বার্বার জাতি-গোষ্ঠির জন্য যুদ্ধ-বিগ্রহ হল একটি সাধারণ বিষয়। অধিকন্তু তারা ছিল যুদ্ধপারদশী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ একটি বাহিনী। রণাঙ্গনে তাদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের কথা ছিল খুবই মশহুর। ইসলাম গ্রহণের পর কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করা তাদের ধর্মীয় বিশ্বসে পরিণত হয়েছিল, ফলে তাদের যুদ্ধ-স্পৃহা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল।
