‘বাদশাহ আপনার জন্য বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে।’ মেরিনা বলল। এত সুন্দর একটি মেয়েকে সে আপনার কাছে রাখতে দেবে না, বরং আমি এই মেয়েকে বাদশাহর কাছে পৌঁছে দেব। সে বাদশাহর সাথেই যাবে; কিন্তু আমি তাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলব, যেন সে আপনার সাথে সম্পর্ক রাখে। তবে আমি আপনাকে যা বললাম, আপনি যদি তা করেন তাহলে আমি আপনাকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারি যে, রডারিক যদি নিহত হয় তাহলে নতুন বাদশাহকে বলে আপনার জন্য বিশাল জায়গীরের ব্যবস্থা করে দেব।’
মেরিনা সেই তরুণীকে ডেকে এনে বলল, এই জেনারেলের উপর কোন ভরসা করা যায় না। সে প্রতারণাও করতে পারে।’
মেরিনা ঐ তরুণীর হাতে সামান্য ‘সুফুফ’ দিয়ে বলল, “রাত্রে এই জেনারেলের তাঁবুতে গিয়ে তাকে শরাব পান করাবে এবং শরাবের সাথে এই সুফুফ মিশিয়ে দেবে।
সুফুফ এক জাতীয় চূর্ণ ঔষধ। এর মাঝে কোন বিষক্রিয়া নেই। তবে তা সেবনের ফলে মেধা লোপ পায় এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। সুফুফ সেবন করানো দ্বারা মেরিনার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের সময় এই জেনারেলকে অকেজো করে রাখা।
এই সুফুফ যদি রডারিককে পান করান যেত তাহলে ইহুদি ও গোছদের সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তবে তা ছিল একেবারেই অসম্ভব। কেননা রডারিক কোন কিছু পানাহার করার পূর্বে দু’জন ব্যক্তিকে খাইয়ে তা পরীক্ষা করে নিত। এমন কি খানা পাক করার সময়ও তার একান্ত আস্থাভাজন দুই-তিনজন লোক সেখানে উপস্থিত থাকত। মোটকথা, রডারিককে সুফুফ জাতীয় কোন কিছু পান করানো একেবারেই অসম্ভব ছিল।
ঐতিহাসিকগণ লেখেন, বাদশাহরা সাধারণত এধরনের সতর্কতা অবলম্বন করেই থাকে। কিন্তু রডারিক জানত যে, সে কত বড় জালিম। তাই সে সর্বদা মাজলুমদের প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যাপারে শঙ্কিত থাকত।
***
গোধ ও ইহুদি নেতবর্গ আউপাসের সাথে পরামর্শ করে যে প্লান বানিয়েছিল, সে অনুযায়ী প্রায় দেড়শ নওজোয়ান তৈরী করা হল। রডারিক টলেডোতে পৌঁছার পর নওজোয়ানদেরকে তার সামনে উপস্থিত করা হল এবং বলা হল যে, এরা স্বেচ্ছায় ফৌজে শামিল হতে চায়। এরা সাধারূণ কোন সিপাহী নয়, বরং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও জানবাজ।
রডারিককে আরও বলা হল, এরা নৈশ অভিযানে পারদর্শী। রাতের আঁধারে হামলাকারীদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে এরা তাদের সমূহ ক্ষতি সাধন করতে পারবে।
রডারিক যেদিন টলেডো এসে পৌঁছে তার আগের দিন আউপাস টলেডো ছেড়ে চলে যায়। সেদিন রাতেই গোথ সম্প্রদায়ের কমান্ডাররা এক গোপনে বৈঠকে মিলিত হয়। এই বৈঠকে দু’জন ইহুদি নেতাও ছিল। তারা অনেক গোপন বিষয়ে মতবিনিময় করার পর সবাই যার যার মতো চলে গেল।
