ভিতরে প্রবেশের জন্য পাথর কেটে সুরঙ্গ বানানো হয়েছে। দুর্গের প্রবেশদ্বার এতটাই প্রশস্ত ও উঁচু যে, ঘোড়ার উপর আরোহণ করে দুর্গে প্রবেশ করা যায়। সুরঙ্গের শেষ মাথায় বিশাল আকৃতির লৌহফটক। সেই ফটকে অসংখ্য তালা ঝুলছে। তালার রং বিকৃত হয়ে গেছে। এগুলো হিরাকেল থেকে অর্টিজা পর্যন্ত সকল বাদশাহ নিজ হাতে লাগিয়ে ছিলেন।
যে দুজন বৃদ্ধ ধর্মাষক রডারিকের দরবারে গিয়েছিলেন তারা সেই দুর্গের সামনে দাঁড়ানো ছিলেন। দুজন ফটকের দুই পার্শ্বে প্রহরীর মতো অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
‘আমরা তোমাকে শেষবারের মতো সতর্ক করছি।’ দু’জন বৃদ্ধের একজন বললেন।
‘এদের থেকে চাবি নিয়ে নাও।’ রডারিক নির্দেশ দিল। সকল তালা খুলে দাও।
বৃদ্ধ দুজন শক্তিশালী সৈন্যদেরকে প্রতিহত করতে সক্ষম হলেন না। সৈন্যরা তাদের থেকে চাবি ছিনিয়ে নিল। অসংখ্য জং পড়া তালা। কোন তালার চাবি কোনটা সেটা জানাও ছিল অসম্ভব, সারা দিন ধরে তালা খোলার চেষ্টা করা হল। অবশেষে সূর্য ডুবার কিছু পূর্বে সমস্ত তালা খোলা সম্ভব হল। তালা খোলার সাথে সাথে লৌহকপাটও খুলে গেল।
রডারিক ভিতরে প্রবেশ করল। তার সাথে আসা জেনারেল ও রক্ষীসেনারাও ভিতরে প্রবেশ করল। লৌহকপাট পার হয়ে তারা এক বিশাল হলরুমে এসে পৌঁছল। হলরুমের এক দিকে একটি দরজা। সেই দরজা ভিতর দিক থেকে বন্ধ। দরজার সামনে রাং ও তাম্র মিশ্রিত ধাতু দ্বারা নির্মিত এক বিশাল আকৃতির মানব-মূর্তি দাঁড়ানো। তার এক হাতে লৌহ নির্মিত এক বিশাল মুগুর।
আশ্চর্যের বিষয় হল, মূর্তিটি সেই লৌহ-মৃগুর মাথার উপর উঠিয়ে মাটির উপর আঘাত করছে। তার বুকের উপর স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে। আমি আমার কর্তব্য আদায় করছি।’
‘আমি মন্দ কোন উদ্দেশ্যে এখানে আসিনি। রডারিক মূর্তিটিকে লক্ষ্য করে বলল। কোন কিছুতেই আমি হাত দেব না। কেবল এখানের রহস্য জানার জন্যই এসেছি। তার পর যেভাবে এসেছি, সেভাবেই ফিরে যাব। আমাকে বিশ্বাস কর, আমাকে সামনে যাওয়ার রাস্তা দাও।
রডারিকের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে মূর্তিটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মূর্তির মুগুর ধরা হাত উপরে উঠে রইল। রডারিক তার বাহুর নিচ দিয়ে দ্বিতীয় কামরায় প্রবেশ করল। তার সাথে আগত লোকেরাও তার পিছনে পিছনে ঐ কামরায় প্রবেশ করল।
দ্বিতীয় কামরাটি অত্যন্ত পরিপাটি ও সাজানো-গুছানো। রডারিকের দেহরক্ষীরা মশাল জ্বালিয়ে এনেছিল। মশালের হলুদ আলোতে কামরার দেয়ালগুলো থেকে আলোকচ্ছটা বিচ্ছুরিত হতে লাগল। আসলে সেগুলো ছিল মহামূল্যবান পাথর ও হীরার টুকরো। সেগুলো দ্বারা দেয়ালের মাঝে নকশা অঙ্কিত করা হয়েছিল।
