সমরবিশারদ ঐতিহাসিকগণ লেখেছেন, মুসলিম সেনাপতির রণকৌশল নিঃসন্দেহে তার যুদ্ধ-পারঙ্গমতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব থেকেই আন্দালুসিয়ার প্রতিটি সৈনিকের অন্তরে মুসলিম বাহিনী সম্পর্কে যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল, তা-ই তাদের যুদ্ধের মনোবল একেবারে দুর্বল করে দিয়েছিল।
সেদিন রডারিক আরও কয়েকটি দলের মাধ্যমে আক্রমণ পরিচালনা করাল। প্রত্যেক বাহিনীকে ভালোভাবে বলে দিল যে, মুসলিম বাহিনী যদি পিছু হটে তাহলে তোমরা তাদের পিছু নিবে না। কিন্তু তখন আর মুসলিম বাহিনীর পিছু হটার কোন প্রয়োজন ছিল না। তাদের উপর আক্রমণ হওয়ার সাথে সাথে তারা দূর-দূরান্তের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল। ফলে আন্দালুসিয়ার বাহিনী বাধ্য হয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। এই সুযোগে মুসলিম বাহিনী আন্দালুসিয়ার বাহিনীর উপর প্রচণ্ড আক্রমণ করে তাদের প্রচুর ক্ষতি সাধন করল।
মুসলিম বাহিনী পিছু হটার কৌশলে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর উপর আক্রমণ করত। তারপর আচানক একত্রিত হয়ে তিন দিক থেকে ব্যুহ রচনা করে আন্দালুসিয়ার বাহিনীকে ঘিরে ফেলত। মুসলিম বাহিনী ধীরে ধীরে তাদের ন্যূহ সংকুচিত করে আনত। ফলে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর জন্য তলোয়ার উঁচিয়ে আঘাত করারও সুযোগ থাকত না। এই সুযোগে মুসলিম বাহিনী তাদেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলত।
সূর্য অস্ত যাওয়ার পর দেখা গেল, গোটা রণাঙ্গণজোড়ে শুধু রডারিকের সৈন্যদের লাশ আর লাশ। নিয়ম অনুযায়ী সেদিনের মতো সকল সৈন্য নিজ নিজ ছাউনিতে চলে গেল। মাত্র একদিনের যুদ্ধে এত বিপুল পরিমাণ সৈন্যের প্রাণহানী দেখে রডারিক বাহিনীর অপরাপর সৈন্যদের অন্তরআত্মা কেঁপে উঠল। তারা সকলেই ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল।
***
রাতের অর্ধ প্রহর অতিবাহিত হয়েছে। রডারিকের বাহিনী গভীর ঘুমে অচেতন। কয়েকজন প্রহরী এদিক-সেদিক ঘুরাফেরা করছে। হঠাৎ কে যেন পিছন থেকে এক প্রহরীর মুখ চেপে ধরে সমূলে তার বুকে খঞ্জর বসিয়ে দিল। আরও কয়েকজন প্রহরীর অবস্থাও এমনই হল। অল্প সময়ের মধ্যে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর এই দিকটা একেবারে প্রহরী মুক্ত হয়ে গেল। সাধারণ সৈন্যদের জন্য তাবুর কোন ব্যবস্থা ছিল না। খোলা আকাশের নিচে বিস্তৃত প্রান্তরজোড়ে যে যার মতো ঘুমিয়ে ছিল। প্রত্যেক সিপাহীর ঘোড়া তার নিকটেই বাঁধা ছিল।
প্রহরী নিহত হওয়ার পর ছয়টি ছায়ামূর্তি সন্তর্পণে ঘোড়াগুলোর কাছে গিয়ে পৌঁছল। তারপর দ্রুত হাতে ঘোড়র রশি কেটে দিয়ে খঞ্জর মেরে ঘোড়াগুলো জখম করে দিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে প্রায় দেড়শ ঘোড়া তারা জখম করে ফেলল। আঘাত এত গভীর ছিল যে, ঘোড়াগুলো ভয়ঙ্ককরূপে হ্রেষা ধ্বনি করতে করতে দিগ্বিদিক ছুটতে লাগল।
