‘আমি জানি, তুমি একজন ইহুদি। জাদুকর বোসজন বলল। হয়তো তুমিও জান, আমি একজন ইহুদি। আমাকে তোমার সহযোগিতা করতে হবে। বাদশাহ রডারিকের বিজয়ের জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর একটা কাজ করতে হবে। আমার এসব কাজ দেখে তোমার ভয় পেলে চলবে না।’
‘কোন ইহুদির উচিৎ নয় রডারিকের বিজয়ের জন্য কিছু করা। মেরিনা বলল। ‘এই বিপুল সংখ্যক সৈন্যের মাধ্যমে তিনি অবশ্যই বিজয় লাভ করবেন।’
‘আমার কাজে নাক গলাতে এসো না। বেসিজান মেরিনাকে ধমকের সুরে বলল। বাদশাহ রডারিকের জন্য দুটি লক্ষণ খুবই অশুভ। সেই অশুভ লক্ষণের প্রভাব অবশ্যই বিদূরিত করতে হবে।’
‘শুনেছি, হানাদার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা মাত্র বার হাজার। মেরিনা হাসতে হাসতে বলল। বাদশাহ নামদারের এক লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনীতে শুধু অশ্বারোহীর সংখ্যাই তো বার-তের হাজার। বিজয় আমাদের বাদশাহরই হবে। সুতরাং আপনার এই কষ্ট স্বীকার করার কোন প্রয়োজন নেই। কোন রকম কষ্ট স্বীকার করা ছাড়াই আপনি পুরস্কার পেয়ে যাবেন।
‘আমি যা জানি তুমি তা জান না। বোসজান বলল। ‘আমার কথা শোন, ঐ মেয়েকে আমি বিশেষ পদ্ধতিতে হত্যা করব। সে যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে তখন তার বুক চিড়ে হৃদপিণ্ড বের করব। তারপর পেট ফেড়ে আরও দুটি অঙ্গ বের করব। এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে আমি জাদু প্রয়োগ করব। আমাকে তোমার সাহায্য করতে হবে। আমার কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথে তোমাকে এই লাশ গোম করে ফেলতে হবে। এই মহল থেকে লাশ গেম করা কোন কঠিন কাজ নয়। এখান থেকে প্রায়ই লাশ গোম করা হয়ে থাকে। কীভাবে লাশ গেম করতে হবে, আমি তোমাকে তা দেখিয়ে দিচ্ছি।
ভয়ে-আতঙ্কে মেরিনার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হল, অনেক কষ্টে সে নিজেকে সংবরণ করে রাখল।
‘যাও, মেয়েটিকে নিয়ে এসো।’ বোসজান বলল। ছলে-বলে-কৌশলে তাকে এখানে নিয়ে আসবে, সে যেন কিছুই বুঝতে না পারে।’
মেরিনা দ্বিতীয় কামরায় প্রবেশ করে দ্রুত এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল। একটি শক্ত মজবুত লাঠি তার দৃষ্টিগোচর হল। সে লাঠিটি উঠিয়ে তার আস্তিনের ভিতর লুকিয়ে রাখল।
‘এখন কি হবে?’ মেরিনাকে দেখতে পেয়ে মেয়েটি জিজ্ঞেস করল। আমাকে এই নোংরা বুড়োর কাছে রেখে চলে যাচ্ছ বুঝি?