কামরার মধ্যভাগে একটি টেবিল রাখা আছে। তার উপর একটি বড়সড় বাক্স রাখা। তাতে লেখা আছে, “এই বাক্সে দুর্গের রহস্য সংরক্ষিত আছে। কোন বাদশাহ ব্যতীত এই বক্স অন্য কেউ খুলতে সক্ষম হবে না। তবে সেই বাদশাহকে সতর্ক করা হচ্ছে যে, তার সামনে আশ্চর্যজনক ঘটনাবলীর পর্দা উন্মোচিত হবে। আর সেসব ঘটনা সেই বাদশাহর জীবদ্দশায় বাস্তবায়িত হবে।”
রডারিক নির্ভয়ে সেই বাক্সের ঢাকনা খুলে ফেলল। বাক্সে চামড়া দ্বারা নির্মিত এক ফুট দৈর্ঘ ও এক ফুট প্রস্থ একটি কাগজ রাখা ছিল। তাম্র নির্মিত একটি প্লেট সে কাগজের উপর রাখা আছে, আরেকটি প্লেট তার নিচে রাখা আছে।
রডারিক চামড়ার সেই কাগজটি হাতে নিয়েই যুদ্ধবাজ সৈনিক দলের একটি চলমান চিত্র দেখতে পেল। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে সৈনিকরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তীর-ধনুক ও অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত সেই সৈনিকরা সকলেই অশ্বারোহী। তারা সকলেই বিশাল আকৃতি ও ভয়ঙ্কর দর্শন চেহারার অধিকারী। সেই চলমান চিত্রের উপর লেখা আছে :
‘হে অবাধ্য মানুষ! দেখে নাও, এরা সেই অশ্বারোহী, যারা তোমাকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। তোমার বাদশাহীর অবসান ঘটাবে।’
রডারিক অবাক হয়ে সেই চলমান চিত্রের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সাথে আগত জেনারেলদের দৃষ্টিও সেই কাগজের উপর নিবদ্ধ। তারা অতি নিকট থেকে লড়াইরত দুটি বাহিনীর শোরগোল শুনতে পাচ্ছে। সৈনিকদের চিৎকার চেঁচামেচি, ঘোড়ার হেষাধ্বনি, আর ক্ষুরের আঘাতে ময়দান প্রকম্পিত হয়ে উঠছে।
রডারিক এতোটাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল যে, তার মনে হচ্ছিল অন্য কোন রাজ্যের বাহিনী তার রাজ্যে আক্রমণ করে বসেছে। তারা হয়তো টলেডো পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে নিজেকে সামলে নিল। সে তার চোখের সামনেই এই যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করছিল।
যুদ্ধের এই দৃশ্য ছায়াছবির ন্যায় এতটাই জীবন্ত লাগছিল যে, মনে হচ্ছিল দুর্গের মজবুত প্রাচীর অদৃশ্য হয়ে গেছে। সেই প্রাচীরের স্থানে বিশাল বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্র দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। আকাশে পেঁজা পেঁজা কালো মেঘ জমা হয়ে এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করছে।
উভয় পক্ষের বাহিনী মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। একদল খ্রিস্টানদের। আরেক দল উত্তর আফ্রিকার মুসলমানদের। উভয় পক্ষের সৈন্যরাই সমানতালে প্রতিপক্ষের রক্ত প্রবাহিত করে চলছে। ঢাল-তলোয়ারের ঝনঝনানি আর তীর-বর্ষার সাঁ সাঁ শব্দ ভেসে আসছে। মুহুর্মুহু যুদ্ধডঙ্কা বেজে উঠছে। পদাতিক সিপাহী ও অশ্বারোহী সৈন্যরা আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে।
