মুসলিম বাহিনী দ্রুতগতিতে দুর্গের নিকট পৌঁছে দুর্গের চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। তারিক বিন যিয়াদ আন্দালুসিয়ার ভাষায় ঘোষণা করালেন, দুর্গের ফটক খোলে দাও। অস্ত্র সমর্পণ কর। তোমাদের কারো তীরের আঘাতে আমাদের কোন সৈনিক যদি আহত বা নিহত হয়, কিংবা দুর্গের ফটক ভেঙ্গে যদি আমাদেরকে দুর্গে প্রবেশ করতে হয়, তাহলে তোমাদের প্রত্যেক সৈন্যের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। তোমরা নিজেরাই যদি ফটক খোলে দাও তাহলে তোমাদের সাথে অত্যন্ত উত্তম আচরণ করা হবে।
মনে রেখো, আমরা দীর্ঘ দিন দুর্গ অবরোধ করে বসে থাকব না। আজকের সূর্য তখনই অস্ত যাবে যখন দুর্গ আমাদের করতলগত হবে।
‘তোমাদের সূর্য তো সেদিনই অস্ত গেছে, যেদিন তোমরা আন্দালুসিয়া আক্রমণ করেছ।’ দুর্গপ্রচীরের উপর থেকে দুর্গপতির গলধগম্ভীর আওয়াজ ভেসে এলো। সাহস থাকলে নিজেরাই দুর্গের ফটক খোলে নাও।
তারিক বিন যিয়াদ তাঁর নির্দেশ পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন মনে করলেন না। সাথে সাথে তিনি নির্দেশ দিলেন,
‘দুর্গ আক্রমণ কর, দুর্গের রক্ষাপ্রাচীর ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দাও।’
মুসলিম বাহিনী দুর্গ আক্রমণ করার অর্থ ভালোভাবেই বুঝতেন। নির্দেশ পাওয়ামাত্রই এক দল সৈনিক কুঠার ও হাতুরী নিয়ে দুর্গের প্রধান ফটক লক্ষ্য করে ছোটে গেল। প্রাচীরের উপর থেকে তাদের উপর তীরবৃষ্টি শুরু হল। চতুর্দিক থেকে বর্শা ছুটে আসতে লাগল।
বার্বার যোদ্ধারা তীরবৃষ্টির কোন পরোয়াই করত না। তারা ঝাঁকে ঝাঁকে বর্শা, আর তীরবৃষ্টি উপেক্ষা করে সম্মুখ দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
দুর্গের ফটক আক্রমণকারী বাহিনীর পিছনে তীরন্দাজ বাহিনী প্রস্তুত ছিল। তাদের ধনুক অত্যন্ত মজবুত ছিল। এ সকল ধনুক দ্বারা বহুদূরের লক্ষ্য ভেদ করা সম্ভব ছিল। ধনুক থেকে নিক্ষিপ্ত তীর আক্রান্ত ব্যক্তির দেহের অভ্যন্তরে ঢুকে যেত। এ জাতীয় ধনুক পরিচালনার জন্য বিশেষ দৈহিক শক্তির প্রয়োজন হত।
মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী দুর্গপ্রাচীরের উপর অবস্থানরত তীরন্দাজ ও বর্শা নিক্ষেপকারীদের লক্ষ্য করে সজোরে তীর ছুঁড়তে লাগল। তাদের নিক্ষিপ্ত তীরে আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন সৈনিক দুর্গপ্রাচীর থেকে নিচে পড়ে গেল। আর অন্যরা মাথা নিচু করে আত্মরক্ষা করল।
দুর্গের ফটক ছিল চারটি। সকল ফটকের উপর বার্বার যোদ্ধারা এক যোগে আক্রমণ রচনা করল। তুমুল তীরবৃষ্টি আর ঝাঁকে ঝাঁকে বর্শার আক্রমণ–কোন কিছুই তাদের নিবৃত রাখতে পারছিল না। তারা বিপুল বিক্রমে দুর্গের সকল ফটকের উপর কুঠার আর হাতুরীর সাহায্যে অনবরত আঘাত হেনে চলল।
