তারিক বিন যিয়াদের এই সংক্ষিপ্ত জ্বালাময়ী ভাষণ শুনে মুসলিম মুজাহিদগণ আকাশ-বাতাস মুখরিত করে গর্জন করে বলে উঠল, ‘তারিক বিন যিয়াদ। তোমার কোন ভয় নেই, আমরা তোমার সাথে আছি; তোমার সাথেই থাকব।’
আন্দালুসিয়ার বাহিনীর পক্ষ হতে ঘোষণা করা হল, তোমরা যেই হও না কেন, এখান থেকে চলে যাও। আন্দালুসিয়ার শাহানশার বাদশাহী এক সদ্র হতে আরেক সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। তার তলোয়ারের ভয়ে গোটা ইউরোপ প্রকম্পিত। তোমাদের প্রতি তার অনুগ্রহ এটাই যে, তোমরা এখান থেকেই ফিরে যাবে, তা হলে আর তলোয়ার কোষবদ্ধ থাকবে। অন্যথায় তোমাদের পরিণাম হবে খুবই ভয়াবহ।
তারিক বিন যিয়াদকে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর ঘোষণা তরজমা করে বুঝানো হলে তিনি তার জবাব দিয়ে বললেন, আন্দালুসিয় ভাষায় এটা ঘোষণা করে শুনাও। ঘোষণা শুনানোর জন্য আটপাস ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে উচ্চ আওয়াজে বলল :
‘তারিক বিন যিয়াদের পক্ষ থেকে আন্দালুসিয়ার শাহানশাকে সালাম। মুহতারাম শাহানশা! আমরা বিনয়ের সাথেই জানাচ্ছি যে, আমরা ফিরে যেতে পারব না। করণ, আমরা আমাদের সকল রণতরী জ্বালিয়ে দিয়েছি। আমরা এ জন্য শাহানশার শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি আমাদের জন্য সমুদ্রে নৌকার পুল তৈরী করে দিয়েছেন। আমরা আল্লাহর নির্দেশে এসেছি, সুতরাং আন্দালুসিয়ার বাদশাহর হুকুমে ফিরে যেতে পারি না।’
অপর প্রান্ত হতে আন্দালুসিয় এক জেনারেল বার্বার ভাষায় ঘোষণা করল, ‘শাহানশা রডারিকের মুকাবেলা করতে এলে আল্লাহও তোমাদের কোন সাহায্য করতে পারবে না। তোমরা হলে ডাকাতের দল, আমরা তোমাদেরকে শেষবারের মতো …।’
জেনারেলের মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই মুসলিম বাহিনীর দিক থেকে তিনটি তীর এসে সমূলে তার বুকে বিদ্ধ হল। সে ঘোড়া হতে নিচে পড়ে গেল। তৎক্ষণাৎ আন্দালুসিয়ার দুইজন অশ্বারোহী ঘোড়া দৌড়িয়ে এসে তার লাশ ঘোড়ায় উঠিয়ে নিয়ে গেল।
***
রডারিক সৈন্যবাহিনীর সম্মুখ দিকে ছিল না। তার পতাকা ছিল পিছনে। সে তার সফেদ ঘোড়া ‘উরলিয়ার উপর বসাছিল। সে যখন জানতে পারল যে, মুসলিম বাহিনী তার এক জেনারেলকে হত্যা করে ফেলেছে তখন সে আক্রমণ করার নির্দেশ দিল। রডারিক সমরশাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শী ছিল। আক্রমণাত্মক যুদ্ধে তার বেশ সুনামও ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রের যে প্লান সে বানিয়েছিল তার জেনারেলরা তা পরিপূর্ণরূপে রপ্ত করে নিয়েছিল।
