সওয়ারিহীন ভীত-সন্ত্রস্ত ঘোড়াগুলো আহত সৈন্যদেরকে পদদলিত করে এলোপাথারি ছোটাছুটি করছে। সৈনিকদের বজ্রনিনাদে আকাশ ফেটে পড়ছে। ঘোড়ার পদাঘাতে জমিন কেঁপে কেঁপে উঠছে। আর কিছুক্ষণ পর পর বজ্রকণ্ঠে ঘোষিত হচ্ছে :
হে রাসূলুল্লাহর অনুসারীগণ! কাফেরদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দাও। আল্লাহ তোমাদের সাথে আছেন।
হে মুসলমানগণ, তোমাদের পিছনে অথৈ সমুদ্র। তোমাদের রণতরী পুড়ে ভস্ম হয়ে গেছে।
আল্লাহর রাসূল তোমাদের বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছেন।
রডারিক ও তার জেনারেলরা খোলা চোখে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দেখছিল। তারা সৈনিকদের রণহুঙ্কার আর চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পাচ্ছিল। রক্তাক্ত এই ভয়ানক ছায়াচিত্রের যুদ্ধকে একেবারেই বাস্তব মনে হচ্ছিল। রডারিকের চেহারায় চিন্তার বলিরেখা ফুটে উঠল। তার জেনারেল ও রক্ষীদের চেহারাও ভয়ে পাংশু বর্ণ ধারণ করল। রডারিক যদি না থাকত তাহলে তারা এখান থেকে পালিয়ে বাঁচতে চেষ্টা করত।
যুদ্ধের শুরুতে খ্রিস্টানদের যে সকল যুদ্ধ-নিশান স্বগৌরবে পত পত করে উড়ছিল সেগুলো একে একে ভূপাতিত হতে লাগল। মুসলমানদের ঝাণ্ডা আকাশে মাথা উঁচু করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করছিল। অবশেষে খ্রিস্টানদের কুশ অঙ্কিত যুদ্ধ-নিশানও ভূপাতিত হল। সাথে সাথে খ্রিস্টান সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। আর মুসলিম সৈন্যরা তাদেরকে নির্বিচারে হত্যা করতে লাগল।
রডারিক খ্রিস্টান সৈন্যদের মাঝে এক যোদ্ধাকে দেখতে পেল। তার পিঠ রডারিকের দিকে ছিল। তার মাথায় এমন শিরস্ত্রাণ ছিল যেমনটি স্বয়ং রডারিক ব্যবহার করত। তার লৌহবর্মও ছিল রডারিকের লৌহবর্মের ন্যায়। সে যোদ্ধা যেই সাদা ঘোড়ায় আরোহণ করেছিল, সেটাও দেখতে রডারিকের ঘোড়ার মতোই মনে হচ্ছিল। মোটকথা, সেই অশ্বারোহী যোদ্ধা আর রডারিকের মাঝে পূর্ণ সামঞ্জস্য ছিল।
ছায়াচিত্রের যোদ্ধাকে রডারিক লক্ষ্য করছিল। তাকে বাদশাহ মনে হচ্ছিল। হঠাৎ সে যোদ্ধা ঘোড়া থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার সাদা ঘোড়া এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করতে লাগল।
রডারিক ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠল। সে দ্রুত পিছন ফিরে ছুটতে শুরু করল। দৌড়ে সে ঐ কামরায় এসে পৌঁছল, যেখানে কাঁসার মূর্তিটি মুগুর নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দেখা গেল, মূর্তিটি সেখানে নেই।
রডারিক ও তার সঙ্গীরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তারা দৌড়ে সেই কামরা থেকে বের হয়ে দুর্গের লৌহফটক পেরিয়ে দুর্গের বাহিরে এসে পৌঁছল। দুর্গের বাহিরে এসে দেখল, সেই বৃদ্ধ ধর্মযাক দুজন মরে পড়ে আছেন।
