আর্থ গ্লেম্যান আরও লেখেন : ‘তারিক বিন যিয়াদের এই আক্রমণ ছিল অত্যন্ত কার্যকরী ও সফল।
***
মুসলমানদের তাঁবুতে সর্বদা বিজয়ের জন্য দুআ করা হচ্ছিল। অপরদিকে ইহুদি ও গোদের উপাসনালয়ে রডারিকের পরাজয়ের জন্য প্রার্থনা করা হচ্ছিল। ইহুদি ও গোথ সম্প্রদায়ের লোকেরা পরস্পর এ ধরনের আলোচনা করত যে, রডারিক যদি নিহত হয় বা পরাজিত হয় তাহলে রাজত্ব তো আমাদেরই থাকবে। হানাদার বাহিনী তো লুটতরাজ করে চলেই যাবে।’
রডারিকের বাহিনী গোয়াডিলেট নদীর তীরে এসে পৌঁছল। তারিক বিন যিয়াদ খবর পেয়ে ঘোড়ায় করে একটি নিকটবর্তী পাহাড়ের উপর চড়লেন। গোয়াডিলেট নদীর তীরে বহুদূর পর্যন্ত তিনি অসংখ্য মানুষ আর ঘোড়ার মিছিল দেখতে পেলেন। এত বিপুল সংখ্যক সৈন্যবাহিনী ইতিপূর্বে তিনি কখনও দেখেননি। তাকে পূর্বেই বলা হয়েছিল যে, রডারিকের সৈন্যসংখ্যা এক লাখের মতো হবে।
‘আল্লাহ্! হে আমার আল্লাহ! তারিক বিন যিয়াদ আসমানের দিকে দুই হাত প্রসারিত করে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলে উঠলেন। তোমার নামের সম্মান রক্ষা করো, আমরা তো তোমার নামেই কুফুরীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছি। আমরা একমাত্র তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।’
তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীকে নদী থেকে প্রায় এক মাইল পিছনে রেখেছিলেন। তিনি চাচ্ছিলেন, রডারিকের বাহিনীকে গোয়াডিলেট নদীর তীরে নিয়ে আসতে, যাতে তাদের পশ্চাদে থাকে অথৈ পানি, আর খরস্রোতা নদী।
তারিক বিন যিয়াদ অল্প কিছু সংখ্যক সৈন্য নিয়ে নদীর দিকে অগ্রসর হন, আর বেশির ভাগ সৈন্যকে তিনি পাহাড়ের ভিতর আত্মগোপন করে থাকতে বলেন। তারিক সামনে অগ্রসর হয়ে লক্ষ্য করলেন যে, রডারিকের বাহিনী অতিদ্রুত নৌকা দিয়ে পুল তৈরী করছে।
‘এদেরকে তো অত্যন্ত ক্ষিপ্র মনে হচ্ছে। তারিক বিন যিয়াদের পিছন থেকে কে যেন বলে উঠল।
তারিক বিন যিয়াদ কথা শুনে পিছন ফিরে দেখেন, মুগিস আর-রূমী ও আবু জুরাআ তুরাইফ তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন।
‘আমরা খুব দ্রুতই এই বাহিনীকে তাড়িয়ে দিতে পারব।’ তারিক বিন যিয়াদ বললেন।
‘তারা যদি যুদ্ধক্ষেত্রেও এমন ক্ষিপ্র হয় …।’ আবু জারু’আর মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই তারিক বিন যিয়াদ বলে উঠলেন,
‘আপনারা কি দেখতে পারছেন না, তাদের এই ক্ষিপ্রতার কারণ কি? তারিক বিন যিয়াদ বললেন। লক্ষ্য করে দেখুন, তাদেরকে কীভাবে বেত্রাঘাত করা হচ্ছে। তারা স্বেচ্ছায় এই কাজ করছে না; বরং তাদের সালারের অনবরত বেত্রাঘাত তাদেরকে এ কাজ করতে বাধ্য করছে। যুদ্ধের ময়দানেও কি তাদের সালার তাদেরকে এভাবে পিঠিয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য করবে?”
