‘এমন আশা করা কি ঠিক হবে যে, রডারিক জীবন নিয়ে আর ফিরে আসবে না।’ মেরিনা বলল। মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা তো খুবই কম।
‘ধরে নাও, রডারিক জীবিতই ফিরে আসবে।’ লোকটি বলল। “চিন্তিত হওয়ার কোন কারণ নেই। সে এক দিক দিয়ে ফিরে আসবে, আর তুমি অন্য দিক দিয়ে এখান থেকে বের হয়ে যাবে। তোমাকে নিরাপদে সিউটা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। দুআ কর, আউপাস যেন বেঁচে থাকে। সে যদি বেঁচে থাকে তাহলে অবশ্যই আমরা তোমাকে তার নিকট পৌঁছে দেব।’
***
আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিকের মানসিক অবস্থা ছিল বিপর্যস্ত। বাহ্যিকভাবে সে নিজেকে যতই সাহসী আর দৃঢ় মনোবলের অধিকারী বলে প্রকাশ করুক না কেন, ভিতরে ভিতরে সে একেবারে মুষড়ে পড়েছিল। তাই এক লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর উপরও তার কোন ভরসা হচ্ছিল না। সে জাদু মন্ত্রের আশ্রয় নেওয়াকেই অধিক নিরাপদ মনে করছিল। অপর দিকে মুসলিম বাহিনীর একমাত্র ভরসা, আর আশ্রয়স্থল ছিলেন আল্লাহ তাআলা।
তারিক বিন যিয়াদ মুসলিম বাহিনীকে পূর্বেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য আটগুনের চেয়েও বেশি সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী এগিয়ে আসছে। প্রত্যেক মুজাহিদকে অন্তত আটজনের সাথে লড়াই করতে হবে। প্রতি দিন ফজরের পর তারিক তার বাহিনীকে সেই স্বপ্নের কথা শুনাতেন, যে স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিজয়ের সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন। এছাড়াও তিনি পবিত্র কুরআনের সেসব আয়াত পাঠ করে শুনাতেন, যেসব আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনগণকে বিজয় ও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তারিক বিন যিয়াদ কখনও তাঁর বাহিনীকে এই আয়াত পাঠ করে শুনাতেন : ‘আল্লাহর নির্দেশে অনেক ছোট দল বড় দলকে পরাজিত করে থাকে’। (সূরা বাকারা : ২৪৯)
এই আয়াত তেলাওয়াত করে তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীর সৈন্যদেরকে এ কথা বুঝতেন যে, একটি ছোট বাহিনীর সদস্য ও তাদের আমীরের মাঝে কী ধরনের গুণাবলী, এবং কী পরিমাণ ঈমানী শক্তি থাকলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বড় দলের বিপক্ষে বিজয় দান করবেন।
তারিক বিন যিয়াদ এই আয়াতটিও বারবার তেলাওয়াত করে তার বাহিনীকে শুনাতেন : ‘স্মরণ কর সে সময়ের কথা, যখন আমি সমুদ্রকে দ্বিখণ্ডিত করলাম এবং তোমাদেরকে বাঁচিয়ে দিলাম, আর ফেরাউনের সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে মারলাম।’ (সূরা বাকারা : ৫০)
তিনি তাঁর বাহিনীকে লক্ষ্য করে বলতেন, এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে সম্বোধন করেছেন। হযরত মুসা আ. ফেরাউনের জাদুকরদের চ্যালেঞ্জের মুকাবেলায় এমন মুজেযা প্রদর্শন করেছিলেন যে, জাদুকরদের সকল ভেলকিবাজি মুহূর্তের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যায় এবং ফেরাউন হতভম্ব হয়ে পড়ে। এর পর বনী ইসরাঈল যখন মিসর হতে পালিয়ে যাচ্ছিল তখন তাদের সামনে নীলনদ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সামনে বিশাল-বিস্তৃত গভীর নদী, আর পিছনে ফেরাউন ও তার সৈন্যবাহিনী। এমন পরিস্থিতিতে মুসা আলাইহিসসালাম তর লাঠি দ্বারা নদীতে আঘাত হানলেন। সাথে সাথে নদীর পানি সরে গিয়ে রাস্তা বের হয়ে এলো। মুসা আ, তার বাহিনী নিয়ে সে রাস্তা দিয়ে নিশ্চিন্তে নদী পাড় হয়ে চলে গেলেন। কিন্তু সেই একই রাস্তায় ফেরাউন যখন তার বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হল, তখন নদীর উভয় তীরের পানি প্রচণ্ড বেগে এক সাথে মিলিত হয়ে গেল। ফলে ফেরাউন ও তার বাহিনীর সলীল-সমাধি ঘটল।
মুহাজিদ ভায়েরা! আল্লাহ্ তাআলা হযরত মূসা আ. কে চল্লিশ দিনের জন্য আহ্বান করেছিলেন তখন বনী ইসরাঈল তাঁর অনুপস্থিতিতে একটি গো-বাছুরকে তাদের উপাস্যরূপে গ্রহণ করে নিয়েছিল। পরিণতিতে তাদের উপর নেমে এসেছিল ভয়াবহ বিপর্যয়।
সুতরাং হে মুজাহিদ ভায়েরা! আজ আমরা যারা ইসলামের জন্য নিজের মাথাকে নাযরানাস্বরূপ পেশ করতে চাই, আমাদের উচিত–পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, আমরা সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলারই ইবাদত করব।’
এমনি আরও কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াত করে তিনি মুজাহিদদেরকে ঈমানের বলে বলিয়ান করে তুলছিলেন এবং তাদের মাঝে জিহাদের স্পৃহা, আর উদ্দীপনা বৃদ্ধি করছিলেন।
তারিক বিন যিয়াদ দিনের বেলা মুজাহিদদেরকে এমন স্থানে নিয়ে যেতেন যে স্থানটি তিনি যুদ্ধের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তিনি এমন এক রণাঙ্গনের ছক এঁকে নিয়েছিলেন, যেখানে শক্র-বাহিনীকে পূর্ণরূপে লণ্ডভণ্ড ও বিপর্যস্ত করে দেওয়ার মতো রণকৌশল প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল। তিনি পাহাড় ও ছোট ছোট টিলার মধ্যবর্তী এমন কিছু জায়গা নির্বাচন করে রাখলেন, যেখানে শত্রুবাহিনীর অগ্রবর্তী দলকে বোকা বানিয়ে শেষ করে দেওয়া একেবারেই সহজ। মোটকথা, তারিক বিন যিয়াদ তার বাহিনীকে একটি বিশেষ ধরনের রণকৌশল শিখাতে লাগলেন।
তারিক বিন যিয়াদের জন্য কোন অশুভ লক্ষণ ছিল না। কোন শুভ লক্ষণও ছিল না; বরং শুভ-অশুভ কোন ধরনের লক্ষণের সাথেই তার কোন পরিচয় ছিল না।
***
মেরিনা যে প্রাসাদে আশ্রয় নিয়েছিল, সেখানে ইতিপূর্বেও সে কয়েকবার এসেছিল। প্রতিবারই সে এমন বেশভূষা ধারণ করে এখানে আসত যে, কেউ যেন তাকে চিনতে না পারে। টলেডো শহরে এ ধরনের বেশকয়েকটি প্রাসাদ ছিল। এ সমস্ত প্রাসাদে রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় ও সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর লোকেরাই বসবাস করত। তাই এসব প্রাসাদের অভ্যন্তরে কী হতো–সে ব্যাপারে কারো কোন মাথা ব্যথা ছিল না।