পরদিন রডারিক একলাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে টলেডো এসে পৌঁছলে দেখা গেল, তার বাহিনীর ঘোড়সওয়ারই হবে কয়েক হাজার। তারা হানাদার বাহিনীকে আন্দালুসিয়া থেকে বিতাড়িত করার জন্য ঝড়ের গতিতে অগ্রসর হচ্ছিল, কিন্তু তারা নিজেদের মাঝে হানাদার বাহিনী সম্পর্কে বিভিন্ন উদ্ভট ও ভীতিকর গল্প-গুজব করছিল।
কেউ বলল, ‘থিয়েভুমিরের মতো বাহাদুর জেনারেলও তাদেরকে দেখেই পালিয়ে এসেছে।
অন্য একজন বলল, ‘তারা সংখ্যায় মাত্র কয়েক হাজার, কিন্তু এক লাখ সৈন্যের জন্যও ভয়ঙ্কর।
আরেকজন বলল, ‘তাদের কোন তীরই ব্যর্থ হয় না। তারা বাতাসে তীর ছুঁড়ে মারে, আর তীর নিজেই কারো বুকে গিয়ে বিদ্ধ হয়।’
অন্যজন বলল, ‘তাদের একজন পদাতিক সৈন্য পাঁচ-ছয়জন অশ্বারোহীকে ধরাশায়ী করে হত্যা করে ফেলে।
অন্য আরেকজন বলল, ‘আরে ভাই, কী আর বলব, স্বয়ং থিয়োডুমিরও বাদশাহকে বলেছে, তারা মানুষ নয়; জিন-ভূত।
অপরজন বলল, ‘শুনা যায় তারা কিস্তিতে চড়ে আসেনি; বরং সাঁতার কেটে এত বিশাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এসেছে।
অন্যজন বলল, ‘আমি তো এমন শুনেছি যে, তারা সাঁতার কাটে না, বরং পানির উপর দিয়ে হেঁটে চলে; কিন্তু ডুবে না।’
এমন অনেক কথাই রডারিকের বাহিনীর মাঝে গুজব আকারে ছড়িয়ে পড়ল। একজন একটি কথা শুনে তার সাথে আরও দুই-তিনটি কথা যোগ করে অন্যের কাছে বর্ণনা করত। ফলে গোটা বাহিনীর মাঝে হানাদার বাহিনী সম্পর্কে ভয়-ভীতি বেড়েই চলছিল। তবে একটি কথা তাদের সকলের মনেই আশার আলো হয়ে জ্বলছিল। তাই তারা সকলেই বলাবলি করছিল, ‘হানাদার বাহিনী যতটাই নির্মম ও ভয়ঙ্কর, ততটাই দয়ালু ও সহানুভূতিশীল। তবে শুধু সেই ব্যক্তির জন্য যে তাদের সামনে অস্ত্র সমর্পণ করে তাদের বন্দীত্ব স্বীকার করে নেয়।’
ইহুদি ও গোথদের পরিকল্পনা অনুযায়ী ফৌজের মাঝে এ ধরনের ভীতি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল। আউপাসই এধরনের প্রপাগাণ্ডা চালানোর ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিল। যে দেড়শত সিপাহীকে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও নৈশযুদ্ধে পারদর্শী বলে ফৌজে শামিল করা হয়েছিল, তারা অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে সৈন্যদের মাঝে এসব ভয়-ভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
ইংরেজ ঐতিহাসিক আর্থ গ্রেম্যান স্বীয় গ্রন্থ ‘মুসলমানদের ইতিবৃত্তিতে লেখেন :
‘আন্দালুসিয়ার ফৌজের উপর এটা এক মানসিক আক্রমণ ছিল। তারিক বিন যিয়াদ এই আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি আউপাসকে বলেছিলেন, সে যেন আন্দালুসিয়ার ফৌজের মাঝে এমন কিছু লোক শামিল করে দেয়, যারা হবে অত্যন্ত চালাক-চতুর ও বাকপটু। তারা মুসলমানদের ব্যাপারে অন্দালুসিয়ার বাহিনীর মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করবে। আউপাস ইহুদি ও গোথ সরদারদের কাছে এ প্রস্তাব পেশ করলে তারা সে জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেয় এবং দেড়শত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গুপ্তচর রডারিকের ফৌজে শামিল হয়ে যায়।
