‘একুশ বছরের চেয়ে কম হতে হবে। বোসজান বলল। আমার নিজের কোন প্রয়োজনে আমি এই মেয়েকে চাচ্ছি না। এই মেয়েকে জীবিত রাখা হবে না। আজকের রাতই হবে তার জিন্দেগির শেষ রাত। আমি তার বুক ফেড়ে হৃদপিণ্ড ও আরো কিছু জিনিস বের করব। তার পর সারা রাত তার উপর জাদু প্রয়োগ করব।’
রডারিক তৎক্ষণাৎ মেরিনাকে ডেকে পাঠাল। মেরিনা আসতেই রডারিক তাকে জিজ্ঞেস করল,
‘তুমি না একটি মেয়ের কথা বলেছিলে? তুমি বলেছিলে, তার বয়স খুবই কম। সে অর্ধপ্রস্ফুটিত এক কলি। তার বয়স কত হবে?
‘ষোল-সতের বছর হবে, শাহানশা’ মেরিনা বলল।
‘ঐ মেয়েকে আজ রাতে এই জাদুকরের নিকট পৌঁছে দেবে।’ রডারিক বলল।
‘আমার প্রতি শাহানশার নির্দেশ ছিল, আমি যেন শাহানশার সফরসঙ্গী হই।’ মেরিনা বলল।
‘আমার সাথে আসার কোন প্রয়োজন নেই। রডারিক বলল। বোসজান যেখানে বলবে, আজ রাতেই তুমি সেই মেয়েকে সাথে নিয়ে সেখানে পৌঁছে যাবে।
রডারিক বোসজানের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই হল মেরিনা। একে তুমি সাথে করে নিয়ে যাও এবং ভালোভাবে বুঝিয়ে বল, তাকে কী করতে হবে।
রডারিকের কথা শেষ হতেই জাদুকর চলতে শুরু করল। মেরিনাও তার অনুসরণ করল।
***
রাতের প্রথম অংশ অতিবাহিত হয়েছে অনেকক্ষণ হয়। মেরিনা অত্যন্ত রূপসী একটি মেয়েকে সাথে নিয়ে বৃদ্ধ ইহুদি জাদুকর বোসজানের কামরায় প্রবেশ করল। রডারিকের নির্দেশে মেরিনা যখন বৃদ্ধ জাদুকরের সাথে মহলে ফিরে এলো তখন সে জাদুকরকে বলল, শাহানশা আপনাকে অনেক বড় ও সুন্দর একটি উপহার দিয়েছেন। এই মেয়েকে আমি শাহানশার জন্য উপঢৌকনরূপে এনেছিলাম। কথাছিল সে শাহানশার সাথে যাবে।
‘তুমি কি কখনও আমার কামরায় কোন মেয়েকে আসতে দেখেছ?’ বৃদ্ধ জাদুকর বলল। এই বয়সে যুবতী মেয়েদেরকে দিয়ে আমি কি করব? এই মেয়েকে অন্য একটি উদ্দেশ্যে এখানে আনা হয়েছে। রাতে এ ব্যাপারে তোমাকে সবকিছু বলব। তুমি এ কাউকে কিছু বলতে পারবে না। যদি কাউকে কিছু বল তাহলে মৃত্যুই হবে তোমার শেষ পরিণতি। আশা করি, বেঘোরে মারা পড়াটা তুমি কিছুতেই পছন্দ করবে না।’
কিছুক্ষণ পর মেরিনা ঐ মেয়েকে সাথে নিয়ে বৃদ্ধ জাদুকরের ঘরে প্রবেশ করল। মেয়েটি বৃদ্ধের ঘরে প্রবেশ করতেই ভয়ে সড়জড় হয়ে গেল। সে মেরিনার আঁচল আকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। বৃদ্ধের ঘরে একটি টেবিলের উপর তিনজন মৃত মানুষের মাথার খুলি রাখা আছে। ঘরের এক দিকের দেওয়ালে মানুষের একটি কঙ্কাল ঝুলছে।
বৃদ্ধ জাদুকর একটি লাকড়ীর বাক্সের ঢাকনা খুললে সেখান থেকে দুটি কালো সাপ মাথা উঁচিয়ে ফনা তুলে ফুসফুস করতে লাগল। এ দৃশ্য দেখে মেয়েটি চিৎকার করে উঠল। বোসজান সাপের বাক্সে কি যেন নিক্ষেপ করে সাথে সাথে ঢাকনা বন্ধ করে দিল।
