মেরিনা যে প্রাসাদে আশ্রয় নিয়েছিল, সে প্রাসাদে এমন এক গোপন আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করেছিল, যা পরবর্তীতে ইউরোপের ইতিহাসই পাল্টে দিয়েছিল। আইপাস যেদিন ঝিলের পাড়ে মেরিনার সাথে সাক্ষাৎ করেছিল সেদিন থেকেই এ আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। আউলাস সেদিন মেরিনাকে বলেছিল,
‘রডারিকের বাদশাহী ধ্বংস করার এখনই সময়। ইহুদি ও গোথ সম্প্রদায়ের উচিত এ সুযোগকে কাজে লাগান। আর তার একমাত্র উপায় হল, ইহুদি ও গোথ সম্প্রদায়ের যেসকল সৈন্য রডারিকের বাহিনীতে রয়েছে, চূড়ান্ত লড়ায়ের সময় তারা মুসলমানদের সাথে মিলে রডারিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।
মেরিনা ছিল ইহুদি। এ কারণেই তার মস্তিষ্ক ছিল ষড়যন্ত্রের উর্বর ক্ষেত্র। অধিকন্তু তার অন্তরে রডারিকের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। সে আউপাসকে ভালোবাসত। আউপাসকে নিয়ে ঘর বাঁধার সুন্দর একটা স্বপ্ন ছিল তার। রডারিক তার সেই ভালোবাসাকে অপবিত্র করেছে, তার সেই স্বপ্নকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। সেদিন বিশ বছর পর আউপাস যখন তার সাথে সাক্ষাৎ করে তখন তার সেই পুরনো ক্ষত বের হয়ে আসে। সময়ের আবরণে চাঁপা পড়া প্রতিশোধের সেই আগুন লেলিহান অগ্নিশীখার রূপ ধারণ করে। সেদিন বিকেলে উপাসের কথা শুনে সে শপথ করে বলেছিল, রডারিকের বুকে খঞ্জর বিদ্ধ করার আগে আমার অশান্ত আত্মা কখনও শান্তি পাবে না।’
রডারিক সবেমাত্র পাম্পালুনা থেকে রওনা হয়েছে। রাস্তায় তার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলছে। মেরিনা সেদিন রাত থেকেই রডারিক থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের পরিকল্পনা শুরু করেছিল। তার কাছে অসংখ্য সুন্দরী মেয়ে ছিল। রূপ-লাবণ্যে কেউ কারো চেয়ে কম ছিল না। বাদশাহর খাছ মহল পর্যন্ত মেরিনার অবাধ যাতায়াত ছিল। শাহীমহলের রহস্যময় জগতে তার বিরাট প্রভাব ছিল।
শাহীমহলে দুই-চারজন গোথ সম্প্রদায়ের লোক বিশেষ সম্মান-মর্যাদা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী ছিল। দুই-একজন ইহুদিও এমন মর্যাদার অধিকারী হল। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আন্দালুসিয়ায় সবচেয়ে মজলুম সম্প্রদায় ছিল ইহুদি। তাদের অধিকাংশই ছিল গরীব। যে দুই-একজন ইহুদি শাহীমহলে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিল, তারা অত্যন্ত ধূর্ত আর চালাক ছিল। এসমস্ত লোকদের সাথে মেরিনার বিশেষ সম্পর্ক ছিল।
মেরিনা নিজেও ছিল ইহুদি। এজন্য তার অন্তরে ইহুদিদের জন্য সহমর্মিতা ছিল। কিন্তু সে ভাবল, এখনই তাদের সাথে রডারিকের বিপক্ষে কথা বলা ঠিক হবে না। তাই মেরিনা সবকিছু বিবেচনা করে গৌথ সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী এক ব্যক্তির প্রাসাদে গিয়ে আশ্রয় নিল। শাহীমহলে ও সেনাবাহিনীতে এই ব্যক্তির বিশেষ প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। এই ব্যক্তি অর্টিজাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত। সে এজন্য অত্যন্ত মর্মাহত ছিল যে, রডারিক অর্টিজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাকে হত্যা করেছে এবং নিজে বাদশাহ হয়ে গেছে। যার ফলে সোথ সম্প্রদায়ের বাদশাহী খতম হয়ে গেছে।
মেরিনা যে প্রাসাদে আশ্রয় নিয়েছিল সেখানে জিউস নামে এক ব্যক্তি ছিল। সে ছিল আউপাসের বাল্যবন্ধু। মেরিনা তার সাথে সাক্ষাৎ করে আউপাসের সাথে তার যে কথা হয়েছিল তা সবিস্তারে বর্ণনা করল। জিউস কোন প্রকার চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই মেরিনার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। সে মেরিনাকে তার বাবা ও ভাইদের সাথে সাক্ষাৎ করাল এবং আউপাসের পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদেরকে বলল।
জিউসের বাবা বলল, ‘উত্তম প্রস্তাব, কিন্তু এই প্রস্তাব যতটা উত্তম তার চেয়ে বেশি বিপদজনক। কারণ, কেউ বিশ্বাস করবে না যে, এত স্বল্প সংখ্যক হামলাকারী আন্দালুসিয়ার একলাখ ফৌজকে পরাজিত করতে পারবে। এটা অসম্ভব। ইহুদি ও গোথিরা যদি গাদ্দারী করেও তাহলে তাদের সংখ্যা কতইবা হবে। বেশির চেয়ে বেশি পনের-বিশ হাজারই হবে। এরা হামলাকারীদের সাথে মিলে কিইবা করতে পারবে? বিজয় রডারিকেরই হবে। তারপর জানই তো পরিণাম কি হবে? রডারিক একজন গাদ্দারকেও জীবিত রাখবে না। আর গোথ ও ইহুদিদের উপর যে নিপীড়ন চালান হবে, তা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।
‘আউপাসের ধারণা কিছুটা ভিন্ন। মেরিনা বলল। সে বলেছিল মুসলিম বাহিনী খুবই সাহসী ও বীরপুরুষ। তারা এতটাই যুদ্ধপটু যে, তাদের চেয়ে দ্বিগুণ সৈন্য ছিল থিয়োডুমিরের। কিন্তু খুবই কম সময়ের মধ্যে তারা থিয়োডুমিরের সেই বাহিনীকে পরাজিত করে। থিয়োডুমিরের প্রায় অর্ধেক সৈন্য রণাঙ্গনেই মারা পড়ে, আর অল্প কয়েকজন প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। অন্যরা মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। এখন আপনারা নিজেদের মাঝে সলা-পরামর্শ করে ঠিক করুন, আপনারা কোন পক্ষ অবলম্বন করবেন এবং আপনাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? আউপাস আবারও আসবে। আমি তাকে আপনাদের নিকট পৌঁছে দেব।’
‘তুমি ইহুদি নেতাদের সাথেও আলোচনা করে নাও।’ জিউসের বাবা বললেন।
***
মেরিনা দিন-রাত ইহুদি ধর্মগুরু ও নেতাদের সাথে আলোচনা ও মতবিনিময় করে কাটাতে লাগল। তার অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলে এক রাতে তিন-চারজন ইহুদি নেতা আলোচনার জন্য জিউসের প্রাসাদে এলো। সেখানে তিন-চারজন গোথ বংশীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও ছিলেন। তারা সকলেই এ ব্যাপারে মতবিনিময় করছিলেন। মেরিনা চুপ করে তাদের কথাবার্তা শুনছিল।
