‘বোসজান, তুমি কি দেখতে পেয়েছ, ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কী ধরনের বিপদ অপেক্ষা করছে?
‘বাদশাহ নামদার! জাদুকর বোসজান বলল। ভবিষ্যতের অবস্থা আমার কাছে অস্পষ্ট ও মেঘাচ্ছন্ন মনে হচ্ছে। যা দেখতে পাই তা কখনও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, আবার কখনও সামান্য স্পষ্ট হয়।
‘তুমি কী দেখতে পাও।’ রডারিক বলল।
‘দুর্গের মাঝে আপনি যে দৃশ্য দেখেছিলেন, আমি অনেকটা সে রকমই দেখতে পাই।’ জাদুকর বোসজান বলল।
‘দুর্গের যে ঘটনা আমি তোমার কাছে বর্ণনা করেছি, তা কি তোমার পূর্ণরূপে মনে আছে?’ রডারিক বলল।
‘মহামান্য শাহানশা, আপনি যা বলেছেন, তা আমার পূর্ণরূপে মনে আছে। জাদুকর বলল। আপনার এই গোলামের স্মৃতিশক্তি অতল সমুদ্রের ন্যায়।’
‘তোমাকে যা জিজ্ঞেস করছি শুধু তার উত্তর দাও। রডারিক শাহী গাম্ভির্যের সাথে বলল। ফালতু কথা শুনার সময় আমার নেই। দুর্গের যে ঘটনা আমি তোমাকে নিয়ে ছিলাম তা যদি তোমার স্মরণ থেকে থাকে তাহলে বল, তা বাস্তব রূপ নিবে না তো?
‘এক লাখ ফৌজের সামনে কোন বাস্তবতাই টিকতে পারে না। জাদুকর বলল। এই বিশাল বাহিনীর তুলনা শুধু সামুদ্রিক ঝড়ের সাথেই হতে পারে, বালির বাঁধ যাকে আটকে রাখতে পারে না।
‘আরেকটি কথা, অল্পবয়স্কা একটি মেয়েকে আমি প্রায়ই স্বপ্নে দেখি।’ রডারিক বলল।
‘শাহানশা! তাকে কি অবস্থায় দেখতে পান?’ জাদুকর বলল।
‘মস্তকহীন অবস্থায় সে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। রডারিক বলল। ‘ক্ষাণিক পরেই দেখা যায়, তার শরীরে মাথা আছে। সে মিট মিট করে হাসছে, আর আমাকে দেখছে। আমি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। কিছুক্ষণপর মেয়েটির মুখের কথা শুনতে পায়, সে ঘৃণাভরে আমাকে বলে, “তোর রাজত্বের উপরও ঘোড়া দৌড়ানো হবে। তোর নাম-নিশানাও থাকবে না।” কথা বলার সময় মেয়েটির ঠোঁট নড়ে না, কিন্তু আওয়াজ শুনা যায়।
‘শাহানশা কি ঐ মেয়েটিকে চিনেন? এমন কোন মেয়ে কি আপনার সান্নিধ্যে এসেছে?’ জাদুকর জিজ্ঞেস করল।
‘হা, পাম্পালুনায় এমন একটি মেয়ে আমার সান্নিধ্যে এসেছিল। রডারিক বলল। সে বিদ্রোহী সরদারের মেয়ে। তার বয়স ছিল খুবই কম। আমি তাকে আমার কাছে রেখেছিলাম। তারপর এক গোস্তাখির কারণে তলোয়ারের এক আঘাতে ধড় থেকে তার মাথাটা আলদা করে ফেলি।
রডারিক পালুনার বিদ্রোহী সরদারের মেয়ে উস্তোরিয়া সম্পর্কে পূর্ণ ঘটনা বলার পর বলল,
‘এটা কি কোন খারাপ লক্ষণ? তাছাড়া আমার মতো অকুতোভয় ব্যক্তিও ঐ এতটুকুন মেয়েকে স্বপ্নে দেখে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি।
‘শাহানশা! লক্ষণ ভাল নয়।’ জাদুকর বলল। ছোট বাচ্চাদের বন্দুআ তাড়াতাড়ি কবুল হয়ে থাকে। যিনি সবাইকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি সবার সাথে ইনসাফ করেন।’
