ওদিকে তারিক বিন যিয়াদের নিকট মাত্র পাঁচ হাজার সেনাসাহায্য এসে পৌঁছেছে। এখন তাঁর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র বার হাজার।
রডারিকের এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল বাহিনী মুসলমানদের বার হাজার সৈন্যের ক্ষুদ্র বাহিনীকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য প্রচণ্ড ঝাবায়ুর ন্যায় সুতীব্র বেগে ধেয়ে আসতে লাগল।
৪. দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর
০৪.
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মুসলিম বাহিনীর সাহায্যে পাঁচ হাজার সদস্যের একটি বাহিনী এসে পৌঁছল। তারিক বিন যিয়াদ অধীর আগ্রহে সেনা-সাহয্য পৌঁছার অপেক্ষা করছিলেন। সেনা-সাহায্য পৌঁছতেই আল্লাহর দরবারে তিনি শোকরিয়া আদায়ের জন্য সেজদায় লুঠিয়ে পড়লেন। সেনা-সাহায্য পৌঁছার আগ পর্যন্ত তিনি এতটাই অস্থির আর বেকারার ছিলেন যে, গভীর রাতে কখনও ঘুম ভেঙ্গে গেলে তিনি তাঁবু থেকে বের হয়ে সোজা রক্ষীবাহিনীর কমান্ডারের তাঁবুতে প্রবেশ করে তাকে ডেকে তুলতেন, আর বলতেন,
‘এখনই দুজন ঘোড়সওয়ার সমুদ্রের দিকে পাঠিয়ে দাও। সেনা-সাহায্য আসার সাথে সাথে যেন তারা আমাকে সংবাদ দেয়। আমি ঘুমিয়ে পড়লেও আমাকে ঘুম থেকে জাগ্রত করে তৎক্ষণাৎ সংবাদ দেবে।’
প্রতিদিন একবারের জন্য হলেও তিনি সমুদ্রসৈকতে গিয়ে উপস্থিত হতেন। আর জাবালুতারিকের উঁচু কোন টিবির উপর দাঁড়িয়ে জাহাজের প্রতীক্ষায় চেয়ে থাকতেন। কখনও পায়ের আঙ্গুলের উপর ভর করে দৃষ্টির শেষ সীমানায় জাহাজের চিহ্ন খুঁজে বেড়াতেন। অবশেষে যখন নিশ্চিত হতেন যে, আজ আর জাহাজ আসবে না তখন তার প্রতিটি কথায় ও কাজে গোসা ঝড়ে পড়ত। তার সহকারী সারগণ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতেন,
‘এতো দূর থেকে সেনা-সাহায্য এসে পৌঁছতে কিছুটা বিলম্ব তো হবেই। এতো বিচলিত হওয়ার কোন কারণ নেই।
‘আমি বুঝতে পেরেছি, সেনা-সাহায্য আসতে এত দেরী হচ্ছে কেন?’ তারিক বিন যিয়াদ প্রতিদিন এই একই কথার পুনরাবৃত্তি করতেন। আফ্রিকার সম্মানিত আমীর হয়তো খলীফার নিকট সেনা-সাহায্য চেয়ে দামেস্কের উদ্দেশ্যে কাসেদ পাঠিয়েছেন। দামেস্ক থেকে সেনা-সাহায্য পৌঁছতে তো তিনটি নতুন চাঁদ উদিত হবেই। বুড়ো আর জোওয়ানের মধ্যে পার্থক্য তো এখানেই।’
তারিক বিন যিয়াদ একবার অধৈর্য হয়ে বলে বসেন।
‘মুসা বিন নুসাইর অনেক বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তিনি এখন সব কাজই ধীরে সুস্থে করতে পছন্দ করেন। এটা তার মনে রাখা উচিৎ, আমি নওজোওয়ান। আমার ধৈর্যশক্তি কম। সিরিয়া ও আরব থেকে সেনা-সাহায্য তলব করার মাঝে কী এমন বুদ্ধিমত্তার পরিচয় আছে? বাবার সম্প্রদায় তো এখনও মরে যায়নি, তাদের মাঝে শুধু এই এলান করলেই চলত যে, সমুদ্রের ওপারে বিন যিয়াদের সেনা-সাহায্য প্রয়োজন, তা হলে এক দিনেই মুসা বিন নুসাইরের নিকট শত-সহস্র যোদ্ধা জানের নাযরানা পেশ করার জন্য জমা হয়ে যেত।
