এক বৃদ্ধ ইহুদি বললেন, আমরা শুধু একটা বিষয়েই চিন্তা-ভাবনা করছি। আর তা হল, আজ আমরা রডারিকের নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে পশুর ন্যায় জীবন যাপন করছি। এখন আমরা রডারিকের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় হামলাকারীদেরকে সাহায্য করতে চাচ্ছি। কিন্তু তারা যখন বিজয়ী হবে তখন তারা রডারিকের মতোই আমাদের উপর জুলুম-নির্যাতন করবে। আমরা ইহুদিরা রডারিকের পরিবর্তে মুসলমানদের জুলুম-নির্যাতনের শিকারে পরিণত হব। আমাদের চিন্তা-ভাবনা করা উচিত যে, আমরা মুসলমানদেরকে এমনভাবে সাহায্য করব, যেন তারা রডারিককে পরাজিত করতে পারে। তার পর আমরা মুসলমানদের উপর এমন অতর্কিত আক্রমণ করব, যেন তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তারপর ইহুদি ও খোথরা যৌথভাবে আন্দালুসিয়া শাসন করবে।
মেরিনা দেখতে পেল, আউপাসের সকল পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে। তার মনে পড়ল, সে ঝিলের পাড়ে আউপাসকে নিজের ব্যাপারে বলেছিল,
‘আমি কারো স্ত্রী হতে পারিনি, হতে পারিনি কারো মা। আমি সাক্ষাৎ শয়তান হয়ে গেছি। আমার মাঝে শয়তানী স্বভাব-চরিত্র দানা বেঁধে উঠেছে।
এখন সে ভাবল, সেদিন সে ঠিকই বলেছিল। বৃদ্ধ ইহুদির কথা শুনার সাথে সাথে সে বুদ্ধি খাটিয়ে বলল,
‘মুসলিম বাহিনী এখানে বাদশাহী করবার জন্য আসেনি। আউপাস আমাকে বলেছে, তারা লুটতরাজ করার জন্য এসেছে। তাদের ঝুলি ভরে গেলে তারা ফিরে যাবে। এটা কীভাবে সম্ভব যে, আট-দশ হাজার সৈন্যের এক মামুলি বাহিনী এত বিশাল একটি রাজ্য জয় করার জন্য আসবে? আউপাস আমাকে বলেছে, সে এবং জুলিয়ান রডারিকের সিংহাসন ভূলণ্ঠিত করার জন্য তাদেরকে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে এসেছে। তারা মুসলমানদেরকে বলেছে, আন্দালুসিয়ার শাহী জানায় এত বিপুল পরিমাণ ধন-দৌলত, সোনা-দানা রয়েছে, যা বহন করার জন্য হাজারো উটের প্রয়োজন। আপনারা তাদের ব্যাপারে ভয় পাবেন না, তারা কোন মুলুকের সেনাবাহিনী নয়; বরং তারা দস্যুদল।’
‘তাহলে আমি বলব, তুমি মুসলমানদের ব্যাপারে অবহিত নও।’ বৃদ্ধ ইহুদি বলল। তারা যেখানেই যায়, সেখানেই স্বল্প সংখ্যক গিয়ে বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করে নিজেদের অধীনত করে ফেলে। তারা সংখ্যায় স্বল্প হওয়া সত্ত্বেও পারস্য ও রোমের মতো বিশাল সাম্রাজ্যকে খতম করে দিয়েছে। লক্ষ্য করে দেখ, ইসলামী সালতানাত কতটা বিস্তৃতি লাভ করেছে। এই মুসলিম বাহিনী লুণ্ঠনকারী নয়; তারা অমুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করাকে ধর্মীয় কর্তব্য মনে করে।
বৃদ্ধ ইহুদি মুসলমানদের বীরত্ব ও সাহসিকতার ইতিহাস বর্ণনা করে শুনাচ্ছিল, মেরিনা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
‘শ্রদ্ধেয় মেহমান! আমি নিশ্চিত, আপনি আরবের মুসলমানদের কথা বলছেন। আন্দালুসিয়ায় যারা এসেছে তারা বার্বার। যুদ্ধ-বিগ্রহ, আর লুটতরাজ করাই তাদের পেশা। তাদের সিপাহসালারও বার্বার। এরা যুদ্ধবাজ সম্প্রদায়। ছোট-বড় পোত্র, আর বিভিন্ন উপগোত্রে তারা বিভক্ত। তারা নিজেদের মুলুকে কোন ধরনের বাদশাহী কায়েম করে রেখেছে যে, আমাদের মুলুকে বাদশাহী কায়েম করবে?