কামরা এমন দুর্গন্ধময় যে, মনে হচ্ছে এখানে কোন পচা-গলা লাশ আছে। কিন্তু এখানে কোন লাশ নেই; বরং পঁচা গলা লতাগুল্ম, আর রাসায়নিক পদার্থের সংমিশ্রণে এমন একটা দুর্গন্ধ পুরো কামরার মাঝে ছড়িয়ে আছে যে, নাড়িভূঁড়ি বের হয়ে আসার উপক্রম হচ্ছে।
বোসজান সেই কামরায় বিভিন্ন পদার্থ জ্বালিয়ে রেখেছিল। কামরার মাঝে এমন একটা পরিবেশ বিরাজ করছে ছিল যে, ভয়ে গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে। ছোট-বড় অসংখ্য পুঁটলি, আর বিভিন্ন আকৃতির বাক্স বিছানার উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
এই সেই বোসজান, যাকে গৌরবর্ণের চেহারা, দীর্ঘ সফেদ দাড়ি, আর পরিচ্ছন্ন লম্বা জুব্বার কারণে অত্যন্ত সম্মানী, বিজ্ঞ, আর আত্মমর্যাদাশীল মনে হত। এই পুঁথিগন্ধময় কামরায় সেই তাকেই অত্যন্ত রহস্যময় ও ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে।
বোসজান পার্শ্ববর্তী আরেকটি কামরার দরজা খুলে মেরিনাকে বলল, এই মেয়েকে এখানে বসিয়ে রেখে তুমি আমার কাছে চলে এসো।’
মেরিনা মেয়েটিকে নিয়ে সেই কামরায় প্রবেশ করল। এই কামরাটি অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কামরার এক দিকে খুব সুন্দর একটি পালঙ্ক রাখা। পালকের উপর পরিচ্ছন্ন বালিশ, আর সুন্দর পালঙ্কপোশ বিছানো আছে। মেঝেতে মহামূল্যবান গালিচা বিছানো। ছাদের সাথে ঝুলন্ত ফানুসের আলোয় গোটা কামরা ঝলমল করছে। পূর্বের কামরায় পাওয়া গন্ধের মতো তীব্র একটা গন্ধ এই কামরায়ও অনুভব হচ্ছে।
‘কোথায় নিয়ে এসেছ আমাকে?’ মেয়েটি মেরিনাকে জিজ্ঞেস করল। ‘বাদশাহ রডারিক কি এই ব্যক্তি? এতো সেনাবাহিনীর সেই জেনারেলও নয়, যার জন্য তুমি আমাকে নিয়ে এসেছিলে। সেই জেনারেল তো তার বাহিনীর সাথে সামনে অগ্রসর হয়ে গেছে।’
‘বাদশাহর নির্দেশে সমস্ত পরিকল্পনা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।’ মেরিনা বলল। ‘তোমাকে যে কাজের জন্য আমি এনেছিলাম, তা ব্যর্থ হয়ে গেছে। কথা ছিল আমিও বাদশাহর সাথে যাব, কিন্তু আমাকে এখানে থাকতে বলা হয়েছে।’
‘কিন্তু কেন? মেয়েটি বলল। আমি দুর্গন্ধযুক্ত এই কামরায় ঐ বৃদ্ধের সাথে কিছুতেই থাকতে পারব না। তুমি আমার বাবাকে যে টাকা দিয়েছ তা ফিরিয়ে নিয়ো, আমি চললাম।’
‘জলদি এসো, মেরিনা! পাশের কামরা থেকে বোসজান বলল। মেয়েটিকে ওখানেই থাকতে দাও।
‘ভয় পেয়ো না।’ মেরিনা মেয়েটির কানে কানে বলল। আমি তোমাকে এখান থেকে বের করার চেষ্টা করব।’
এ কথা বলে মেরিনা পাশের কামরায় চলে গেল।
***