‘ভয় পেয়ো না। মেরিনা বলল। অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ আমাদের করতে হবে। আমাকে সাহায্য কর। চল, এখন বুড়োর কামরায় যাই।
মেরিনা মেয়েটিকে নিয়ে বোসজানের কামরায় প্রবেশ করল।
‘এসো মা এসো।’ বোসজান মেয়েটির মাথায় হাত রেখে আদর করে বলল। ‘এই টেবিলের উপর বস। ভয় পাচ্ছ কেন? আমি তো তোমার বাবার মতো।
মেয়েটি ভয়ে মেরিনার দিকে ফিরে তাকাল। মেরিনা চোখের ইশারায় তাকে টেবিলের উপর বসতে বলল। জাদুকর বোসজান একেবারে মেয়েটির শরীরের সাথে ঘেসে দাঁড়াল। সে কোন কিছু শুকিয়ে বা সম্মোহনী শক্তির মাধ্যমে মেয়েটিকে হত্যা করতে উদ্যত হল। মেরিনা বোসজানের ঠিক পিছনে দাঁড়ানো ছিল। সে দ্রুত হাতে লাঠি বের করে সজোরে বৃদ্ধ বোসজানের মাথায় আঘাত করল। সে অনবরত আঘাত করেই চলল। বোসজান কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই বেহুশ হয়ে মাটিতে লুঠিয়ে পড়ল।
মেরিনা বোসজানকে চিক্করে শুইয়ে দিয়ে সজোরে তার বুকের উপর চেপে বসল। তারপর দু’হাত দিয়ে তার গলা চেপে ধরল। বোসজান কিছুক্ষণ ছটফট করে অসার হয়ে গেল।
মেরিনা দ্বিতীয় কামরায় একটা বড়সড় কাঠের বাক্স দেখেছিল। মেরিনা আর ঐ মেয়েটি ধরাধরি করে বোসজানের লাশ ঐ কামরায় নিয়ে গেল। মেরিনা সেই বাক্স খোলে বোসজানের লাশ বাক্সে রেখে ঢাকনা বন্ধ করে দিল।
‘এখন দেখব, ওর বাদশাহ বিজয় লাভ করে কীভাবে ফিরে আসে?’ মেরিনা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল। চল, মেয়ে! জলদি এখান থেকে বের হয়ে পড়।
‘আমার ভয় করছে। মেয়েটি বলল। এসব কি হচ্ছিল?
‘এই বুড়ো না মরলে এতক্ষণে এখানে তোমার লাশ পড়ে থাকত। মেরিনা বলল। ভয় পেয়ো না, সকালে তোমাকে আমি এখান থেকে বের করে নিয়ে যাব। ভুলেও কারো সাথে এ ব্যাপারে কোন আলোচনা করো না।’
ভোর হওয়ার সাথে সাথে উভয়ে জাদুকর বোসজানের বাড়ি থেকে বের হয়ে এলো। মেরিনা অতি সংগোপনে মেয়েটিকে তার বাড়ি পৌঁছে দিল। তারপর উদ্দেশ্যহীনভাবে চলতে লাগল। কিছুক্ষণ চলার পর তার মনে হল, সে নিজের জন্য অনেক বড় বিপদ ডেকে এনেছে। তার সমস্ত শরীর ভয়ে কাঁপতে লাগল। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। সে চিন্তা করতে লাগল, রডারিক যদি বিজয়ী হয়ে ফিরে আসে তাহলে নিশ্চয় সে ভাববে, বোসজান অশুভ লক্ষণ দূর করার পর হয়তো কারো হাতে নিহত হয়েছে। আর যদি পরাজিত হয়ে ফিরে আসে তাহলে নিশ্চয় আগুন লাগিয়ে দেবে। সে আলবত ধরে নিবে, জাদুকর বোসজানের মৃত্যুর পিছনে আমার হাত রয়েছে।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে মেরিনা সিদ্ধান্ত নিল যে, যত দ্রুত সম্ভব তাকে এই এলাকা ছেড়ে পালাতে হবে। এই এলাকার এক আমীর ব্যক্তির সাথে মেরিনার সম্পর্ক ছিল। সে ব্যক্তি ছিল গোথ বংশীয়। মেরিনা তার নিকট গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করার পর বলল,
‘আমি জাদুকর বোসজানকে হত্যা করে এসেছি।’
‘তুমি অতি উত্তম কাজ করেছ।’ গোথ বংশীয় সেই ব্যক্তি বলল। তুমি একটি নিষ্পাপ মেয়ের জীবন বাঁচিয়েছ। এখন কী হয়–আমরা তা দেখব।’