ররিক তার জেনারেলদেরকে বলল, “ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ করতে হবে। দুই-তিনটি দল মিলে এক সাথে আক্রমণ করবে। এর চেয়ে বেশি সৈন্য এক সাথে ভীড় করলে তোমাদের নিজেদের তীরেই তোমরা জখম হবে এবং তোমাদের নিজেদের ঘোড়ার পদতলে পিষ্ঠ হয়ে মারা যাবে। তাছাড়া ভীড়ের মাঝে সিপাহীরা ঠিকমত তীর চালাতে এবং স্থান পরিবর্তন করতে পারবে না। তাই প্রতিটি আক্রমণই হবে ছোট ছোট দলের মাধ্যমে এবং প্রতিটি আক্রমণের সময়ই নতুন ও উদ্যমী সৈন্য অংশ গ্রহণ করবে। দুশমনের সংখ্যা খুবই অল্প, তাদেরকে অনবরত যুদ্ধ করতে বাধ্য করতে হবে, যেন তারা বিশ্রামের সুযোগ না পায়। এক দিনেই যুদ্ধ শেষ করা ঠিক হবে না। যুদ্ধ যতই প্রলম্বিত হবে দুশমন ততই আমাদের তলোয়ারের শিকারে পরিণত হবে। এক সময় তারা ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে হাতিয়ার সমর্পণ করতে বাধ্য হবে।
এদিকে তারিক বিন যিয়াদ তার কমান্ডারদের উদ্দেশ্যে বলছিলেন, কোথাও এক জায়গায় ঠাই দাঁড়িয়ে থেকে লড়াই করবে না। আঘাত করেই সরে পড়বে। সরে পড়ার সময় চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়বে, যেন তোমাদের পিছু নিয়ে দুশমনরাও ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। যে কোন হসনাই হোক শত্রুবাহিনীকে পাহাড়ের আড়ালে নিয়ে আসতে হবে। তখন তীরন্দাজ বাহিনীই তাদেরকে সামলাতে পারবে।
তারিক বিন যিয়াদের প্রান ছিল গেরিলা যুদ্ধের। কারণ, এত বিপুল সংখ্যক সৈন্যবাহিনীর সাথে একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে এক জায়গায় স্থির থেকে সামনা-সামনি যুদ্ধ করে যাওয়া কোন প্রকারেই সম্ভব নয়। কিন্তু গেরিলা যুদ্ধও কোন সহজ যুদ্ধ নয়। কেবলমাত্র বিজ্ঞ কোন জেনারেলের পক্ষেই গেরিলা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব।
রডারিক তার বাহিনীকে আক্রমণ করার নির্দেশ দিলে আন্দালুসিয়ার বাহিনী মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারিক বিন যিয়াদ তিন-চারটি ছোট দলকে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। তারা এমনভাবে লড়াই করতে লাগল, যেন তারা পলায়নের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ করতে করতে তারা সন্তর্পণে পিছু হটে এলো, যেন আন্দালুসিয়ার সৈন্যরা কিছুই বুঝতে না পারে। মুসলিম বাহিনী একটা পাহাড়ের আড়ালে এসে ডানে-বামে ছড়িয়ে পড়ল। সাথে সাথে পাহাড়ের চূড়া হতে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর উপর বর্শী ও তীর বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
এ সকল তীর-বর্শা থিয়োডুমিরের বাহিনী থেকে হাসিল হয়েছিল। তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীকে বর্শা নিক্ষেপ করার বিশেষ কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলেন।
যেসকল মুসলিম সৈন্য ডানে-বামে ছড়িয়ে পড়েছিল তারা কিছু দূর অগ্রসর হয়ে একত্রিত হয়ে গেল। আন্দালুসিয়ার সৈন্যরা হঠাৎ তীর বৃষ্টির মুখে পড়ে দিশেহারা হয়ে যখন পলায়ন করতে লাগল তখন মুসলিম বাহিনী অতর্কিতে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আন্দালুসিয়ার বাহিনীর যে দলটি আক্রমণ করতে এসেছিল তারা বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছুটোছুটি করতে লাগল। তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙ্গে পড়ল। ফলে তারা অসহায়ভাবে মুসলিম বাহিনীর হাতে মার খেতে লাগল।