মেরিনা বাকচাতুর্যের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য প্রমাণিত করে বৃদ্ধ ইহুদিদেরকে ষমতাবলম্বী বানিয়ে ফেলল।
***
দুই-তিন দিন পরের কথা। টলেডো এসে পৌঁছতে রডারিকের আরও তিন-চার দিন সময় লেগে যাবে। এই সুযোগে আটপাস এক সন্ন্যাসীর রূপ ধারণ করে টলেডো এসে মেরিনার সাথে সাক্ষাতের মওকা তৈরী করে নিল। মেরিনা তাকে গোথ বংশীয় সেই ব্যক্তির প্রাসাদে নিয়ে গেল। এখানকার নেতৃস্থানীয় গোথ ও ইহুদিদের সাথে কি ধরনের কথা-বার্তা হয়েছিল সে ব্যাপারেও মেরিনা আউপাসকে সবকিছু বলল। এ সময় একজন ইহুদি পণ্ডিত কি ধরনের যুক্তি পেশ করেছিল এবং মেরিনা তার যুক্তি খণ্ডন করে কীভাবে তাকে সমতাবলী বানিয়ে ফেলেছিল, সে কথাও সে আউপাসের কাছে বর্ণনা করল।
আটপাস যেদিন সেই প্রাসাদে এসে পৌঁছল সেদিন রাতেই গোথ ও ইহুদি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ সেখানে একত্রিত হল। মেরিনাও সেখানে ছিল। আউপাস যেহেতু গোথ বংশীয় ছিল, আর রডারিক গোথদের থেকে বাদশাহী ছিনিয়ে নিয়েছিল, তাই আইপাস সহজেই গোথ নেতাদেরকে নিজ মতের অনুসারী করে ফেলল। কিন্তু ইহুদি নেতৃবর্গ কেবল নিজ সম্প্রদায়ের ফায়দার কথাই বারবার বলতে লাগল।
আউপাস ইহুদি নেতাদেরকে সম্বোধন করে বলল, ‘এটা তো খুব বেশি দিন আগের কথা নয় যে, আপনারা তা ভুলে যাবেন। গোখরা তাদের রাজত্বকালে ইহুদিদেরকে যে সম্মান দান করেছিল এবং তাদের যে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছিল, তা আপনারা কীভাবে ভুলে গেলেন? এটা তো ভুলার কথা নয়। ইহুদিদেরকে গোথদের সমমর্যাদা দান করার কারণেই তো আমার ভাই অর্টিজাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আপনারা আমাদের সাথে থাকুন, কথা দিচ্ছি, ইহুদিরা আবার তাদের সেই মান-মর্যাদা ফিরে পাবে। বার্বাররা তো লুটতরাজ করে ধন-সম্পদ গুছিয়ে নিয়ে এখান থেকে চলে যাবে।
অবশেষে সেই রাতেই সকল পরিকল্পনা সম্পন্ন করা হল এবং পরদিন সকাল থেকেই পূর্ণ উদ্দমে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু হয়ে গেল। একজন গোথ জেনারেল রাজী হচ্ছিল না। সে রডারিকের অপেক্ষা করছিল। জেনারেল মূলত রডারিকের চাটুকার ছিল। মেরিনা তার উপর বিশেষ জাদু প্রয়োগ করল, সে তাকে উদ্ভিন্ন যৌবনের অধিকারিনী খুবসুরত এক মেয়ের প্রলোভন দেখাল। জেনারেল সাথে সাথে কাবু হয়ে গেল। সে মেয়েটিকে তার সাথে যুদ্ধে নিয়ে যেতে চাইল।