ছায়ামূর্তিগুলো অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতিতে একেকটি ঘোড়াকে আঘাত করছিল, আর ঘোড়াগুলো আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে চিৎকার করতে করতে এলোপাথারি ছুটতে লাগল। আহত ঘোড়ার চিৎকার শুনে সিপাহীরা জেগে উঠল ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। সৈন্যরা ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হওয়ার ভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটতে লাগল। এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হল যে, ঘোড়র পদতলে পিষ্ট হয়ে মাটিতে শুয়ে থাকা ও পলায়নরত অসংখ্য সৈন্য বেঘোরে মারা পড়ল।
বিস্তৃত প্রান্তরজোড়ে রডারিকের সৈন্যরা সারাদিনের যুদ্ধক্লান্ত দেহ নিয়ে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েছিল। আঘাতপ্রাপ্ত ও লাগামহীন ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়ে কত সিপাহী যে মারা পড়ল, তার কোন হিসাব রইল না। ঘোড়াগুলোকে রাও সম্ভব ছিল না। যেই ছুটন্ত ঘোড়ার সামনে এসে পড়ত, তারই পরিণতি হত অত্যন্ত করুণ। ঘোড়ার সাথে ধাক্কা খেয়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ত, আর অন্য ঘোড়ার পা তার শরীর ক্ষতবিক্ষত করে সামনে অগ্রসর হয়ে যেত।
এই চোরাগোপ্তা হামলায় যারা অংশ নিয়েছিল তারা ছিল জানবাজ কয়েকজন মুজাহিদ। তারা মিশন শেষ করে নিরাপদে নিজেদের ক্যাম্পে ফিরে এলো। তারা যখন তাদের ক্যাম্পে এসে পৌঁছল তখনও রডারিকের সৈন্যদের শোরগোল শুনা যাচ্ছিল। তখনও আঘাতপ্রাপ্ত ঘোড়াগুলোর এলোপাথারি ছুটোছুটি করার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। আঘাতপ্রাপ্ত এই ঘোড়াগুলো কোন সাধারণ ঘোড়া ছিল না। যুদ্ধের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অসাধারণ ঘোড়া ছিল এগুলো। তাই ঘোড়াগুলোকে আয়ত্বে আনা সহজ কোন ব্যাপার ছিল না। ঘোড়ার ছুটোছুটি আর আহত সৈন্যদের চিৎকারে রডারিকসহ বাহিনীর সকল সৈন্যই জেগে উঠল।
মশাল জালানো হল। একটা ঘোড়াকে খুব কষ্ট করে ধরা হল। ঘোড়র পিঠ থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছিল। রডারিক হতভম্ব হয়ে গেল। সে অবাক হয়ে ভাবছিল, এতগুলো ঘোড়া জখম হল কি করে? আরও কয়েকটি ঘোড়া ধরে আনা হল। সবগুলোর শরীর থেকেই প্রবল বেগে রক্ত ঝরছিল।
‘নিশ্চয় শত্রুবাহিনী রাতের অন্ধকারে এ কাজ করেছে।’ রডারিক বলল ‘যারা পাহারায় ছিল তাদের সকলকে ঘোড়ার পিছে বেঁধে মোড়া ছুটিয়ে দাও। তারপর তাদের চামড়া ছিলে সমুদ্রে নিক্ষেপ কর।’
সাথে সাথে প্রহরীদেরকে খোঁজা শুরু হল। অনেকক্ষণ পর তাদের তিন জনের লাশ পাওয়া গেল।
***
রাত শেষ হয়ে যখন পূর্ব আকাশে দিনের আলো ফুটে উঠল তখন চোখে পড়ল, মাত্র এক রাতে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর কী ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে। রাত্রি যাপনের জন্য আন্দালুসিয়ার বাহিনী ময়দানের যে স্থানটিতে অবস্থান করছিল সে স্থানটির চতুর্দিকে কেবল লাশ আর লাশ।