‘আমি জানি, তোমার হাতে এমন ক্ষমতা আছে, যার মাধ্যমে তুমি কুলক্ষণের প্রভাব নষ্ট করতে পার।’ রডারিক বলল। এটা সেই জাদুর প্রভাব, যার উদ্ভাবক হল ইহুদি সম্প্রদায়। আর তুমি সাধারণ কোন ইহুদি নও, বরং তুমি ইহুদিদের ধর্মগুরু এবং একজন বিখ্যাত জাদুকরও বটে। আমি তোমাকে শাহীমহলে যে মর্যাদা দান করেছি, তার উপযুক্ত কোন ইহুদিকে আমি মনে করি না। কেবল তুমিই হলে একমাত্র ইহুদি, যাকে আমি এত সম্মান দান করেছি।’
‘মহামান্যের এই অধম গোলাম কি এ সম্মান পাওয়ার উপযুক্ত নয়? এতটুকু ইজ্জত কি তার প্রাপ্য নয়?’ জাদুকর বলল।
‘নিশ্চয়!’ রডারিক বলল। আমি তোমাকে এর চেয়েও বড় পুরস্কার দেব। তুমি এখনই এমন কোন তদবির কর, যেন ঐ মেয়ে স্বপ্নে আমার কাছে না আসে, আর আমার অন্তর হতে যেন তার ভয় বিদূরিত হয়ে যায়। এমন যেন না হয় যে, আমি হানাদার বাহিনীর মোকাবেলায় গেলে আমার অন্তরে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে।
এক পোর্তগিজ ঐতিহাসিক ডিলোমেগো লেখেন, রডারিক অত্যন্ত সাহসী বাদশাহ ছিল। যুদ্ধের ময়দানে সে ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী যোদ্ধা। কিন্তু ঐ কিশোরীকে হত্যা করার পর থেকে তার মাঝে ভয় বাসা বাঁধে।
বোসজান জাদুবিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিল। সে গণনা করে ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারত। আর এ কারণেই রডারিক তাকে শাহীমহলে জায়গা দিয়েছিল।
রডারিক বোসজানকে বলল, ‘স্বপ্নে দেখা ঐ মেয়েটির ব্যাপারে আমাকে নির্ভয় করে দাও এবং তোমার জাদুর প্রভাবে ঐ অশুভ লক্ষণকে শুভ করে দাও।
জাদুকর বোসজান রডারিকের মাথা থেকে মুকুট নামিয়ে নিজের কোলে রাখল। তারপর রডারিকের মাথা নিজের হাতের মাধ্যে নিয়ে তার চেহারাটা সামান্য উঁচু করে ধরলো। বোসজান রডারিকের চোখে চোখ রেখে তার দুই হাতের মধ্যমা আঙ্গুলে পরিহিত এক বিশেষ ধরনের আংটি দিয়ে রডারিকের কপালে ঘষতে লাগল। অল্প কিছুক্ষণ এমনটি করে সে তার হাত সরিয়ে নিল। রডারিক তার মাথা ডানে-বায়ে ঘুরিয়ে বলল,
‘আমার কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে।
‘আমি জানি, শাহানশা! বোসজান বলল। এখন ঐ মেয়ে আর শাহানশাকে স্বপ্নে বিরক্ত করবে না। ঐ মেয়ের কোন চিন্তাই শাহানশাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে পারবে না।’
‘আর সেই অশুভ লক্ষণের কি হবে?’ রডারিক বলল। “তুমি না বললে, লক্ষণ শুভ নয়–এর কি বিহিত করবে?
‘শাহানশা কি আমাকে একটি আনকোরা কুমারী মেয়ে দিতে পারবেন? বোসজান বলল।
‘একটি কেন? একশটির কথা বল।’ রডারিক বলল। কোন বয়সের মেয়ে চাই তোমার?
