‘বিজিত এলাকার লোকদের সাথে মানবোচিত আচরণ করার নির্দেশ, আমার মনগড়া কোন নির্দেশ নয়। তারিক বিন যিয়াদ বললেন। এই নির্দেশ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ।
***
আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিক একলাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে ঝড়ের গতীতে এগিয়ে আসছিল। রডারিক রাজধানী টলেডোতে অবস্থান না করে সামনে এগিয়ে চলছিল। সে পূর্বেই পয়গাম পাঠিয়ে ছিল যে, সে টলেডোর শাহীমহলে অবস্থান করবে না। শহরের বাহিরে সামান্য সময়ের জন্য যাত্রা বিরতি করবে। সে টলেডোর উপকণ্ঠে এসে পৌঁছার পূর্বেই সেখানে সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা, পারিষদবর্গ ও খোশামদীদের এক বিরাট অংশ তর আগমনের অপেক্ষা করছিল। তাদের মাঝে পরাজিত জেনারেল থিয়োডুমিরও উপস্থিত ছিল। এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে রডারিক সেখানে এসে উপস্থিত হল। থিয়োডুমির আগত লোকদের সম্মুখভাগে দাঁড়ানো ছিল। তার প্রতি দৃষ্টি পড়তেই র.রিক বলে উঠল,
‘তুমি কি নিজেকে এর উপযুক্ত মনে কর যে, আমি তোমার চেহারা দেখব? নিজ বাহিনীর চেয়েও অর্ধেক সংখ্যক বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়ে আমাকে এখন স্বাগত জানাতে এসেছ? ধিক তোমাকে।
‘সম্মানিত শাহানশা, যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতি একা লড়াই করে না। থিয়োডুমির রডারিকের গোসা বরদাশত করে বলল। আমি আমার বাহিনীর পূর্বে যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে আসিনি। আমার কসুর শুধু এতটুকুই যে, আমি সেখানে বেঘোরে মরার জন্য বা যুদ্ধবন্দী হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকিনি।
রডারিক আরও বেশি রাগান্বিত হয়ে তাকে খুব তিরস্কার করল। থিয়োডুমিরও কোন সাধারণ জেনারেল ছিল না। রডারিক নিজেও তার শক্তি-সাহস, অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করত। থিয়োভুমিরও রডারিকের দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত ছিল। সে আহত সিংহের ন্যায় গর্জে উঠে বলল,
‘আন্দালুসিয়ার মহামান্য শাহানশা। আপনি শাহীমহলে গিয়ে আরাম করুন, আর এই এক লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনীর দায়িত্বভার আমার হাতে ন্যস্ত করুন। আমি এই হানাদার বাহিনীকে একদিনে পদপিষ্ট করে সমুদ্রতীর পর্যন্ত পৌঁছে যাব, তারপর হানাদার বাহিনী যে রাজ্য থেকে এসেছে সেই রাজ্যে আপনার বিজয়ঝাণ্ডা উড্ডীন করে তবে ক্ষান্ত হব। আমাকে তিরস্কার করার পূর্বে মহামান্য শাহানশা সে সংখ্যক সৈন্য নিয়ে যান, যে সংখ্যক সৈন্য আমার সাথে ছিল। আমার সাথে ছিল মাত্র পনের হাজার সৈন্যের এক ক্ষুদ্র বাহিনী। এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে তো যে কোন অযোগ্য ও কাপুরুষ জেনারেল বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হবে।
কোন এক গোপন রহস্যের কারণে রডারিক থিয়োড়মিরের প্রতি কিছুটা দুর্বল ছিল। অন্যথায় রডারিকের মতো জালিম ও নিষ্ঠুর বাদশাহ থিয়োডুমিরকে এই গোস্তাখির জন্য অত্যন্ত কঠোর শান্তি প্রদান করত। কিন্তু সে থিয়োড়মিরের কথার কোন উত্তর না দিয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
রডারিকের দৃষ্টি মেরিনার উপর এসে স্থির হল। মেরিনা শাহীমহলের ভিতর রডারিকের মনোরঞ্জনের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল। রডারিক মেরিনার প্রতি দৃষ্টিপাত করার সাথে সাথে মেরিনা সসম্মানে তাকে কুর্নিশ করে নিবেদন করল, ‘আমার প্রতি আঁহাপনার কি কোন নির্দেশ আছে?
