তারিক বিন যিয়াদের দ্বিতীয় নির্দেশ ছিল, ‘সকল সৈন্য যেন অস্ত্র সমর্পণ করে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি এই নির্দেশও জারি করেন যে, ‘নগরবাসীদেরকে এই মর্মে সতর্ক করা হচ্ছে, তারা যেন কোন সিপাহীকে তাদের ঘরে আত্মগোপন করার সুযোগ না দেয়। কেউ যদি এই ভুল করে তাহলে তার ঘরের সকল সদস্যকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে গ্রেফতার করা হবে, আর যাবতীয় সহায়-সম্পদকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বিবেচনা করা হবে।’
এমনিভাবে কার্টিজার মজবুত দুর্গ খুব অনায়াসে মুসলিম বাহিনীর করতলগত হল। সকল যুদ্ধবন্দীকে কার্টিজার দুর্গেই বন্দী করে রাখা হল।
***
কার্টিজার দুর্গ মুসলিম বাহিনীর করতলগত হওয়ার কারণে আশপাশের বিশাল-বিস্তৃত উপত্যকা তারিক বিন যিয়াদের দখলে এসে গেল। এই উপত্যকার নাম রাখা হল, লাকা। সবুজ-শ্যামল দৃষ্টিনন্দন এই উপত্যকার সীমানা কয়েক মাইল দূরবর্তী এক নদীর সাথে গিয়ে মিশেছে। নদীর নাম গোয়াডিলেট।
তারিক বিন যিয়াদ দুর্গে অবস্থান না করে নদীর তীরে তবু স্থাপনের নির্দেশ দিলেন। সেই সাথে মুসলিম বাহিনীকে সদা সতর্ক ও চৌকস থাকতেও বললেন।
বিজিত দুর্গ থেকে এতো বিপুল পরিমাণ ঢাল-তলোয়ার, আর তীর-বর্শা হস্তগত হল যে, সেগুলো অনেক বড় ও দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধের জন্য যথেষ্ট ছিল। সবচেয়ে মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ছিল দুই হাজার ঘোড়া। তারিক বিন যিয়াদ এ সকল ঘোড়া এমন সব বাহাদুর সিপাহীদের মাঝে বণ্টন করে দেন, যারা প্রকৃত শাহসওয়ার ও যুদ্ধবাজ ছিল। তাদের প্রত্যেককে তারিক বিন যিয়াদ কমান্ডো যুদ্ধের বিশেষ প্রশীক্ষণও প্রদান করেন।
তারিক বিন যিয়াদ প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগাচ্ছিলেন। তিনি চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য নিজ বাহিনীকে সর্বদা প্রস্তুত রাখতেন। তাঁর হাতে ছিল মাত্র বার হাজার সদস্যের এক সাধারণ বাহিনী। এই বাহিনীর মাধ্যমেই তাঁকে এক লাখ সদস্যের এক বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয়মাল্য ছিনিয়ে আনতে হবে। ইতিপূর্বের দুটি যুদ্ধে তিনি ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছেন যে, আন্দালুসিয়ার বাহিনীর নিকট যে অস্ত্র-সস্ত্র আছে, তা অত্যন্ত উন্নত। তাদের প্রত্যেকের দেহে আছে লৌহবর্ম, আর মাথায় শিরস্ত্রাণ। এক লাখ সৈন্যের সংখ্যাটা এতো বেশি যে, মাত্র বার হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনীকে পদপিষ্ট করে মেরে ফেলা তাদের জন্য একেবারেই সহজ। এই বিশাল বাহিনীকে একমাত্র রণকৌশলের মাধ্যমেই পরাজিত করা সম্ভব। তারিক বিন যিয়াদের একমাত্র চিন্তা ছিল, তিনি কী এই বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হবেন?
‘ইবনে যিয়াদ!’ তারিক বিন যিয়াদের চেহারায় দুশ্চিন্তার চিহ্ন দেখে জুলিয়ান একদিন তাঁকে বললেন। আপনার রাসূল তো আপনাকে বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েই দিয়েছেন। তারপরও আন্দালুসিয়ার অধিবাসীদের থেকে যে দুআ আপনি পাচ্ছেন, তাও আল্লাহর আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। আশা করি, এ কথা আপনি বলবেন না যে, যারা মুসলমান নয়; আল্লাহ তাদের প্রার্থনা কবুল করেন না। আল্লাহ অবশ্যই তার নির্যাতিত বান্দার আহাজারি শুনেন; তাদের দুআ কবুল করেন।
আপনি যুদ্ধবন্দীদের সাথে উত্তম আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যুদ্ধবন্দীদের চেয়েও শহরবাসীদের সাথে আরও বেশি উত্তম আচররণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনি বলেছেন, মুসলিম বাহিনীকে এই আস্থা অর্জন করতে হবে যে, তারা শহরবাসীদের ইজ্জত-আবরুর রক্ষক; তক্ষক নয়। মানুষ হিসেবে সব ধরনের অধিকার তারা প্রাপ্ত হবে। তারা যা উপার্জন করবে, তা তাদের নিজস্ব সম্পদ বলে বিবেচিত হবে। তবে সামর্থ অনুযায়ী সকলকে নিরাপত্তাকর আদায় করতে হবে।
আপনি তো জানেন, রডারিকের রাজত্বে সাধারণ মানুষকে কীট-পতঙ্গের মতো মনে করা হয়। এখানে সেই ব্যক্তিই কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, যার কোন সরকারী পদ বা পদবী আছে। কিংবা আছে বিশাল ভিত্ত-বৈভব। যার রূপসী কন্যা-সন্তান আছে সে তার কন্যা-সন্তানকে এই ভয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয় যে, বাদশাহ বা কোন সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা যদি তার কন্যার রূপ-লাবণ্য সম্পর্কে জানতে পারে তাহলে তার কন্যার সতীত্ব রক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। সামিরিক বাহিনীর লোকেরা সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে গিয়ে বেগার খাটতে বাধ্য করে।
ইবনে যিয়াদ! এই কার্টিজা ও তার আশপাশের যে সকল এলাকা আপনার করতলগত হয়েছে, সে সকল এলাকার লোকজন হানাদার বাহিনীর ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। সেসব এলাকা মানবশূন্য হয়ে পড়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, হানাদার বাহিনীর প্রধান হয়তো কোন রাজ্যের বাদশাহ হবে এবং রডারিকের মতোই জালিম হবে। তার বাহিনী বিজিত এলাকায় সুটতরাজ ও হত্যাযজ্ঞ চালাবে। যুবতী মেয়েদের ইজ্জত-আবরু নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে, তাদেরকে দাসী-বান্দি বানাবে। জবরদস্তী গৃহপালিত পশু নিয়ে যাবে। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ছেলে-মেয়ে ও গৃহপালিত পশু নিয়ে পাহাড়-জঙ্গলে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করেছিল। পরে যখন জানতে পারল যে, হানাদার বাহিনী তাদের ঘরবাড়ির দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না তখন তারা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে এলো।
ইবনে যিয়াদ। এ সকল নির্যাতিত, নিপীড়িত সাধারণ মানুষও আপনার সাথে আছে। তারা সকলেই আপনার বিজয়ের জন্য আপন প্রভুর নিকট প্রার্থনা করছে। তারা সুবিশাল আকাশের দিকে হাত প্রসারিত করে ফরিয়াদ করছে, রডারিকের বাদশাহী যেন ধ্বংস হয়ে যায়, তার সালতানাত যেন বরবাদ হয়ে যায়।