রডারিক দুর্গ থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে পিছন দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল, ধোয়ার ন্যায় কালো মেঘ দুৰ্গটাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। মুহূর্তের মধ্যে মেঘের ভিতর থেকে বিদ্যুৎ চমকাল, সেই সাথে গোটা দুর্গ এক লেলিহান অগ্নিশিখায় পরিণত হল। দুর্গের মর্মর পাথরগুলোও জ্বলতে লাগল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই দুর্গের বাহিরে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পাথরগুলোতেও আগুন জ্বলে উঠল। বাতাস দ্রুত বেগে বইতে শুরু করল। দুর্গের ভস্মাবশেষ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সাথে ছিটকে এসে জমিনের যে স্থানটিতে পড়ত, সেখানে ফুটা ফুটা রক্তের ছাপ লেগে থাকত। রডারিক অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে জেনারেল ও রক্ষীদেরসহ সেখান থেকে দ্রুত সরে পড়ল।
এই ঘটনার পর রডারিক ধর্মগুরুদের, রাষ্ট্ৰীয় পণ্ডিতদের ও জাদুকরদের নিকট জিজ্ঞেস করল, এই রহস্যময় দুর্গের অর্থ কি? দুর্গে দেখা সেই যুদ্ধের উদ্দেশ্যই বা কি? তারা সকলেই যার যার মতো উত্তর দিল; কিন্তু রডারিক কারো উত্তরেই আশ্বস্ত হতে পারল না। প্রত্যেকেই তার অসম সাহসিকতার প্রশংসা করল, আর শত্রুপক্ষের উপর তার বিজয়ের সুসংবাদ শুনালো। একজনমাত্র জাদুকর তাকে সুস্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলল,
‘শাহানশাকে সতর্ক থাকতে হবে। কারো পক্ষেই এটা বলা সম্ভব নয় যে, হিরাকেল কেন সেই দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। তবে আমি এতটুকু বলতে পারি, সেই দুর্গের মাঝে অভিশপ্ত ও অশুভ কিছু শক্তিকে আটকে রাখা হয়েছিল। সেই দুর্গে প্রবেশ করাই আপনার ঠিক হয়নি। যুদ্ধের যে ইঙ্গিত আপনাকে দেওয়া হয়েছে, সেটা কোন শুভ লক্ষণ নয়।
‘আমি কি সেই অশুভ শক্তির প্রভাব থেকে বাঁচতে পারব?’ রডারিক জিজ্ঞেস করল।
‘হে আন্দালুসিয়ায় বাদশাহ, একটি মাত্র উপায় আছে। জাদুকর বলল। ‘আপনি যখন কোন শত্রুপক্ষের সম্মুখীন হবেন তখন আপনার সৈন্যসংখ্যা এত বেশি হতে হবে, যেন শত্রুপক্ষ আপনাকে দেখেই পালিয়ে যায়। অথবা যুদ্ধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করে।
এই ঘটনার পর পাম্পালুনা এলাকায় বিদ্রোহ দেখা দিলে রডারিক অনেক বেশি সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়। পাম্পালুনার বিদ্রোহীদেরকে সে নির্মমভাবে দমন করে। সেখানেই সে জানতে পারে যে, আফ্রিকার দিক থেকে আন্দালুসিয়ার উপর আক্রমণ করা হয়েছে।
থিয়োডুমির তাকে সংবাদ দিয়েছে, আক্রমণকারীদের সংখ্যা সাত-আট হাজার হবে। রডারিক এই আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বিপুল পরিমাণ সৈন্য জমায়েত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে টলেডোর দিকে রওনা হয়ে যায়।
রডারিক টলেডো আসার পথে স্থানে স্থানে যাত্রা বিরতি করে সৈন্য সংগ্রহ করতে থাকে। অবশেষে সে যখন টলেডো এসে পৌঁছে তখন তার সৈন্যসংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। তাদের মধ্যে ছিল কয়েক সহস্র অশ্বারোহী। রডারিক টলেডোতে যাত্রা বিরতি না করে উত্তরের সেই রণাঙ্গনের দিকে রওনা হয়ে যায়, যেখানে মুসলমান সৈন্যরা জেনারেল থিয়োডুমিরকে পরাস্ত করেছে।