এটা ছিল অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ আক্রমণ। সাধারণত এভাবে দুর্গ আক্রমণ করা হয় না। কারণ, কোন সেনাপতিই তার অধীনস্থ যোদ্ধাদেরকে মৃত্যুর মুখে ঢেলে দিতে চান না। কিন্তু তারিক বিন যিয়াদের ধরনই ছিল ভিন্ন। তাঁর নীতি হল, তুমি নিজেই যদি শত্রুর জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে যাও তাহলে সকল বিপদাশঙ্কাই বিদূরীত হয়ে যাবে।
তারিক বিন যিয়াদের শক্তির উৎস ছিল তাঁর অন্তর। যে অন্তরে তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাম নিয়ে কাফেরদের মোকাবেলায় জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পবিত্র নাম তার হৃদয়ের গভীরে স্বমহিমায় প্রথিত ছিল। স্বপ্নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে বিজয়ের সুসংবাদ ছিল তাঁর শক্তির আরেক উৎস।
মূলত স্বপ্নের এই সুসংবাদ আল্লাহ তাআলার নির্দেশেরই পুনরাবৃত্তি ছিল। তিনি পবিত্র কালামে ইরশাদ করেছেন, “যদি তোমাদের মধ্যে বিশজন দৃঢ়পদ থাকে তাহলে তারা দুইশ কাফেরকে পরাজিত করতে সক্ষম হবে। আর যদি তোমাদের মধ্যে দুইশ জন দৃঢ়পদ থাকে তাহলে তারা এক হাজার কাফেরকে পরাজিত করতে পারবে।” (সূরা আনফাল : ৬৫, ৬৬)।
তারিক বিন যিয়াদ এমন এক ব্যক্তি ছিলেন, যার অন্তরে পবিত্র কুরআনের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। যুদ্ধ জয়ের ব্যাপারে কেবল রাসূলুল্লাহর সুসংবাদবাণীই তাঁর শক্তির উৎস ছিল না; বরং পবিত্র কুরআনের উল্লেখিত অমোঘ বাণীও তাঁর প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
মুসলিম বাহিনীর প্রবল আক্রমণের সামনে কার্টিজার সৈন্যরা টিকতে পারল না। সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বেই কার্টিজার দুর্গ মুসলিম বাহিনীর করতলগত হল। অল্প সময়ের মধ্যে তারা একটি ফটক ভেঙ্গে ফেলল। তারপর বাধাপ্রাপ্ত পানির ঢলের ন্যায় মুসলিম বাহিনী ভাঙ্গা ফটক দিয়ে দুর্গে প্রবেশ করল। দুর্গের সিপাহীরা সামান্য সময়ের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলল, কিন্তু তাদের প্রতিরোধযুদ্ধে বিজয়ের জন্য কোন আকাঙ্ক্ষা ছিল না। তারা শুধু দুর্গপতির নির্দেশক্রমে যুদ্ধ করছিল। দুর্গপতি নিজ সৈনিকদের মনোভাব বুঝতে পারল। বিপুল পরিমাণ সৈনিকের জীবন ধ্বংস হওয়ার পূর্বেই সে অস্ত্র সমর্পণ করল।
আন্দালুসিয়ার বাহিনী আত্মসমর্পণ করার পর সর্বপ্রথম এই ঘোষণা প্রচার করা হল যে, কোন লোক যেন পালিয়ে না যায়। তাদের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরুর পূর্ণ হেফাযত করা হবে।’
লোকজনের মাঝে ভাগ-দৌড় শুরু হয়ে গেল। মা-বাবারা যুবতী মেয়েদের লুকিয়ে রাখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। যাদের ঘরে ধন-দৌলত ছিল তারা সেই ধন-দৌলত একত্রিত করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ সন্ধান করতে লাগল। তারিকের নির্দেশে পলায়নের সকল পথ বন্ধ করে দেওয়া হল।