তারিক বিন যিয়াদের দুই সালার গভীরভাবে লক্ষ্য করে দেখলেন, গোয়াডিলেট নদীর তীরে ফেরাউনের সময়কার দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। কিছু মানুষ কর্মরত মানুষের মাথার উপর ছড়ি ঘুরাচ্ছে। কেউ একটু অলসতা করলে সাথে সাথে তার পিঠে সপাং সপাং বেতের বাড়ি পড়ছে।
‘লাঠির ভয় দেখিয়ে যুদ্ধ করানো যায় না। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। দৃঢ়চেতা মন, আর পাহাড়সম মনোবল নিয়ে যুদ্ধ করতে হয়। যে সম্প্রদায়ের নেতারা তাদের অধীনস্থদেরকে গোলাম মনে করে, আর বাদশাহ তার প্রজাদের জন্য ফেরাউন হয়ে যায়, সে সম্প্রদায়ের ধ্বংস অনিবার্য। উঁচু-নীচুর ভেদাব্দে একটি সুসংঘঠিত জাতিকেও ধ্বংস করে ছাড়ে। আমাদের সিপাহীদের মনোবল অটুট। জেনারেল হোক বা সিপাহী, অশ্বারোহী হোক বা পদাতিকসকলের অন্তরেই এক আল্লাহ ও এক রাসূল। এ কারণেই আমাদের মাঝে পূর্ণ সমতা বিদ্যমান। কারো আল্লাহ বড়, আর কারো আল্লাহ ছোট–এমন নয়। প্রাসাদ কিংবা পর্ণকুটির–সর্বত্রই আল্লাহ্ সমানভাবে বিরাজমান। বড়ত্ব একমাত্র আল্লাহরই।
‘কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক সৈন্য!’ আবু জারু’আ তুরাইফ অনেকটা হতাশার স্বরে বললেন।
‘সকলেই নিজ নিজ জায়গায় চলে যান। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। ‘আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে বিজয় দান করার জন্য এমনসব উপকরণ সৃষ্টি করেছেন, যা আমি মোটেও আশা করিনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদ মিথ্যে হতে পারে না; কিন্তু আমি কেবল স্বপ্ন দেখার মানুষ নই। আমি বিশ্বাস করি, যে ব্যক্তি আল্লাহকে তালাশ করে সে অবশ্যই আল্লাহকে পায়। আর আল্লাহ কেবল তাকেই সাহায্য করেন, যে চেষ্টা-সাধনা করে। এখন তোমাদের কাজ হল, মাথা ঠিক রেখে অটল-অবিচল থাকা।
নদী পার হতেই রডারিকের সৈন্যদের সারা রাত লেগে গেল। সকাল হওয়ার সাথে সাথে দেখা গেল নদীর তীরের বিস্তৃত প্রান্তর জোড়ে রডারিকের একলাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী লড়ায়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক লেনপোল লেখেছেন :
তারিক বিন যিয়াদ ঘোড়ায় আরোহণ করে তার ফৌজের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বললেন :
‘আমার মুজাহিদ ভাইয়েরা! তোমাদের সামনে আছে তোমাদের রক্তপিপাসু দুশমন, আর পিছনে আছে কূলকিনারাহীন অথৈ সমুদ্র। পলায়নের কোন রাস্তাই তোমাদের জন্য খোলা নেই। তোমাদের সম্মুখে একটাই রাস্তা খোলা আছে, তা হল বীরত্বের সাথে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনা। দুশমনের সংখ্যাধিক্যে ভয় পেয়ো না; বরং সেই পরাজয়কে ভয় কর, যা তোমাদের জন্য বয়ে আনবে সীমাহীন লাঞ্ছনা।
