তারিক বিন যিয়াদ সামনে যে এলাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, সেই এলাকার নাম ছিল কার্টিজা। কার্টিজার দুর্গ ছিল অত্যন্ত মজবুত। থিয়োডুমিরের বেশ কিছু সৈন্য যুদ্ধ থেকে পালিয়ে গিয়ে সেই দুর্গে আশ্রয় নেয়, ফলে কার্টিজা দুর্গের সৈন্যসংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। এতে দুর্গপ্রধানও অত্যন্ত খুশী হয়। সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সে ভাবতে শুরু করে যে, তার দুর্গ এখন অপরাজেয়। অথচ পালিয়ে আসা সৈন্যদের মাঝে লড়াই করার মতো কোন মনোবলই অবশিষ্ট ছিল না। বার্বার সৈন্যরা তাদের মনোবল ভেঙ্গে ঘুড়িয়ে দিয়েছিল।
যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে আসা পরাজিত কোন সৈনিক কখনও নিজেকে ভীরু আর কাপুরুষ মনে করে না। সে নিজের পরাজিত মনোবৃত্তিকে গোপন করার জন্য শত্রুপক্ষকে অতিশক্তিশালী ও ভয়ঙ্কররূপে চিত্রিত করে। খিয়োডুমিরের পরাজিত সৈন্যরা কার্টিজার দুর্গে প্রবেশ করে আক্রমণকারী বাহিনী সম্পর্কে ভীতি আর ত্রাস ছড়াতে লাগল।
তাদের একজন বলল, এরা তো মানুষ নয়, মানুষরূপী জিন-ভূত। আপন জীবনের কোন পরোয়াই তারা করে না।
আরেকজন বলল, ‘আমরা দেখলাম, তাদের নিকট একটি ঘোড়াও নেই। হঠাৎ দেখি, অসংখ্য বোড়সওয়ার আমাদের পিছন দিক থেকে এসে আমাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে বসল।
অন্যজন বলল, ‘আসমান থেকে আমাদের উপর তীর নিক্ষেপ করা হতো। একেকটি তীর আমাদের একেকজন সৈন্যকে হত্যা করে ফেলত।’
আরেকজন বলল, ‘সংখ্যায় তারা আমাদের অর্ধেকও ছিল না।
অন্যজন বলল, তারা মেঘের গর্জনের ন্যায় মর্মভেদী হুঙ্কার ছেড়ে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, আমরা তাদেরকে প্রতিহত করতে পারতাম না।
পরাজিত সৈন্যদের এসব কথাবার্তা দুর্গের ফৌজদের মনে যে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল, তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া শহরের বাসিন্দাদের মাঝেও পরিলক্ষিত হল। তারা এতটাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল যে, তারা ঘরে ঘরে প্রার্থনার আয়োজন করল। তাদের একমাত্র প্রার্থনা ছিল, এই ভয়ঙ্কর শত্রুবাহিনী যেন এদিকে না আসে। গোটা শহরে শক্তবাহিনীর নির্মমতা ও হিংস্রতা সম্পর্কে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, শহরবাসী ভয়ে বিহ্বল হয়ে পড়ল।
এ সময় কার্টিজা শহরের যে অবস্থা হয়েছিল তার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ঐতিহাসিক লেনপুল লেখেন, মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা কম হলেও তারা সকলেই ছিল অসাধারণ সাহসী, অসম্ভব কষ্ট সহি, আর আত্মোৎসর্গের বলে বলিয়ান। তাদের নেতৃত্ব ছিল এমন এক সিপাহসালারের হাতে, ইতিহাস যাকে হিরো আখ্যায়িত করেছে। সামরিক শক্তি, উন্নত অস্ত্র-সস্ত্র ও সৈন্যসংখ্যার দিক থেকে আন্দালুসিয়ার বাহিনীকে অপরাজেয় মনে হলেও মানসিক দিক থেকে তারা ছিল অত্যন্ত ভীরু ও কাপুরুষ। অপর দিকে মুসলিম বাহিনী সামরিক শক্তিতে দুর্বল হলেও তাদের মানসিক শক্তি ছিল পর্বতসম। প্রত্যেকটি সৈনিক যুদ্ধজয়ের নেশায় টগবগ করছিল। যুদ্ধজয়ের তামান্না আর আত্মোৎসর্গের স্পৃহাই বলে দিচ্ছিল, কোন শক্তিই তাদেরকে প্রতিহত করতে সক্ষম হবে না।
মুসলিম বাহিনী লড়াই করছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য, আর আন্দালুসিয়ার বাহিনী লড়াই করছিল বাদশাহর ক্রোধ থেকে আত্মরক্ষার জন্য। মুসলিম বাহিনী ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হুঙ্কার ছেড়ে প্রবল বিক্রমে শত্রুবাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। তাদের এই রণহুঙ্কার অন্তরের অন্তস্থল থেকে বের হয়ে আসত। এই রণহুঙ্কারের মাঝে ভীতি সঞ্চারণকারী যে প্রভাব ছিল, তা হল আল্লাহর নাম। আন্দালুসিয় বাহিনীর এমন কোন রণহুঙ্কার ছিল না। তারা শুধু। বলত, ‘আন্দালুসিয়ার বাদশাহ দীর্ঘ জীবি হোক। এটা ছিল এক নিষ্প্রাণ রণহুঙ্কার। আপন সৈনিকদের মাঝে যুদ্ধ-উন্মাদনা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে এই রণহুঙ্কারের কোন ভূমিকাই ছিল না।
***
সবুজে ঘেরা অনিন্দ্য সুন্দর এক নগরী কার্টিজা। প্রকৃতি যেন তার চতুর্দিকে নৈসর্গিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়েছে। তখনও পূর্ণরূপে ভোরের আলো ফোটেনি। দুর্গ প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে এক সৈনিক চিৎকার করে ঘোষণা করল, ঐ তো ওরা এসে গেছে।’
মানুষের মুখে মুখে মুহূর্তের মধ্যে এই ঘোষণা গোটা নগরীতে ছড়িয়ে পড়ল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরবাসী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তারা চিৎকার-চেঁচামেচি করে ছোটাছুটি করতে শুরু করল।
দুর্গপতি দৌড়ে দুর্গ-প্রাচীরের উপর এসে দাঁড়াল। সে দেখতে পেল, মুসলিম বাহিনী সুতীব্র বেগে দু লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে। দুর্গপতি ভাবতে লাগল, এই সেই বাহিনী, যারা থিয়োডুমিরের মতো অভিজ্ঞ জেনারেলকে পরাজিত করেছে। থিয়োডুমির কিছুক্ষণের জন্য এই দুর্গেও আশ্রয় নিয়েছিল। সে এমনভাবে যুদ্ধের বিবরণ দিয়েছিল যে, দুর্গপতি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। সে দেখতে পেল, সেই জিন-ভূতের বাহিনী এখন তার দুর্গ লক্ষ্য করে ছুটে আসছে।
‘দুর্গের সকল ফটক ভালোভাবে বন্ধ করে দাও।’ দুর্গপতি প্রাচীরের উপর থেকে চিৎকার করে নির্দেশ দিল। ফটকের পিছনে সকলেই প্রস্তুত থাক।’
নির্দেশ ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথে তীরন্দাজ বাহিনী ও বর্শা নিক্ষেপকারী দল দুর্গপ্রাচীরের উপর আবস্থান গ্রহণ করল। দুর্গের ফটক ভিতর থেকে মজবুতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হল। প্রত্যেক ফটকের পিছনে বিপুল সংখ্যক সৈন্য পজিশন নিয়ে দাঁড়াল।