‘তোমার জন্য কি নির্দেশ-তুমি কি তা জান না? তোমার পুস্পকাননে নতুন কোন ফুলের আগমন ঘটেছে কি?
‘জী, জাহাপনা, মেরিনা বলল। অর্ধপ্রস্ফুটিত অপরূপ রূপসী এক গোলাপের আগমন ঘটেছে। জাহাপনা আমিও কি আপনার সাথে আসব?
‘ঐ গোলাপকে সাথে নিয়ে তুমিও চলে এসো।’ রডারিক বলল। সে ছাড়া আরও কোন গোলাপ থাকলে তাদেরকেও নিয়ে এসো। মেয়েদের ঘোড়াগাড়ি পিছনে রয়েছে।’
মেরিনা রডারিকের প্রতি গভীরভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর সম্মান প্রদর্শন করে সেখান থেকে চলে গেল।
রডারিকের আগমনের পূর্বেই সেখানে তাঁবু স্থাপন করা হয়েছিল। তাঁবুর উপর মহামূল্যবান শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। তাঁবুর ভিতর মখমলের গালিচা বিছিয়ে তার উপর ময়ূর সিংহাসনের ন্যায় শাহীকুরসী রাখা হয়েছে। এই তাঁবুকেই রডারিকের দরবার কক্ষ হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। রডারিক ঘোড়া থেকে নেমে জাঁকজমকপূর্ণ সেই দরবারকক্ষে উপস্থিত হল। দরবারকক্ষে প্রবেশ করার সময় রডারিক তার সাথে আগত এক ব্যক্তির কানে কানে কি যেন বলল।
‘সে এখানেই উপস্থিত আছে, জাহাপনা!’
ঐ ব্যক্তি রডারিকের কথার উত্তর দিয়ে পিছনে আগত লোকদের মধ্য থেকে এক লোকের নিকট চলে এসে তাকে বলল, ‘বাদশাহ নামদার আপনাকে ডাকছেন।
রডারিক এই ব্যক্তি সম্পর্কেই জানতে চাচ্ছিল। এই ব্যক্তি হল, একজন নামকরা জাদুকর। তার বিশেষ ধরনের পোশাক, আর বার্ধক্যপীড়িত গৌরবর্ণের চেহারার মাঝে এক ধরনের সম্মোহনী শক্তি ছিল। তার বয়স সত্তরের উপরে হবে বলেই মনে হচ্ছে। মুখভরা দীর্ঘ সফেদ দাড়ি, আর কাঁধ থেকে টাখনু পর্যন্ত ঝুলানো লম্বা জুব্বার মাঝে তাকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে।
তার মাথায় আছে গোল টুপি, আর গলায় সবুজ রঙের মোটা মোতির মালা। ডান হাতে ছোট ছোট মোতি দিয়ে বানানো তছবিহ, আর বাম হাতে গাড় বাদামী রঙের আঁকাবাঁকা লাঠি। কাঁধ পর্যন্ত লম্বা সেই লাঠির উপরের অংশে সাপের ফনাতুলা মাথার আকৃতি। তার কমর লাল রঙের কাপড়ের বেল্ট দিয়ে বাঁধা। কিন্তু রডারিক তাকে দেখে কোন রকম প্রভাবিত হল না এবং তাকে কুরসীতেও বসতে বলল না; বরং দাঁড় করিয়ে রেখেই জিজ্ঞেস করল,