সেনা-সাহায্য পৌঁছতে বিলম্ব হওয়ার কারণে তারিক বিন যিয়াদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হল। আত্মসংবরণ করতে তাঁর অনেক কষ্ট হচ্ছিল। তারপরও তিনি বড় ধরনের যুদ্ধের জন্য তাঁর বাহিনীকে প্রস্তুত করে তুলছিলেন। তিনি অশ্বচালনার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলেন। থিয়োডুমিরের পরাজয়ের পর যুদ্ধলব্ধ ঘোড়াগুলো যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য তিনি বিশেষ নির্দেশ জারি করেছিলেন।
জাবালুততারিকের যুদ্ধে যে ঘোড়াগুলো মুসলমানদের হস্তগত হয়েছিল, তারিক বিন যিয়াদ কয়েকশ’ পদাতিক সৈন্য বাছাই করে ঘোড়াগুলো তাদেরকে দিয়ে দেন। তিনি তাদেরকে ঘোড়ায় চড়ে গেরিলা যুদ্ধের বিশেষ প্ৰশীক্ষণও প্রদান করেন।
তারিক বিন যিয়াদ অকর্মণ্য হয়ে বসে থাকার লোক ছিলেন না। পরাজিত জেনারেল থিয়োড়মিরের কথা চিন্তা করেও তিনি অস্বস্তি অনুভব করছিলেন। তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলেন, থিয়োডুমির পরাজয় মেনে নিয়ে পরবর্তী আক্রমণের আশায় নিশ্চিন্তে বসে থাকবে না। সে অবশ্যই পরাজয়কে বিজয়ে পরিণত করার চেষ্টা করবে। নিশ্চয় সে জবাবী হামলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
তারিক বিন যিয়াদ পূর্বেই এই সংবাদ পেয়েছিলেন যে, আন্দালুসিয়ার বাদশাহ রডারিক এখন রাজধানী টলেডোতে নেই। সে বিদ্রোহ দমন করার জন্য পাম্পালুনা নামক এক সীমান্ত এলাকায় গেছে। তারিক ভাবছিলেন, রডারিকের এই অনুপস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্দালুসিয়ার আরও কিছু এলাকা দখল করে নেওয়া যায় কি না? কিংবা অতর্কিত হামলা চালিয়ে আন্দালুসিয়ার বাহিনীর বড় ধরনের ক্ষতিসাধন করা সম্ভব হয় কি না?
অবশেষে সেনা-সাহায্য এসে পৌঁছলে তারিক তাদেরকে মাত্র একটি রাতের জন্য বিশ্রাম দিলেন। পরদিন ভোর হওয়ার সাথে সাথে গোটা বাহিনীকে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি জুলিয়ানকে জিজ্ঞেস করে সামনের এলাকা সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে নিয়েছিলেন। তাঁর গুপ্তচর ইউনিটের প্রধান অস্ত্র ছিল হেনরি।
এই সেই হেনরি, যে ফ্লোরিডার সাথে ওয়াদা করে এসেছিল, রডারিকের মাথা কেটে নিয়ে যাবে। তারিক বিন যিয়াদ তার সাথে আরও দুজন চৌকস সৈনিককে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য নিযুক্ত করলেন। তারা সামনের এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংগ্রহ করে আনত। তাদের দায়িত্ব হল, কোন এলাকায় কতজন সৈন্য আছে, কোন্ দুর্গ কতটা মজবুত, ইত্যাদি সংবাদ সংগ্রহ করা।
